৬ দফা দাবিতে কাল জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে জেন-জি বিক্ষোভ

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
৬ দফা দাবিতে কাল জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে জেন-জি বিক্ষোভ
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে জার্মানির মিউনিখে ফরাসি কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সামরিক খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন তরুণেরা। ‘জেন-জি’ উদ্যোগের ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের অংশ নেওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিক্ষোভের আয়োজকদের সাংগঠনিক পরিচয় ও কাঠামো স্পষ্ট না হওয়ায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলো এখনো এতে সংহতি জানায়নি।

ইউরোপের কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় জার্মানিতেও আগামীকালের কর্মসূচি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিভিন্ন শহরের কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনার পর জার্মানিতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায় বিভিন্ন দাবিতে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমেছেন। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, আবার কোথাও দুর্নীতির প্রতিবাদে আন্দোলন হয়েছে। এসব কর্মসূচির কয়েকটি সহিংস রূপ নেয়। দোকানপাটে লুটপাট, ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

জার্মানিতে আগামীকালের বিক্ষোভ কারা সংগঠিত করছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ‘জেন-জি’ নামের একটি উদ্যোগ থেকে কর্মসূচির ঘোষণা এলেও এর নেপথ্যে কারা রয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে দেওয়া যোগাযোগের ঠিকানাও গত এক সপ্তাহে দুবার পরিবর্তন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ওয়েবসাইটে সুইজারল্যান্ডের একটি ঠিকানা উল্লেখ করা হয়।

টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশব্যাপী এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষোভের প্রচার চালানো হচ্ছে।

জার্মানির এআরডি টেলিভিশনের অনলাইন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়োজকদের সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিচয় নিয়ে অস্পষ্টতার কারণে দেশটির ফেডারেল ছাত্রপ্রতিনিধি সংগঠন ‘বুন্দেশ সুলার কনফারেন্স’ এই বিক্ষোভ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। তবে আগামী ২০ নভেম্বর বার্লিনে নিজেদের উদ্যোগে পৃথক প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করছে সংগঠনটি। এতে শিক্ষক ও অন্যান্য যুব আন্দোলনের প্রতিনিধিদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

বার্লিনের ফ্রাই ইউনিভার্সিটির আন্তবিষয়ক শান্তি ও সংঘাত গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক ইয়ানিস ইউলিয়ান গ্রিমের মতে, নতুন কোনো প্রতিবাদ আন্দোলনের শুরুতে শিথিল সাংগঠনিক কাঠামো থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর নির্ভর করেই সাধারণত কর্মসূচি শুরু হয়। পরে দায়িত্ব বণ্টন, মুখপাত্র নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরির মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে তিনি ‘ফ্রাইডে ফর ফিউচার’ আন্দোলনের উদাহরণ দেন।

আন্দোলনকারীদের ছয় দাবি

বিক্ষোভের আয়োজকেরা তাদের ওয়েবসাইটে ছয়টি দাবি তুলে ধরেছেন। প্রথম দাবিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদকাসক্তি নিরাময় কর্মসূচি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এসব খাতে বাজেট কমানোর বিরোধিতাও করেছেন তারা।

দ্বিতীয় দাবিতে সবার জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় করার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট ও উদ্বেগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

তৃতীয় দাবিতে তরুণ প্রজন্মের ওপর সাশ্রয়ের বাড়তি চাপ না দিয়ে সমাজের সব শ্রেণির মধ্যে ব্যয়ের দায় ন্যায্যভাবে বণ্টনের কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থ দাবিতে সামরিক খাতে ব্যয় কমানো এবং ১৮ বছর বয়সের পর বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে নিয়োগের বিরোধিতা করা হয়েছে। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বানও রয়েছে এতে।

পঞ্চম দাবিতে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে নজরদারি ব্যবস্থা ক্রমাগত সম্প্রসারণ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। আর ষষ্ঠ দাবিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর জলবায়ু সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

গবেষক গ্রিমের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী এবং অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।

এদিকে জার্মানির পরিবেশবাদী দল গ্রিন পার্টির সভাপতি ফেলিক্স বানাসাক আন্দোলনকারীদের সবাইকে সন্দেহের চোখে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটির সংবাদমাধ্যম নেটওয়ার্ক আরএনডিকে তিনি বলেন, বিক্ষোভ শুরুর আগেই একে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা সব আন্দোলনকারীকে সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। এ ধরনের প্রবণতা বরং কিছু তরুণকে আরও উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তার মতে, তরুণদের দাবিগুলো নিয়ে রাজনৈতিকভাবে গঠনমূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

তবে সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না জার্মানির নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আহ্বান এখন পর্যন্ত তাদের নজরে আসেনি। তবে বামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীর কিছু অংশ এবং বিদেশের কয়েকটি সংগঠন এই কর্মসূচির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। জার্মানিতেও এ ধরনের গোষ্ঠীগুলো সহিংস আন্দোলনের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

/এমআর/