শিরোনাম

গাজায় আবারও দুর্ভিক্ষের ছায়া, ক্ষুধার সঙ্গে লড়ছে শিশুরা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
গাজায় আবারও দুর্ভিক্ষের ছায়া, ক্ষুধার সঙ্গে লড়ছে শিশুরা
তাঁবুতে সন্তানদের নিয়ে খাবার খাচ্ছে এক ফিলিস্তিনি মা। ছবি: আল জাজিরা

মধ্য গাজার আল-জাওয়াইদা ক্যাম্পের এক চিলতে তাঁবুতে তিন সন্তানের জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করছেন ৩৫ বছর বয়সী সাহার আল-বার্দিনি। তাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন ঠিকই, তবে তার মন পড়ে আছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়- পরের বেলা সন্তানদের কপালে খাবার জুটবে তো?

৩ বছর আগে উত্তর গাজায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে স্বামীকে হারিয়েছেন সাহার। ছয় বছরের ওমর, চার বছরের সামা আর তিন বছরের মাহমুদকে নিয়ে তার এখন একার লড়াই। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবরোধ আর আকাশছোঁয়া দামের কারণে একবেলার খাবার জোগাড় করতেই হাঁপিয়ে উঠছেন এই মা। গাজার হাজারো পরিবারের মতো সাহারের মনেও এখন একটাই বড় আতঙ্ক- ফিলিস্তিনের এই জনপদে কি তবে আবারও নেমে আসছে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ?

গাজায় শেখ রাদওয়ান মহল্লার শরণার্থী শিবিরে পাত্রে পানি ভরছে এক শিশু। ছবি: আল জাজিরা
গাজায় শেখ রাদওয়ান মহল্লার শরণার্থী শিবিরে পাত্রে পানি ভরছে এক শিশু। ছবি: আল জাজিরা

সাহারের এ ভয় একেবারেই অমূলক নয়। গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে গেছে গাজা, তার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে ছোট ওমর আর সামা। সেই সময় শাকসবজি বা ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার বাজারে দেখাই যেত না, আর মিললেও তা কেনার সামর্থ্য ছিল না। পুষ্টির তীব্র অভাবে হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েছিল দুই শিশু। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর তাদের হারানো স্বাস্থ্য কিছুটা ফিরিয়ে আনতে সাহারের লেগেছে পুরো ছয়টি মাস। আজও তারা দিনে মাত্র একবেলা খেতে পায়। ছলছল চোখে সাহার বলেন, আমার সবচেয়ে বড় ভয় হলো, খাবারের অভাবে আমার সন্তানেরা আবার ঢলে পড়বে। আমি শুধু ওদের সুস্থ দেখতে চাই, কিন্তু প্রতিদিন প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করা আমার একার পক্ষে অসম্ভব।

সাহারের এ করুণ দিনযাপন আসলে পুরো গাজারই এক বর্তমান বাস্তবতা। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করেছে, গাজা আবারও এক চরম খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছে। এটি দ্রুতই আরেকটি দুর্ভিক্ষে রূপ নিতে পারে। সংস্থাটির ফিলিস্তিন প্রধান জাস্টিন ব্র্যাডি জানান, গাজার প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ এখন চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আর সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণিবিন্যাস (আইপিসি) অনুযায়ী, দুই লাখেরও বেশি মানুষ এমন এক মর্মান্তিক অবস্থার মধ্যে রয়েছেন, যাকে বলা হয় আনুষ্ঠানিক দুর্ভিক্ষ ঘোষণার ঠিক আগের ধাপ।

গাজার এক শরণার্থী শিবিরে খাবার নিচ্ছে শিশুরা। ছবি: পিবিএস নিউজ
গাজার এক শরণার্থী শিবিরে খাবার নিচ্ছে শিশুরা। ছবি: পিবিএস নিউজ

সাহারের এলাকায় পরিবারগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা এখন গণ-রান্নাঘরগুলো। সেখান থেকে যেটুকু ভাত বা সাধারণ খাবার পাওয়া যায়, তা অনাহার ঠেকাতে পারলেও বাড়ন্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও পুষ্টি জোগাতে পারছে না। কোনো ত্রাণ বা খাবারের ভাউচার হাতে পেলে সাহার সেটির সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা জলের মতো। খাবারের চাহিদা মেটাতেই যেখানে পুরো টাকা শেষ, সেখানে পোশাক বা ওষুধের কথা ভাবাই যায় না।

একই করুণ গল্পের পুনরাবৃত্তি ২৫ বছর বয়সী সীমার ঘরেও। গত দুর্ভিক্ষের সময় তার দুই বছর বয়সী মেয়ে সেলিনার জন্য দুধ জোগাড় করতে না পেরে ক্ষুধা মেটাতে ডাল সিদ্ধ করে খাওয়াতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। অনাহার থেকে বাঁচলেও সেই মারাত্মক অপুষ্টির প্রভাব থেকে আজও বের হতে পারেনি ছোট্ট সেলিনা। মেয়েকে একটু সুস্থ করে তুলতে দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন সীমা। তবু অর্থাভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার কিনে দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনি শিশুরা খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে। ছবি: এনবিসি নিউজ
মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনি শিশুরা খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে। ছবি: এনবিসি নিউজ

পুষ্টি বিশেষজ্ঞ গাদা জিবরিল জানান, ক্ষুধা মেটানো আর একটি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকা একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, ওজন বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ডিম, দুধ, ফল, শাকসবজি ও মাংসের প্রয়োজন। কিন্তু অবরুদ্ধ গাজায় মায়েদের সেই সাধ্য নেই। ফলে কেবল চাল-ডাল খেয়ে সাময়িকভাবে পেট ভরলেও, অপুষ্টির দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাচ্ছে না গাজার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/