শিরোনাম

যে কারণে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট পদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আইনস্টাইন

সিটিজেন ডেস্ক
যে কারণে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট পদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আইনস্টাইন
বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। ছবি: বিবিসি

বিজ্ঞানের ইতিহাসে আলবার্ট আইনস্টাইনের অবদান সর্বজনবিদিত। কিন্তু বিশ্বরাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তার যুক্ত হওয়ার এক ঐতিহাসিক কিন্তু উপেক্ষিত অধ্যায় তৈরি হয়েছিল ১৯৫২ সালে। তৎকালীন নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বায়োকেমিস্ট খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন এই সর্বোচ্চ ও সম্মানজনক পদের জন্য আইনস্টাইনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে এক নতুন রাষ্ট্রের প্রতীকী প্রধান হিসেবে বিশ্বখ্যাত এই পদার্থবিজ্ঞানীর নাম প্রস্তাব করা হলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন, যা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট পদটি ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী, যেখানে প্রশাসনিক সমস্ত ক্ষমতা নিহিত থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। ১৯৫২ সালে তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূত আব্বা ইবনের মাধ্যমে বছর ৭৩-এর আইনস্টাইনের কাছে এ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়। ১৯৩-এর দশকে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর জার্মানিতে ইহুদি নিধনের হাত থেকে বাঁচতে ১৯৩৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এ বিজ্ঞানী তখন প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডিজ এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইবনের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, এ পদের জন্য আইনস্টাইনকে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়তে হবে না, তবে তাকে নিউ জার্সি ছেড়ে ইসরায়েলে চলে আসতে হবে।

কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ সমস্যা নিয়ে সারাজীবন কাজ করা আইনস্টাইন নিজেকে মানুষের সঙ্গে আচরণ করা কিংবা দপ্তরের দায়িত্ব পালনের জন্য সহজাত দক্ষতাহীন বলে মনে করেছিলেন। গভীর দুঃখ প্রকাশ করে লেখা চিঠিতে তিনি জানান, ইহুদি জনগণের সঙ্গে তার আত্মিক বন্ধন গভীর হলেও তিনি এত উচ্চ পদের দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য নন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়নও নাকি আইনস্টাইনের এ প্রত্যাখ্যানে মনে মনে স্বস্তি পেয়েছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন আইনস্টাইনের স্বাধীনচেতা রাজনৈতিক মনোভাব তার নিজস্ব নীতিমালার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে।

আইনস্টাইনের এ প্রত্যাখ্যানের পেছনে কেবল তার প্রশাসনিক অদক্ষতার ব্যক্তিগত অনুভূতির কারণ ছিল না, বরং ইসরায়েল ও জায়নবাদ সম্পর্কে তার সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শনও জড়িয়ে ছিল। তিনি ১৯২১ সাল থেকেই ভাইৎসম্যানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং জায়নবাদের এমন এক বামপন্থী শাখা বা আদর্শকে সমর্থন করতেন, যা ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদিদের সমান অধিকারসহ দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলত। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে লেখা এক চিঠিতেও তিনি জায়নবাদী আদর্শকে একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের পথ হিসেবে সমর্থন করেছিলেন। তবে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশটির চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের কঠোর বিরোধিতা করেছিলেন আইনস্টাইন। বিশেষ করে, আধাসামরিক সংগঠন ইরগুন এবং তার নেতা মেনাখেম বেগিনের মার্কিন সফরের সমালোচনা করে ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে নিউইয়র্ক টাইমসে এক খোলা চিঠি লিখেছিলেন তিনি ও অন্যান্য ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা। দেইর ইয়াসিন গ্রামে চালানো গণহত্যার সঙ্গে জড়িত বেগিনের নবগঠিত হারুত দলকে তারা রাজনৈতিক দর্শন ও সামাজিক প্রভাবের দিক থেকে নাৎসি ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

ঐতিহাসিক চিঠিটি ২০২৪ সালেও নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা গাজার পরিস্থিতিকে হলোকাস্টের সাথে তুলনা করেন। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ রিচার্ড ক্রোকেটের মতে, আইনস্টাইনের এ বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকেই নিজের সুবিধা অনুযায়ী আইনস্টাইনকে ইসরায়েলের সমর্থক বা সমালোচক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তার মূল প্রতিশ্রুতি ছিল বৃহত্তর আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি। আইনস্টাইন মূলত বেথ শোলোম নামক এক ইহুদি বুদ্ধিজীবী আন্দোলনের অংশ ছিলেন, যেখানে হান্না আরেন্ড এবং মার্টিন বুবারের মতো চিন্তাবিদেরা আরব-ইহুদি সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলতেন। তবে বর্তমান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারের কাছে এমন ভিন্নমতাবলম্বীদের দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো ভিন্নমত বা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য হতো। শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইনের প্রত্যাখ্যানের পর ইতিহাসবিদ আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হন। পরবর্তীতে সমালোচিত হারুত দলই কালক্রমে লিকুদ পার্টিতে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমান ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করছে।

সূত্র: বিবিসি

/এমএকে/