ট্রাম্পের দম্ভ কী পতন ডেকে আনবে যুক্তরাষ্ট্রের

ট্রাম্পের দম্ভ কী পতন ডেকে আনবে যুক্তরাষ্ট্রের
মোসাদ্দেকুর রহমান

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই এক বিতর্কিত চরিত্র। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে জাতিসংঘে তার ভাষণ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে তার অবস্থান—এসব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তার ঔদ্ধত্যই কি বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের পতন ঘটবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থান অনেকের কাছেই পরিহাসের মতো মনে হয়েছে। কারণ, যে জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই মঞ্চেই দাঁড়িয়ে তার বিরোধিতা করা—এটিকে অনেকে কৌশলগত আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আড়ালে ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন।
মার্কিন সাংবাদিক ম্যাক্স ব্লুমেনথাল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ হতে পারে—তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে হাস্যরস ও সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের চেয়েও বেশি বিতর্কিত হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে, যদিও তিনি এখনো বুশের মতো বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করেননি।
লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার লেনদেনভিত্তিক চরিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান দৃঢ় হয়েছে ধনী রাজনৈতিক দাতাদের দ্বারা—যেমন শেলডন অ্যাডেলসন। ফলে ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থান এবং একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেকটাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থনির্ভর বলে মনে করা হয়।
ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান সমালোচিত হয়েছে। উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে মানবিক সংকটকে গৌণ করে দেখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অনেকের মতে, এই নীতি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইরান ইস্যু: সংঘাত নাকি কৌশলগত ব্যর্থতা?
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ট্রাম্প আমলে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় অচলাবস্থা এবং পারমাণবিক ইস্যুতে কঠোর শর্ত আরোপ—দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করুক তা-ই নয়, বরং সে সক্ষমতাও অর্জনের চেষ্টা না করুক। অন্যদিকে, ইরান তার সার্বভৌম অধিকার না ছাড়ার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এই অচলাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়, সেখানে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব রাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের ফলে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন বলেন, এই ধরনের যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত মার্কিন আধিপত্যের পতন ত্বরান্বিত করতে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারানো।
চীন ও বাণিজ্য যুদ্ধ
শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ট্রাম্পের নীতি বিতর্কিত। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে তিনি একদিকে আমেরিকান শিল্পকে রক্ষা করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে কৃষি ও রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য যুদ্ধ মূলত চীনের উত্থান ঠেকানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আফগানিস্তান: এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের সময়েও কোনো কার্যকর সমাধান পায়নি। বরং যুদ্ধটি ‘স্থায়ী সংঘাত’-এ পরিণত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সামরিক-শিল্প খাত ও অভিজাত শ্রেণির লাভ হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তাহলে কী পতনের শুরু
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়—বাস্তব। ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত, মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব, এবং আক্রমণাত্মক কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে দিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তবে ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থার পতন একদিনে ঘটে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া—যেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ, এবং বৈশ্বিক আস্থাহীনতা একসঙ্গে কাজ করে। ট্রাম্প সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছেন কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একদিকে তার সমর্থকরা মনে করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নিজের স্বার্থ আগে’ ভাবতে শিখিয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই নীতিই যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।
তাই বলা যায়, ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য হয়তো এককভাবে মার্কিন আধিপত্যের পতন ঘটাবে না, কিন্তু এটি যে সেই পতনের পথকে আরও দ্রুত ও নিশ্চিত করে তুলছে—এমন ধারণা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই এক বিতর্কিত চরিত্র। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে জাতিসংঘে তার ভাষণ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে তার অবস্থান—এসব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তার ঔদ্ধত্যই কি বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের পতন ঘটবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থান অনেকের কাছেই পরিহাসের মতো মনে হয়েছে। কারণ, যে জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই মঞ্চেই দাঁড়িয়ে তার বিরোধিতা করা—এটিকে অনেকে কৌশলগত আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আড়ালে ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন।
মার্কিন সাংবাদিক ম্যাক্স ব্লুমেনথাল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ হতে পারে—তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে হাস্যরস ও সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের চেয়েও বেশি বিতর্কিত হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে, যদিও তিনি এখনো বুশের মতো বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করেননি।
লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার লেনদেনভিত্তিক চরিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান দৃঢ় হয়েছে ধনী রাজনৈতিক দাতাদের দ্বারা—যেমন শেলডন অ্যাডেলসন। ফলে ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থান এবং একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেকটাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থনির্ভর বলে মনে করা হয়।
ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান সমালোচিত হয়েছে। উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে মানবিক সংকটকে গৌণ করে দেখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অনেকের মতে, এই নীতি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইরান ইস্যু: সংঘাত নাকি কৌশলগত ব্যর্থতা?
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ট্রাম্প আমলে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় অচলাবস্থা এবং পারমাণবিক ইস্যুতে কঠোর শর্ত আরোপ—দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করুক তা-ই নয়, বরং সে সক্ষমতাও অর্জনের চেষ্টা না করুক। অন্যদিকে, ইরান তার সার্বভৌম অধিকার না ছাড়ার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এই অচলাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়, সেখানে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব রাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের ফলে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন বলেন, এই ধরনের যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত মার্কিন আধিপত্যের পতন ত্বরান্বিত করতে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারানো।
চীন ও বাণিজ্য যুদ্ধ
শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ট্রাম্পের নীতি বিতর্কিত। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে তিনি একদিকে আমেরিকান শিল্পকে রক্ষা করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে কৃষি ও রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য যুদ্ধ মূলত চীনের উত্থান ঠেকানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আফগানিস্তান: এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের সময়েও কোনো কার্যকর সমাধান পায়নি। বরং যুদ্ধটি ‘স্থায়ী সংঘাত’-এ পরিণত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সামরিক-শিল্প খাত ও অভিজাত শ্রেণির লাভ হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তাহলে কী পতনের শুরু
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়—বাস্তব। ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত, মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব, এবং আক্রমণাত্মক কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে দিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তবে ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থার পতন একদিনে ঘটে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া—যেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ, এবং বৈশ্বিক আস্থাহীনতা একসঙ্গে কাজ করে। ট্রাম্প সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছেন কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একদিকে তার সমর্থকরা মনে করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নিজের স্বার্থ আগে’ ভাবতে শিখিয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই নীতিই যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।
তাই বলা যায়, ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য হয়তো এককভাবে মার্কিন আধিপত্যের পতন ঘটাবে না, কিন্তু এটি যে সেই পতনের পথকে আরও দ্রুত ও নিশ্চিত করে তুলছে—এমন ধারণা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।

ট্রাম্পের দম্ভ কী পতন ডেকে আনবে যুক্তরাষ্ট্রের
মোসাদ্দেকুর রহমান

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই এক বিতর্কিত চরিত্র। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে জাতিসংঘে তার ভাষণ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে তার অবস্থান—এসব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তার ঔদ্ধত্যই কি বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের পতন ঘটবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থান অনেকের কাছেই পরিহাসের মতো মনে হয়েছে। কারণ, যে জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেই মঞ্চেই দাঁড়িয়ে তার বিরোধিতা করা—এটিকে অনেকে কৌশলগত আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আড়ালে ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন।
মার্কিন সাংবাদিক ম্যাক্স ব্লুমেনথাল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ হতে পারে—তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে হাস্যরস ও সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের চেয়েও বেশি বিতর্কিত হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে, যদিও তিনি এখনো বুশের মতো বড় আকারের যুদ্ধ শুরু করেননি।
লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার লেনদেনভিত্তিক চরিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান দৃঢ় হয়েছে ধনী রাজনৈতিক দাতাদের দ্বারা—যেমন শেলডন অ্যাডেলসন। ফলে ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থান এবং একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেকটাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থনির্ভর বলে মনে করা হয়।
ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান সমালোচিত হয়েছে। উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে মানবিক সংকটকে গৌণ করে দেখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অনেকের মতে, এই নীতি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইরান ইস্যু: সংঘাত নাকি কৌশলগত ব্যর্থতা?
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ট্রাম্প আমলে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় অচলাবস্থা এবং পারমাণবিক ইস্যুতে কঠোর শর্ত আরোপ—দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করুক তা-ই নয়, বরং সে সক্ষমতাও অর্জনের চেষ্টা না করুক। অন্যদিকে, ইরান তার সার্বভৌম অধিকার না ছাড়ার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এই অচলাবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়, সেখানে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব রাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের ফলে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন বলেন, এই ধরনের যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত মার্কিন আধিপত্যের পতন ত্বরান্বিত করতে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারানো।
চীন ও বাণিজ্য যুদ্ধ
শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ট্রাম্পের নীতি বিতর্কিত। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে তিনি একদিকে আমেরিকান শিল্পকে রক্ষা করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে কৃষি ও রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য যুদ্ধ মূলত চীনের উত্থান ঠেকানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আফগানিস্তান: এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের সময়েও কোনো কার্যকর সমাধান পায়নি। বরং যুদ্ধটি ‘স্থায়ী সংঘাত’-এ পরিণত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সামরিক-শিল্প খাত ও অভিজাত শ্রেণির লাভ হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তাহলে কী পতনের শুরু
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়—বাস্তব। ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত, মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব, এবং আক্রমণাত্মক কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে দিচ্ছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
তবে ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থার পতন একদিনে ঘটে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া—যেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ, এবং বৈশ্বিক আস্থাহীনতা একসঙ্গে কাজ করে। ট্রাম্প সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছেন কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একদিকে তার সমর্থকরা মনে করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নিজের স্বার্থ আগে’ ভাবতে শিখিয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই নীতিই যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।
তাই বলা যায়, ট্রাম্পের ঔদ্ধত্য হয়তো এককভাবে মার্কিন আধিপত্যের পতন ঘটাবে না, কিন্তু এটি যে সেই পতনের পথকে আরও দ্রুত ও নিশ্চিত করে তুলছে—এমন ধারণা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।




