থাইল্যান্ড ভেঙে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
থাইল্যান্ড ভেঙে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা
মানচিত্র

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে দুই দশকের অধিক সময় ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাত্তানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াতসহ ৪ প্রদেশ নিয়ে স্বাধীন ইসলামিক দেশ গঠনের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেছে সেখানকার প্রধান সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল’ (বিআরএন)।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলটির মুখপাত্র নিকামাতুল্লাহ সেরি এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। বলেছেন, ‘এই সংগ্রাম কেয়ামত পর্যন্ত চলবে।’

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে মালয় মুসলিম অধ্যুষিত। এটি একসময় পূর্বতন মালয়-মুসলিম পাতানি সালতানাতের অংশ ছিল। কিন্তু ১৯০০-এর দশকের গোড়ার দিকে বৌদ্ধ-সংখ্যাগরিষ্ঠ থাইল্যান্ড (তৎকালীন সিয়াম) এটি দখল করে নেয়।

পরে ১৯৬০-এর দশক থেকে স্থানীয় মালয় মুসলিম জনগোষ্ঠী থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের জন্য লড়াই করে আসছে। তবে ২০০৪ সাল থেকে এই লড়াই নতুন করে মারাত্মক আকার ধারণ করে। সম্প্রতি সেখানে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

পর্যবেক্ষক সংস্থা ডিপ সাউথ ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে গত দুই দশকে সহিংসতায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী, থাই নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকসহ ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় থাইল্যান্ড সরকার ২০১৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় বিআরএনর সঙ্গে আলোচনা করে আসছে। যার সর্বশেষ উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনা ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

কিন্তু প্রক্রিয়াটি বারবার থমকে গেছে। জুলাই মাসে এক হামলায় পাঁচজন সৈন্য নিহত হওয়ার পর ব্যাংকক আলোচনা স্থগিত করে।

নিকমাতুল্লাহ সাম্প্রতিক সহিংসতা বৃদ্ধির ঘটনায় বিআরএনর দায় স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। তবে বলেছেন, এটিই ছিল সংগ্রামের পেছনের চালিকাশক্তি।

তিনি জানান, বিআরএন ওই অঞ্চলে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি প্রস্তাব দিয়েছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সংগঠনটি নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা গ্রহণ করবে।

নিকমাতুল্লাহ বলেন, তারা প্রথমে ৫ থেকে ১০ বছর অঞ্চলটি শাসন করবে। এই সময়ে সেখানে শরিয়াহ পুলিশ এবং ইসলামী আইন অনুসরণকারী আদালত থাকবে, যা শুধুমাত্র মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এরপর আমরা গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের হাতে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত তুলে দেব।

নিকমাতুল্লাহ বলেছেন, জাতিগত মালয় মুসলিমরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে প্রকাশ্য বৈষম্যের শিকার হন এবং 'কখনোই নিরাপদ বোধ করেননি’।

তবে থাইল্যান্ড এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ব্যাংককের প্রধান আলোচক থানুত সুবর্ণানন্দ আগস্ট মাসে স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আলোচনার টেবিলে আলাদা হওয়ার বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতি অঞ্চল তৈরি এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহতকারী চেকপয়েন্ট ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কমানোর বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

২০০৫ সাল থেকে অঞ্চলটি বিশেষ নিরাপত্তা আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এটি থাই কর্তৃপক্ষকে বিনা অভিযোগে সন্দেহভাজনদের আটক এবং কারফিউ জারি করার ক্ষমতা দেয়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এর সমালোচনা করেছে।

থাই কর্তৃপক্ষের মতে, জুলাই মাসে একটি চেকপয়েন্টে গুলি ও বোমা হামলায় পাঁচজন থাই সৈন্য নিহত এবং ছয়জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর থাইল্যান্ড আলোচনা স্থগিত করেছে। তবে তারা এই প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার বিষয়টিও জোর দিয়েছে।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের জন্য তারা একটি ত্রিবিধ পন্থা অবলম্বনে মনোনিবেশ করেছে, সেটা হলো ‘ সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং শান্তি আলোচনা’।

এদিকে নিকমাতুল্লাহ বলেছেন, মালয়েশীয় মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতির কারণে শান্তি আলোচনা ব্যাহত হয়েছে। তবে বিআরএন অক্টোবরে থাইল্যান্ডের সঙ্গে ‘গোপন আলোচনায়’ যেতে পারে।

মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ খালেদ নরদিন বলেছেন, নতুন একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, কুয়ালালামপুরের অগ্রাধিকার হলো একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড সরকার ও দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় দক্ষিণ থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলেও পড়ে।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় বিআরএন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সামনে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে মালয় পরিচয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মর্যাদা স্বীকৃতি, সংঘাত-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের মুক্তি এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বিশেষ অর্থনৈতিক করিডর (এসইসি) প্রকল্প বন্ধের দাবি।

তবে থাইল্যান্ড সরকার বলছে, রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই।

নিকমাতুল্লাহ বলেছেন, বিআরএন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এই সংগ্রাম ক্ষণস্থায়ী নয়। এতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

সূত্র: এএফপি, ফ্রান্স২৪, মালয় মেইল

/জেএইচ/