শিরোনাম
এক্সপ্রেইনার

বিশ্ব বাণিজ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বিশ্ব বাণিজ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল-মান্দেব প্রণালি

এশীয় ও ইউরোপীয় বাজারের মধ্যকার বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকার মাঝের একটি সরু জলপথ। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্তকারী বাব এল-মান্দেব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট। কিন্তু ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলের একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় এই রুটটির নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইয়েমেনি সরকারের একটি সামরিক সূত্র সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে জানিয়েছে, হুথি যোদ্ধারা বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপযা মায়ুন নামেও পরিচিত দখল করেছে। এর মাধ্যমে প্রণালীটির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলো। শুধু তাই নয়, দ্বীপটির ঠিক সামনের উপকূলীয় শহর ধুবাব এবং আরও উত্তরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জও এখন তাদের দখলে। এর ঠিক আগের দিন বাব এল-মান্দেব থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক বন্দর নগরী মোখাও নিজেদের কব্জায় নেয় গোষ্ঠীটি।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি
বাব আল-মান্দেব প্রণালি

বাব আল-মান্দেব প্রণালি

আরবি শব্দ ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালি’-এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘অশ্রুর দ্বার’। ভৌগোলিক বিচারে এটি হর্ণ অব আফ্রিকা অঞ্চলে অবস্থিত ইয়েমেনকে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া থেকে আলাদা করেছে। এডেন উপসাগর ও আরব সাগরকে সরাসরি লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত করেছে প্রণালীটি।

লোহিত সাগরের উত্তর প্রান্তে রয়েছে বিখ্যাত সুয়েজ খাল, যা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সংযোগকারী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ। আর এ সুয়েজ করিডোরের দক্ষিণ দিকের মূল প্রবেশদ্বার হলো বাব আল-মান্দেব। এশিয়া থেকে ইউরোপে বা ইউরোপ থেকে এশিয়ায় যাতায়াতকারী যেকোনো জাহাজকেই এ পথ দিয়ে চলাচল করতে হয়।

মাত্র ১৮ মাইল বা ২৯ কিলোমিটার চওড়া এ সরু জলপথের নৌচলাচল মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। এর মাঝে থাকা পেরিম দ্বীপ জলপথটিকে এমনভাবে ভাগ করেছে, একপাশে ইয়েমেন ভূখণ্ডের সঙ্গে ছোট প্রণালি এবং অন্যপাশে আফ্রিকার দিকে একটি প্রশস্ত পথ রয়েছে। ফলে এ দ্বীপ যার দখলে থাকে, লোহিত সাগরে যাতায়াতকারী সব জাহাজের ওপর নজরদারি করার সুবিধা তার হাতে চলে আসে। এখন মোখা, ধুবাব এবং হানিশ দ্বীপপুঞ্জের পাশাপাশি এ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্টগুলো হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় এ জলপথে তাদের সামরিক শক্তি ও প্রভাব বহুগুণ বেড়েছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যাত্রীবাহী নৌকা
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যাত্রীবাহী নৌকা

বিশ্ব বাণিজ্যে এ প্রণালির প্রভাব

বাব আল-মান্দেব কেবল জ্বালানি তেল পরিবহনের রুটই নয়। এটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিস্তৃত একটি বৃহত্তর বাণিজ্যিক করিডোরের প্রাণকেন্দ্র। এ জলপথ দিয়েই মূলত দুই মহাদেশের মধ্যে উৎপাদিত পণ্য, কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য, সার, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর মতো জরুরি জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করা হয়।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য বলছে, লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক সংকট শুরুর আগে, অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক কন্টেইনার বাণিজ্যের প্রায় ২২ শতাংশই পরিচালিত হতো সুয়েজ খালের মাধ্যমে। আর এ সুয়েজ রুটের অপরিহার্য অংশ হলো বাব আল-মান্দেব। দক্ষিণ দিক থেকে জাহাজগুলো যদি নিরাপদে লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে না পারে, তবে এশিয়া ও ইউরোপের এ সংক্ষিপ্ত সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব পুরোপুরিই হুমকির মুখে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, আরব সাগর থেকে ইউরোপে যাওয়া একটি তেল ট্যাংকারের পথ পরিবর্তনে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ দিন বেশি সময় লাগে।

এ দীর্ঘ যাত্রার কারণে একদিকে যেমন জ্বালানি খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়, অন্যদিকে জাহাজ ও নাবিকদের বাড়তি সময় আটকে থাকতে হয়। এর ফলে অন্যান্য রুটে জাহাজের সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও বীমার খরচও আকাশচুম্বী হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শেষ পর্যন্ত উৎপাদক ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

এ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করার পর শিপিং কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে জাহাজ ঘুরিয়ে নিতে শুরু করে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহন ২০২৩ সালের ৯৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৪ সালে মাত্র ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস নাগাদ সুয়েজ খাল দিয়ে পণ্য চলাচলের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনার তুলনায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করা
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করা

বর্তমানে প্রণালীটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

এ সংকটের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা। ইরান ও ওমানের মাঝের হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহিগর্মন পথের মূল পথ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার জেরে এ জলপথেও যাতায়াত মারাত্মকভাবে কমে গেছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে যেখানে দৈনিক ২ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল ছিল তা কমে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র ৪৯ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।

এ পরিস্থিতির মোকাবিলায় সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে আরও বেশি অপরিশোধিত তেল পাঠানো শুরু করেছে। এটি তাদের হরমুজ রুট এড়িয়ে চলার সুযোগ করে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে।

এ জলপথ দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রবাহ ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দৈনিক ৫৪ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দৈনিক ৮১ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ফলে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সীমিত রপ্তানি যখন নানামুখী চাপে, তখন লোহিত সাগর পথটি জ্বালানি বাজারের জন্য একটি বড় স্বস্তির উৎস হয়ে উঠেছে।

ইউরোপের যাওয়ার জন্য সৌদি থেকে তেল ট্যাংকারগুলো বাব আল-মান্দেব পার না করেই সরাসরি সুয়েজ খাল বা মিশরের সুমেড পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তরে চলে যেতে পারে। কিন্তু ইয়ানবু বন্দর থেকে এশিয়ার মূল ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো তেলবাহী জাহাজগুলোকে সাধারণত বাব আল-মান্দেব হয়েই দক্ষিণে যেতে হয়। এখন এই পথটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল এক যাত্রায় পরিণত হয়েছে।

উপকূল দখলে রাখার অর্থ কি প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করা?

ইয়েমেনের ভূখণ্ডে হুথিদের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ সামুদ্রিক বাণিজ্যিক রুটে বিঘ্ন ঘটানোর ক্ষমতা বাড়ালেও, এর অর্থ এই নয় যে তারা পুরো জলপথের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য পেয়ে গেছে।

প্রণালিটির পশ্চিম পাশেই রয়েছে জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মতো দেশগুলো, আর আন্তর্জাতিক মূল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের রুটটি মূলত আফ্রিকার উপকূল ঘেঁষেই। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উন্মুক্ত সাগর বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সংযোগকারী প্রণালিগুলোতে অবাধ চলাচলের পূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে।

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক সনদ অনুযায়ী, যেকোনো জলযান ও বিমানের এ পথ দিয়ে স্বাধীনভাবে যাতায়াত করার অধিকার রয়েছে এবং তা কোনো অবস্থাতেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এর ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসেও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) বলেছিল, আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন এ জলপথ দিয়ে যান চলাচলে কোনো ধরনের হুমকি, বাধা, বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের কোনো সুযোগ নেই।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

/এমএকে/