হরমুজ প্রণালি নিয়ে কি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালি নিয়ে কি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প
সিটিজেন ডেস্ক

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী জলপথ হলো হরমুজ প্রণালি। এ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) তার নিজ মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে যেসব দেশ জেট-ফুয়েল পাচ্ছে না তাদের জন্য আমার দুটো পরামর্শ- হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিনতে পারো। অথবা নিজেরা গিয়ে সাহস করে হরমুজ প্রণালি দখলে নিতে পারো। তোমাদের শিখতে হবে কীভাবে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। আমরা তোমাদেরকে আর সাহায্য করবো না। যেমনটা তোমরা আমাদের করো নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। কঠিন কাজটা আমরা করে ফেলেছি। তোমরা এখন হরমুজে গিয়ে নিজেদের তেল নিয়ে আসো।’
ট্রাম্পের এ পোস্টের পর ব্রিটিশ অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্ক স্কাই নিউজকে বলেছেন, ইংল্যান্ড এবং ইউরোপকে সাহস করে হরমুজ প্রণালিতে যেতে বলছে ট্রাম্প। এর মানে কি যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পের সেখানে যাবার সাহস নেই?
সিএনএনের সামরিক বিশেষজ্ঞ জেনারেল মার্ক বলেছেন, ট্রাম্পের পোস্টটিই জলজ্যান্ত প্রমাণ, যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে খেই হারিয়ে ফেলছে। আশপাশে কাউকে না পেয়ে সে এখন পাগলের প্রলাপ বকছে। তিনি আরও বলেছেন, রাশিয়া এবং চায়না চুপচাপ বসে বসে দেখছে আর ভাবছে অ্যামেরিকা আর ইউরোপ কি করে মিত্র দেশ হয়! এদের মাঝে তো কোন মিলই নেই। আপনি যখন আপনার শত্রুর সামনে নিজেরা নিজেরা ঝগড়া করবেন। শত্রু তো বুঝেই যাবে এরা দুর্বল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিষয়টি থেকে সরে আসে তবে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কী হবে? ইরান কি এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখবে, নাকি কোনো আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে?
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ইরান তথাকথিত এক ‘সিলেক্টিভ ব্লকেড’ আরোপ করে রেখেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল বকম্যানের মতে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির কারণে বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ জাহাজ এ রুট এড়িয়ে চলছে। কিন্তু ইরান এবং তার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জাহাজগুলো ঠিকই যাতায়াত করছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) লারাক দ্বীপকে কেন্দ্র করে এক আধা-আনুষ্ঠানিক ট্রানজিট করিডোর তৈরি করেছে, যা ইয়েমেনের হুথিদের লোহিত সাগরের কৌশলের চেয়েও জটিল। আগে প্রতিদিন এ পথে ১৩৮টি জাহাজ চললেও বর্তমানে তা মাত্র অর্ধ ডজনে নেমে এসেছে। তবে চীন, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জাহাজ, যারা মূলত কৃষিপণ্য পরিবহন করছে, তাদের যাতায়াতে ইরান নমনীয়তা দেখাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইরান এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ রাজস্ব আয় করছে।
অন্যদিকে, ইরান এ অচলাবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই চাইছে এবং একে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার করার পরিকল্পনা করছে। তেহরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দাবি করেছে। তারা জাহাজ প্রতি প্রায় ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছে। যদিও বর্তমানে ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে অনেক দেশ এ অর্থ প্রদান করছে না। তবুও ইরান সরকার প্রণালিতে টোল আদায়ের একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। কনসোর্টিয়ামটি অনেকটা সুয়েজ খালের মতো মোটা অঙ্কের অর্থ আয়ের উৎস হতে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের এ টোল আদায়ের পরিকল্পনাকে অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ সংকটের তৃতীয় একটি সম্ভাবনা হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন, একটি বহুজাতিক কনসোর্টিয়াম হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। আর এর ফলে কোনো ফি ছাড়াই এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে। ব্রিটেন ইতোমধ্যে ৩০টি দেশের নৌবাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য হবে সশস্ত্র ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজের প্রহরায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়া।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের টাস্কফোর্স মোতায়েন করা অত্যন্ত জটিল এবং এটি কার্যকর করতে হলে ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং ৩২০০ জাহাজ এ অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে। তাদের উদ্ধারে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জরুরি মানবিক করিডোর তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়, হরমুজ প্রণালি কি আগের অবস্থায় ফিরবে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, হরমুজ অবরোধ ইরানের জন্য একটি ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ বা চূড়ান্ত মরণকামড়। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এ সংঘাতের অবসান ঘটান এবং ইরান যদি এরপরও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তা পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধ ডেকে আনবে। ইরানের ভেতরে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা বাইরে কঠোর অবস্থান দেখাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের বাজি কতটা সফল হয়। তিনি কি কোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারবেন, নাকি হরমুজ প্রণালির এ অচলাবস্থা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী জলপথ হলো হরমুজ প্রণালি। এ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) তার নিজ মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে যেসব দেশ জেট-ফুয়েল পাচ্ছে না তাদের জন্য আমার দুটো পরামর্শ- হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিনতে পারো। অথবা নিজেরা গিয়ে সাহস করে হরমুজ প্রণালি দখলে নিতে পারো। তোমাদের শিখতে হবে কীভাবে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। আমরা তোমাদেরকে আর সাহায্য করবো না। যেমনটা তোমরা আমাদের করো নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। কঠিন কাজটা আমরা করে ফেলেছি। তোমরা এখন হরমুজে গিয়ে নিজেদের তেল নিয়ে আসো।’
ট্রাম্পের এ পোস্টের পর ব্রিটিশ অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্ক স্কাই নিউজকে বলেছেন, ইংল্যান্ড এবং ইউরোপকে সাহস করে হরমুজ প্রণালিতে যেতে বলছে ট্রাম্প। এর মানে কি যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পের সেখানে যাবার সাহস নেই?
সিএনএনের সামরিক বিশেষজ্ঞ জেনারেল মার্ক বলেছেন, ট্রাম্পের পোস্টটিই জলজ্যান্ত প্রমাণ, যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে খেই হারিয়ে ফেলছে। আশপাশে কাউকে না পেয়ে সে এখন পাগলের প্রলাপ বকছে। তিনি আরও বলেছেন, রাশিয়া এবং চায়না চুপচাপ বসে বসে দেখছে আর ভাবছে অ্যামেরিকা আর ইউরোপ কি করে মিত্র দেশ হয়! এদের মাঝে তো কোন মিলই নেই। আপনি যখন আপনার শত্রুর সামনে নিজেরা নিজেরা ঝগড়া করবেন। শত্রু তো বুঝেই যাবে এরা দুর্বল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিষয়টি থেকে সরে আসে তবে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কী হবে? ইরান কি এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখবে, নাকি কোনো আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে?
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ইরান তথাকথিত এক ‘সিলেক্টিভ ব্লকেড’ আরোপ করে রেখেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল বকম্যানের মতে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির কারণে বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ জাহাজ এ রুট এড়িয়ে চলছে। কিন্তু ইরান এবং তার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জাহাজগুলো ঠিকই যাতায়াত করছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) লারাক দ্বীপকে কেন্দ্র করে এক আধা-আনুষ্ঠানিক ট্রানজিট করিডোর তৈরি করেছে, যা ইয়েমেনের হুথিদের লোহিত সাগরের কৌশলের চেয়েও জটিল। আগে প্রতিদিন এ পথে ১৩৮টি জাহাজ চললেও বর্তমানে তা মাত্র অর্ধ ডজনে নেমে এসেছে। তবে চীন, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জাহাজ, যারা মূলত কৃষিপণ্য পরিবহন করছে, তাদের যাতায়াতে ইরান নমনীয়তা দেখাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইরান এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ রাজস্ব আয় করছে।
অন্যদিকে, ইরান এ অচলাবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই চাইছে এবং একে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার করার পরিকল্পনা করছে। তেহরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দাবি করেছে। তারা জাহাজ প্রতি প্রায় ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছে। যদিও বর্তমানে ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে অনেক দেশ এ অর্থ প্রদান করছে না। তবুও ইরান সরকার প্রণালিতে টোল আদায়ের একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। কনসোর্টিয়ামটি অনেকটা সুয়েজ খালের মতো মোটা অঙ্কের অর্থ আয়ের উৎস হতে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের এ টোল আদায়ের পরিকল্পনাকে অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ সংকটের তৃতীয় একটি সম্ভাবনা হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন, একটি বহুজাতিক কনসোর্টিয়াম হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। আর এর ফলে কোনো ফি ছাড়াই এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে। ব্রিটেন ইতোমধ্যে ৩০টি দেশের নৌবাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য হবে সশস্ত্র ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজের প্রহরায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়া।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের টাস্কফোর্স মোতায়েন করা অত্যন্ত জটিল এবং এটি কার্যকর করতে হলে ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং ৩২০০ জাহাজ এ অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে। তাদের উদ্ধারে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জরুরি মানবিক করিডোর তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়, হরমুজ প্রণালি কি আগের অবস্থায় ফিরবে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, হরমুজ অবরোধ ইরানের জন্য একটি ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ বা চূড়ান্ত মরণকামড়। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এ সংঘাতের অবসান ঘটান এবং ইরান যদি এরপরও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তা পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধ ডেকে আনবে। ইরানের ভেতরে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা বাইরে কঠোর অবস্থান দেখাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের বাজি কতটা সফল হয়। তিনি কি কোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারবেন, নাকি হরমুজ প্রণালির এ অচলাবস্থা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

হরমুজ প্রণালি নিয়ে কি হাল ছেড়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প
সিটিজেন ডেস্ক

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী জলপথ হলো হরমুজ প্রণালি। এ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) তার নিজ মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে যেসব দেশ জেট-ফুয়েল পাচ্ছে না তাদের জন্য আমার দুটো পরামর্শ- হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিনতে পারো। অথবা নিজেরা গিয়ে সাহস করে হরমুজ প্রণালি দখলে নিতে পারো। তোমাদের শিখতে হবে কীভাবে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। আমরা তোমাদেরকে আর সাহায্য করবো না। যেমনটা তোমরা আমাদের করো নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরানকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। কঠিন কাজটা আমরা করে ফেলেছি। তোমরা এখন হরমুজে গিয়ে নিজেদের তেল নিয়ে আসো।’
ট্রাম্পের এ পোস্টের পর ব্রিটিশ অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্ক স্কাই নিউজকে বলেছেন, ইংল্যান্ড এবং ইউরোপকে সাহস করে হরমুজ প্রণালিতে যেতে বলছে ট্রাম্প। এর মানে কি যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পের সেখানে যাবার সাহস নেই?
সিএনএনের সামরিক বিশেষজ্ঞ জেনারেল মার্ক বলেছেন, ট্রাম্পের পোস্টটিই জলজ্যান্ত প্রমাণ, যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে খেই হারিয়ে ফেলছে। আশপাশে কাউকে না পেয়ে সে এখন পাগলের প্রলাপ বকছে। তিনি আরও বলেছেন, রাশিয়া এবং চায়না চুপচাপ বসে বসে দেখছে আর ভাবছে অ্যামেরিকা আর ইউরোপ কি করে মিত্র দেশ হয়! এদের মাঝে তো কোন মিলই নেই। আপনি যখন আপনার শত্রুর সামনে নিজেরা নিজেরা ঝগড়া করবেন। শত্রু তো বুঝেই যাবে এরা দুর্বল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিষয়টি থেকে সরে আসে তবে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কী হবে? ইরান কি এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখবে, নাকি কোনো আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে?
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ইরান তথাকথিত এক ‘সিলেক্টিভ ব্লকেড’ আরোপ করে রেখেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল বকম্যানের মতে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির কারণে বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ জাহাজ এ রুট এড়িয়ে চলছে। কিন্তু ইরান এবং তার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জাহাজগুলো ঠিকই যাতায়াত করছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) লারাক দ্বীপকে কেন্দ্র করে এক আধা-আনুষ্ঠানিক ট্রানজিট করিডোর তৈরি করেছে, যা ইয়েমেনের হুথিদের লোহিত সাগরের কৌশলের চেয়েও জটিল। আগে প্রতিদিন এ পথে ১৩৮টি জাহাজ চললেও বর্তমানে তা মাত্র অর্ধ ডজনে নেমে এসেছে। তবে চীন, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জাহাজ, যারা মূলত কৃষিপণ্য পরিবহন করছে, তাদের যাতায়াতে ইরান নমনীয়তা দেখাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইরান এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ রাজস্ব আয় করছে।
অন্যদিকে, ইরান এ অচলাবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই চাইছে এবং একে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার করার পরিকল্পনা করছে। তেহরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দাবি করেছে। তারা জাহাজ প্রতি প্রায় ২০ লাখ ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের প্রস্তাবও দিয়েছে। যদিও বর্তমানে ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে অনেক দেশ এ অর্থ প্রদান করছে না। তবুও ইরান সরকার প্রণালিতে টোল আদায়ের একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। কনসোর্টিয়ামটি অনেকটা সুয়েজ খালের মতো মোটা অঙ্কের অর্থ আয়ের উৎস হতে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের এ টোল আদায়ের পরিকল্পনাকে অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ সংকটের তৃতীয় একটি সম্ভাবনা হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন, একটি বহুজাতিক কনসোর্টিয়াম হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। আর এর ফলে কোনো ফি ছাড়াই এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে। ব্রিটেন ইতোমধ্যে ৩০টি দেশের নৌবাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য হবে সশস্ত্র ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজের প্রহরায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়া।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের টাস্কফোর্স মোতায়েন করা অত্যন্ত জটিল এবং এটি কার্যকর করতে হলে ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং ৩২০০ জাহাজ এ অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে। তাদের উদ্ধারে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জরুরি মানবিক করিডোর তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়, হরমুজ প্রণালি কি আগের অবস্থায় ফিরবে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, হরমুজ অবরোধ ইরানের জন্য একটি ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ বা চূড়ান্ত মরণকামড়। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এ সংঘাতের অবসান ঘটান এবং ইরান যদি এরপরও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তা পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধ ডেকে আনবে। ইরানের ভেতরে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা বাইরে কঠোর অবস্থান দেখাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের বাজি কতটা সফল হয়। তিনি কি কোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারবেন, নাকি হরমুজ প্রণালির এ অচলাবস্থা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ




