শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কৌশলগত সুবিধা’ চায় তেহরান

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কৌশলগত সুবিধা’ চায় তেহরান
ইরানের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে আইআরজিসির এক সেনা

ইরাকে এক মার্কিন সেনার মৃত্যুর পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। টানা নবম রাতের মতো দেশটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার দাবি করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

রবিবার গভীর রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত উভয় পক্ষের সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, সংঘাত এখনো থামার কোনো ইঙ্গিত মিলছে না।

ইরানে নবম দফার হামলার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার (২০ জুলাই) গ্রিনিচ মান সময় রাত ২টার দিকে তারা ইরানের বিরুদ্ধে নবম দফার হামলা সম্পন্ন করেছে।

সেন্টকমের এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও দুর্বল করাই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযানে ইরানের সামরিক কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সামরিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

তবে হামলা কোথায় কোথায় হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সেন্টকম।

এদিকে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খোরমোজ শহরের একটি এলাকাও মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, রবিবার (১৯ জুলাই) গভীর রাতে ওই এলাকায় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে জাহাজ দুটিকে থামিয়ে দেওয়া হয়।

আইআরজিসির দাবি, মার্কিন চাপের মুখে জাহাজ দুটি কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছিল।

এক বিবৃতিতে বাহিনীটি বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পথ দিয়ে রাসায়নিক সার, তেল কিংবা গ্যাস পরিবহন নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালিও নিরাপদ থাকবে না বলে সতর্ক করেছে তারা।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য তদারকি সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমানের কুমজার উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে এটি হামলার ফল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবি

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলের কেরমানশাহ প্রদেশের ইসলামাবাদ-ই-গার্ব এলাকার আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর একটি উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটি গুলি করে নামানো হয়।

জর্ডানে হামলার দাবি, বাহরাইনে সতর্কতা

আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে অবস্থান করা মার্কিন সি-১৭ পরিবহন বিমান ও পি-৮ নজরদারি বিমান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এতে কয়েকটি বিমান গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া জর্ডানের আজরাকে অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ২০টি হ্যাঙ্গার ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছে আইআরজিসি।

তবে এসব দাবির সত্যতা যুক্তরাষ্ট্র বা জর্ডানের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

এদিকে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। দূতাবাস জানিয়েছে, ইরান মধ্য মানামার কিছু এলাকায় হামলার চেষ্টা করতে পারে এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।

সেখানে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকতে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলতে এবং সাইরেন বা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।

যেভাবে নিহত হলেন মার্কিন সেনা

সেন্টকম জানিয়েছে, শনিবার (১৮ জুলাই) উত্তর ইরাকে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছিল। পরে ড্রোনটির অবিস্ফোরিত যুদ্ধাস্ত্র নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করার সময় নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একজন মার্কিন সেনা নিহত হন।

এর আগে গত সপ্তাহে জর্ডানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ এই মৃত্যুর পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরালো করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

নিহত সেনাদের কথা তুলে ট্রাম্প যা বললেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি সম্মান জানাতেই ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছে।

নিউ জার্সিতে বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ রাতেও আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হেনেছি। সম্ভবত আমরা তা করেছি তিনজন মহান দেশপ্রেমিকের সম্মানে।’

সামরিক হতাহতের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, এই মৃত্যুতে তারা গভীরভাবে শোকাহত। তার ভাষায়, নিহত সেনারা এমন একটি লক্ষ্য নিয়েই দায়িত্ব পালন করছিলেন, যাতে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।

আলোচনার আগে ‘কৌশলগত সুবিধা’ চায় তেহরান

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের আগে রণক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাতে চায় তেহরান।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যেকোনো যুদ্ধের সমাপ্তি হয় হয় সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে, নয়তো আলোচনার মাধ্যমে। তবে আলোচনায় বসার সময় তখনই আসে, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়।

আরাঘচির ভাষায়, মানুষের জীবন ও একটি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়া যায় না। তাই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

/এমআর/