শিরোনাম

গাজায় দুর্ভিক্ষ ইসরায়েলের সুপরিকল্পিত নীতির ফল: গবেষণা

সিটিজেন ডেস্ক
গাজায় দুর্ভিক্ষ ইসরায়েলের সুপরিকল্পিত নীতির ফল: গবেষণা
গাজা উপত্যকার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনি শিশুরা খাবার নিচ্ছে। ছবি: মিডল ইস্ট আই

গাজা উপত্যকায় সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ কোনো আকস্মিক সংকট বা ভুল হিসাবের ফল নয়, বরং এটি ইসরায়েল সরকারের একটি সুচিন্তিত ও পূর্বপরিকল্পিত অনাহার নীতির বাস্তবায়ন। ইসরায়েলের ভ্যান লিয়ার জেরুজালেম ইনস্টিটিউটের ‘ফোরাম ফর রিজিওনাল থিংকিং’ কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘অস্বীকারের তথ্য: গাজার দুর্ভিক্ষের পেছনের ধোঁয়াশা’ শীর্ষক গবেষণাটি তৈরি করেছেন গণহত্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শমুয়েল লেডারম্যান, যিনি ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও প্রশাসনের পরিকল্পিত ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতাকে এই প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেডারম্যান জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী এ সংঘাত ও গণহত্যার সময়ে গাজায় অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার এক তীব্র প্রচেষ্টা ইসরায়েলের অভ্যন্তরে দেখা গেছে। এমনকি ২০২৫ সালের আগস্টেও দেশটির মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এ সংকটকে হালকা করে দেখিয়েছে। গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে, দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্যের অভাব নয়, বরং খাদ্য পাওয়ার সুযোগকে পদ্ধতিগতভাবে বন্ধ করার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। ত্রাণ, জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং বেকারি ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে ফিলিস্তিনিদের খাদ্য প্রাপ্তি মারাত্মকভাবে সীমিত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এড়াতে এবং মানবিক ‘রেড লাইন’ বজায় রাখার ভান করে এ অনাহার কৌশল দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে প্রয়োগ করা হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, গাজায় মানবিক সহায়তার ট্রাক প্রবেশের সংখ্যা নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক ইউনিট কোগাট ক্রমাগত বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে কোগাট দাবি করে , দৈনিক মাত্র ৮০টি ট্রাকই গাজাবাসীর জন্য যথেষ্ট, অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মার্কিন প্রশাসনের মতে এ সংখ্যাটি ২৫০ থেকে ৬০০ হওয়া উচিত ছিল। এমনকি ২০০৮ সালে গাজার তৎকালীন কম জনসংখ্যার জন্যই প্রতিদিন ১৭৮টি ট্রাকের প্রয়োজন বলে কোগাট নিজেই স্বীকার করেছিল। সম্প্রতি ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর কোগাট ত্রাণবাহী ট্রাকের সংখ্যা কমিয়ে ২৫০ করার প্রস্তাব দিলে লেডারম্যান একে অনাহারের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি বলে অভিহিত করেন। এ সংকটকে পুঁজি করে ইসরায়েলের ১১টি সুপারমার্কেট চেইন ত্রাণ সরবরাহের একচেটিয়া টেন্ডার থেকে কোটি কোটি শেকেল মুনাফা লুটেছে, যা গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তোলে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন ও ট্রাম্প উভয় প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় এ অনাহার নীতি ভিন্ন এক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ট্রাম্প ও ইসরায়েল সমর্থিত ‘গাজা মানবিক ফাউন্ডেশন’ (জিএইচএফ) মূলত ফিলিস্তিনিদের দক্ষিণে এবং পরিশেষে তৃতীয় কোনো দেশে ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন’-এ বাধ্য করার একটি সুদূরপ্রসারী ছক ছিল। ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের মার্চে সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপের পর, আগস্ট মাস নাগাদ জাতিসংঘ গাজা শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। লেডারম্যান সতর্ক করে দিয়েছেন, গাজাকে অনাহারের এক নির্মম পরীক্ষাগার বানিয়ে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন করেছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও এটি একটি বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

/এমএকে/