শিরোনাম

৫১টি দলের ৩১টিরই নারী প্রার্থী নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
৫১টি দলের ৩১টিরই নারী প্রার্থী নেই
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ৩১ টি রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি। অথচ জুলাই সনদে ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল ২৬টি দল ও জোট।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন । হিজড়া ভোটার এক হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারে মধ্যে প্রায় ৪৯.২৪ ভোটার নারী হলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপিসহ অন্যান্য দল থেকে মাত্র ৭৬ জন নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আর একজন হিজড়া প্রার্থী হয়েছেন ।

এভাবে নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার মতো একটি বড় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে (নারীদের) বাদ দিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করায় অনেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯৭২ –এর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদেও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের মনোনায়ন বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো বেশি নারী প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টিকে উপেক্ষা করেছে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৭৬ জন নারী। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৩.৮৪ (প্রায়) শতাংশ নারী প্রার্থী। পুরুষ প্রার্থীর তুলনায় নারী প্রার্থী খুবই কম।

রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কমসংখ্যক নারীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছেন না নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। এ বিষয়ে তিনি বলেন, দলগুলো নারী প্রার্থী বাড়াতে সম্মতি দিয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ৩১ টি দলই নারী প্রার্থী দেয়নি। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক। দেশের এই বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব জাতীয় সংসদে না থাকলে নারী উন্নয়ন তথা দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন ৬১ নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১৫ জন। সবচেয়ে বেশি নারীপ্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদী। দুই দলই ১০ জন করে প্রার্থী দিয়েছে।

ইসির সূত্রে জানা গেছে, দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন ৬১ নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১৫ জন। সবচেয়ে বেশি নারীপ্রার্থী দিয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদী। দুই দলই ১০ জন করে প্রার্থী দিয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ও পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যার ‘বিশাল ভারসাম্যহীন চিত্র’ ফুটে উঠেছে বলে জানিয়েছে নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়নবিষয়ক ৭১টি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা আশানুরূপ না হওয়ায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল থেকে কোনো নারীকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এমনকি জামায়াতে ইসলামী তাদের নেতৃত্বের ৪০ শতাংশ নারী বলে প্রকাশ্যে দাবি করলেও কোনো নারীকে প্রার্থী করেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের মহিলা শাখার সমন্বয়ক ডা.হাবিবা উম্মে চৌধুরী সুইট সিটিজেন জার্নালকে বলেন ‘জামায়াত নারীদের ক্ষমতায়ন করবে। এবার আমরা প্রস্তুত ছিলাম না, পরের নির্বাচনে অবশ্যই নারী প্রার্থী দেওয়া হবে।

অতীতেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম ছিল

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। ওই নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন, যা মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের বেশি। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত নারী প্রার্থীর হার ১ শতাংশের নিচে ছিল। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (জুন মাসে অনুষ্ঠিত) নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ১ শতাংশের ওপরে আসে। ২০০১ সালে ২ শতাংশ, ২০০৮ সালে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫ শতাংশের বেশি ও ২০১৮ সালে প্রায় ৪ শতাংশ নারী প্রার্থী ছিল। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং শাসনপ্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারবিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন গত ২৮ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

  • মোট ভোটারের প্রায় ৪৯% নারী, কিন্তু প্রার্থী মাত্র ৩.৮৪%।
  • ২০২৪ সালের তুলনায় নারী প্রার্থী কমেছে এবারের নির্বাচনে।
  • নারী প্রার্থী কম থাকার বিষয়টি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের বড় ঘাটতি।

কোন দলে কতজন নারী প্রার্থী

বিএনপির সর্বমোট ২৮৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ১০ জন। তাঁরা হলেন নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমীন, যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা, ঝালকাঠি-২ ইশরাত জাহান ইলেন ভুট্টো, মাদারীপুর-১ নাদিরা আক্তার, মানিকগঞ্জ-৩ আফরোজা খানম, ঢাকা-১৪ সানজিদা ইসলাম, শেরপুর-১ সানসিলা জেবরীন, সিলেট-২ তাহসীনা রুশদীর, ফরিদপুর-৩ চৌধুরী নায়াব ইউসুফ ও ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওয়াবেদ।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলও (মার্কসবাদী) ১০ জন নারীও প্রার্থী দিয়েছে। তারা হলেন রংপুর-৩ আসনে প্রগতি বর্মন তমা, গাইবান্ধা-৫ রাহেলা খাতুন, জয়পুরহাট-১ তৌফিকা দেওয়ান, ঢাকা-৫ শাহীনুর আক্তার সুমী, ঢাকা-৭ সীমা দত্ত, গাজীপুর-১ তাসলিমা আক্তার, নোয়াখালী-৫ মুনতাহার বেগম, চট্টগ্রাম-১০ আসমা আক্তার, চট্টগ্রাম-১১ দীপা মজুমদার ও মৌলভীবাজার-২ এ সাদিয়া নওশীন তাসনিম চৌধুরী।

জাতীয় পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রি দল (জিএসডি) থেকে ছয়জন করে নারী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা হলেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নুরুন নাহার বেগম, ঝিনাইদহ-১ মনিকা আলম, খুলনা-৫ শামীম আরা পারভীন, ঢাকা-১০ বহ্নি বেপারী, নরসিংদী-৫ মেহেরুন নেসা খান হেনা ও খাগড়াছড়ি আসনে মিথিলা রোয়াজা।

জেএসডির প্রার্থীরা হলেন সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ইলোরা খাতুন, ফরিদপুর-৩ আরিফা আক্তার, ঢাকা-৭ শাহানা সেলিম, কুমিল্লা-৫ শিরিন আক্তার, নোয়াখালী-১ রেহেনা বেগম ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে তানিয়া রব।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও ইনসানিয়াত বিল্পব ও চারজন করে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে বাসদের প্রার্থীরা হলেন বগুড়া-৬ আসনে দিলরুবা, মাগুরা-১ শম্পা বসু, বরিশাল-৫ মনীষা চক্রবর্তী ও কুমিল্লা-৬ কামরুন নাহার সাথী।

ইনসানিয়াত বিল্পবের প্রার্থীরা হলেন- মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে রোকেয়া আক্তার, ঢাকা-১৩ ফাতেমা আক্তার মুন্নি, গাজীপুর-২ সরকার তাসলিমা আফরোজ ও নরসিংদী-৫ আসনে তাহমিনা আক্তার।

গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ তিনজন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থীরা হলেন নাটোর-২ আসনে তাহমিদা ইসলাম তানিয়া, টাঙ্গাইল-৫ আসনে ফাতেমা আক্তার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে নাহিদা আর গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরা হলেন সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মল্লিকা খাতুন, ঢাকা-৮ আসনে মেঘনা আলম ও নরসিংদী-১ আসনে শিরীন আক্তার। এই দলের নারী প্রার্থীর হার ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে দুইজন নারী প্রার্থী দিয়েছে। এরা হলেন ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারভীন ও ঢাকা-২০ আসননাবিলা তাসনিদ। গণফোরাম দুইজন নারী প্রার্থী দিয়েছে। এরা হলেন ঝিনাইদহ-৪ আসনে খুনিয়া খানম ও ঢাকা-৯ আসনে নাজমা আক্তার। ঢাকা-১৮ আসনে ছাবিনা জাবেদ এনপিপির একমাত্র প্রার্থী।

এ ছাড়া দুইজন নারী প্রার্থী দিয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। তাঁরা হলেন নেত্রকোনা-৪ আসনে চম্পা রানী সরকার ও রাঙ্গামাটি আসনে জুঁই চাকমা।

একজন করে নারী প্রার্থী দিলেন যারা

নাগরিক ঐক্য থেকে পাবনা-৪ আসনে শাহানাজ হক, বাংলাদেশের রিপাবলিকান পার্টি থেকে কুষ্টিয়া-৩ আসনে রুম্পা খাতুন, এবি পার্টির ঢাকা-১০ আসনে নাসরিন সুলতানা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেত্রকোনা-৪ আসনে জলী তালুকদার, আম জনতার দলের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে শরিফা আক্তার, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে আয়েশা আক্তার এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টি থেকে চাঁদপুর-২ আসনে নাসিমা নাজনিন সরকার।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১৫ জন অংশ নিয়েছেন। তারা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা, ঢাকা-৯ তাসনিম জারা, ঠাকুরগাঁও-৩ আশা মনি, রংপুর-৩ রীতা রহমান, রংপুর-৬ তাকিয়া জাহান চৌধুরী, গাইবান্ধা-১ ছালমা আক্তার, জয়পুরহাট-১ সাবেকুন্নাহার, ঢাকা-১ অন্তরা সেলিমা হুদা, টাঙ্গাইল-৩ আইরিন নাহার, ময়মনসিংহ-৬ আক্তার সুলতানা, ময়মনসিংহ-৯ হাসিনা খান চৌধুরী, কিশোরগঞ্জ-৪ কাজী রেহা কবির, কুমিল্লা-৯ সামিরা আজিম, চট্টগ্রাম-২ জিন্নাত আক্তার, খাগড়াছড়িতে জিরুনা ত্রিপুরা ও রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র আনোয়ারা ইসলাম রানী (হিজড়া)।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৭৬ জনকে প্রার্থী করায় হতাশ ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসনিম জারা। তিনি এ বিষয়ে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে আমরা আন্দোলন করে দেশের গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছি। কিন্তু এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১ টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩১ টি দলের নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়টি খুবই হতাশার। এটা নারীদের অবমাননার সামিল।

তিনি আরও বলেন, মাত্র ৭৬ জন নারী নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। অধিক সংখ্যক নারী যদি সংসদে প্রতিনিধিত্ব না করে তাহলে নারীদের কথা, তাদের সমস্যার কে সেখানে তুলে ধরবে। নারীদের উন্নয়নে কাজ কারা করবে। তিনি এবারের নির্বাচনে প্রতিটি দল অন্তত ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী দেবেন বলে আশা করেছিলেন। তবে মাত্র ৭৬ জন নারী প্রার্থীর মধ্য কতজন সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী হতে পারবেন-সে বিষয়টি নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।

/বিবি/