ইরান যুদ্ধ: নতুন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কা

ইরান যুদ্ধ: নতুন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কা
সিটিজেন ডেস্ক

শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি শহর ক্যান্ডিতে এক রৌদ্রোজ্জ্বল মার্চ সকালে টুকটুক চালক কীর্তি রথনা জ্বালানি কেনার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন।
সরকার নির্ধারিত রেশন অনুযায়ী তিনি সপ্তাহে ২০ লিটার (প্রায় ৫ গ্যালন) পেট্রোল পান। আগে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় জ্বালানি কিনতে পারতেন, কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
যুদ্ধের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
শ্রীলঙ্কা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশটির এক মাসের বেশি জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই। ফলে পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার কিউআরভিত্তিক জ্বালানি রেশন ব্যবস্থা চালু করে, যা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও ব্যবহৃত হয়েছিল।
নতুন রেশন অনুযায়ী মোটরবাইক সপ্তাহে ৮ লিটার, টুকটুক ২০ লিটার, গাড়ি ২৫ লিটার, বাস ১০০ লিটার ডিজেল এবং লরি ২০০ লিটার ডিজেল পাচ্ছে।
তবে এই সীমিত জ্বালানির দামও বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে সার সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। কারণ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে এশিয়াজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনেক শ্রীলঙ্কানের জন্য এই পরিস্থিতি আবারও ২০২২ সালের সেই অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যেটিকে তারা অতীতে ফেলে এসেছে বলে মনে করেছিল।
‘পরিচিত ব্যবস্থা, তবে এবার নতুন ধাক্কা’
চার বছর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের শাসনামলে অর্থনৈতিক সংকটের সময় শ্রীলঙ্কার জনগণ জ্বালানি রেশনিং ও মূল্যবৃদ্ধির একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
তৎকালীন সরকারকে এমন নীতি গ্রহণের জন্য সমালোচনা করা হয়, যা শ্রীলঙ্কাকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ (ডিফল্ট) অবস্থায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে সরকার জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি সীমিত করতে বাধ্য হয়, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
২০২২ সালের জুলাইয়ে তরুণদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মুখে গোতাবায়া রাজাপাকস দেশ ত্যাগ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মধ্যবয়সী টুকটুক চালক কীর্তি রথনা বলেন, আগের অর্থনৈতিক সংকট এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, এবার শ্রীলঙ্কায় ২০২৪ সালে একটি বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং বর্তমান সংকটের দায় পুরোপুরি সরকারের ওপর চাপানো যাচ্ছে না, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তিনি বলেন, ‘এবার কেউ এই সরকারের ওপর দোষ চাপাতে পারে না, কারণ ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শ্রীলঙ্কার হাতে নেই।’
তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা দিসানায়েকের নেতৃত্বাধীন সরকারকে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে চাপে শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার মুখপাত্র ও মন্ত্রী নালিন্দা জয়াতিসসা জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া ১২ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। তবে জ্বালানির দাম কমলে বাসভাড়াও পুনরায় কমানো হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে সাধারণ শ্রীলঙ্কানদের জন্য এই আশ্বাস খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ তাদের আয় বাড়েনি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে।
ট্রিকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শিরান ইলানপেরুমা বলেন, জ্বালানি সংকটের পরোক্ষ প্রভাব শ্রীলঙ্কার জন্য অত্যন্ত গুরুতর হতে যাচ্ছে।
তিনি জানান, জ্বালানির দাম বাড়ানো সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা সরকার প্রতি মাসে প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনছে বলে জয়াতিসসা উল্লেখ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সরকার পেট্রোলের যে দাম বাড়িয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের বৃদ্ধির তুলনায় কম। ফলে সরকার কার্যত ভর্তুকি দিয়ে জনগণের জন্য জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
তিনি বলেন, এই ভর্তুকির ফলে যে লোকসান হচ্ছে, সেটি পুরো আন্তর্জাতিক মূল্য চাপিয়ে দিলে অর্থনীতির যে ক্ষতি হতো তার চেয়ে কম। কারণ তখন পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত, কাজকর্ম স্থবির হয়ে যেত এবং কর্মসংস্থানে বড় সংকট তৈরি হতো।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংকটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও সরকার জনগণকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
জ্বালানি রেশনিংয়ের পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা ‘সাপ্তাহিক একদিন কর্মবিরতি’ নীতি চালু করেছে। এর আওতায় জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি অফিস ও স্কুল প্রতি বুধবার বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি
যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর শ্রীলঙ্কা সরকার মস্কো থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনায় এগোচ্ছে। এ লক্ষ্যে রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী রোমান মার্শাভিন সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সফর করে আলোচনা করেছেন।
ট্রিকন্টিনেন্টালের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ইলানপেরুমা বলেছেন, শ্রীলঙ্কা রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়মূল্যে জ্বালানি কেনার জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে যেতে পারে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর তেল শোধনাগারগুলো রাশিয়ার জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ইরানের পক্ষ থেকে জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তবে দেশটির নিজস্ব জাহাজ না থাকায় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিসভার মুখপাত্র জয়াতিসসা।
এদিকে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লিট্রো গ্যাস দেশের এলপিজি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ৮ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন।
সরকার জানিয়েছে, নতুন অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং কিছু এলপিজি মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর ছোট নৌযানের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় আনা হবে।
এলপিজি বিক্রেতা মোহাম্মদ সাহির জানান, বাজারে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং আতঙ্কজনিত ক্রয় এই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় এলপিজির দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘আমরা বিপদে পড়তে যাচ্ছি’
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ইলানপেরুমা বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে সরকারের হাতে জ্বালানি রেশনিং, জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই।
মাঝারি মেয়াদে তিনি শ্রীলঙ্কার জন্য জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, উন্নত দেশগুলোর মতো দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি মজুত রাখার পর্যাপ্ত অবকাঠামো শ্রীলঙ্কার নেই।
তিনি বলেন, দেশটি মূলত তিনটি সংরক্ষণ স্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি মজুত রাখে, যা মাত্র এক মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তবে শ্রীলঙ্কার সরকার জানিয়েছে, আরও আটটি নতুন সংরক্ষণ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত এক সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়া ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিনকোমালিতে ঔপনিবেশিক আমলের একটি জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্র সংস্কার ও ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইলানপেরুমা সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধারাবাহিকভাবে ব্যাহত হলে শুধু জ্বালানি নয়, শ্রীলঙ্কার খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার মতে, সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। চীন যদি তা সংগ্রহ করতে না পারে, তবে এর সরাসরি প্রভাব শ্রীলঙ্কার খাদ্য সরবরাহেও পড়বে।
অন্যদিকে টুকটুক চালক কীর্তি রথনার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এক ধরনের অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটে জাহাজগুলো দেশজুড়ে নোঙর করলেও তখন সরকারের কাছে অর্থ ছিল না জ্বালানি কেনার জন্য। আর এখন সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকলেও জ্বালানি বহনকারী জাহাজ আসছে না।
সূত্র: আল জাজিরা

শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি শহর ক্যান্ডিতে এক রৌদ্রোজ্জ্বল মার্চ সকালে টুকটুক চালক কীর্তি রথনা জ্বালানি কেনার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন।
সরকার নির্ধারিত রেশন অনুযায়ী তিনি সপ্তাহে ২০ লিটার (প্রায় ৫ গ্যালন) পেট্রোল পান। আগে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় জ্বালানি কিনতে পারতেন, কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
যুদ্ধের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
শ্রীলঙ্কা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশটির এক মাসের বেশি জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই। ফলে পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার কিউআরভিত্তিক জ্বালানি রেশন ব্যবস্থা চালু করে, যা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও ব্যবহৃত হয়েছিল।
নতুন রেশন অনুযায়ী মোটরবাইক সপ্তাহে ৮ লিটার, টুকটুক ২০ লিটার, গাড়ি ২৫ লিটার, বাস ১০০ লিটার ডিজেল এবং লরি ২০০ লিটার ডিজেল পাচ্ছে।
তবে এই সীমিত জ্বালানির দামও বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে সার সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। কারণ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে এশিয়াজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনেক শ্রীলঙ্কানের জন্য এই পরিস্থিতি আবারও ২০২২ সালের সেই অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যেটিকে তারা অতীতে ফেলে এসেছে বলে মনে করেছিল।
‘পরিচিত ব্যবস্থা, তবে এবার নতুন ধাক্কা’
চার বছর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের শাসনামলে অর্থনৈতিক সংকটের সময় শ্রীলঙ্কার জনগণ জ্বালানি রেশনিং ও মূল্যবৃদ্ধির একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
তৎকালীন সরকারকে এমন নীতি গ্রহণের জন্য সমালোচনা করা হয়, যা শ্রীলঙ্কাকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ (ডিফল্ট) অবস্থায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে সরকার জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি সীমিত করতে বাধ্য হয়, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
২০২২ সালের জুলাইয়ে তরুণদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মুখে গোতাবায়া রাজাপাকস দেশ ত্যাগ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মধ্যবয়সী টুকটুক চালক কীর্তি রথনা বলেন, আগের অর্থনৈতিক সংকট এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, এবার শ্রীলঙ্কায় ২০২৪ সালে একটি বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং বর্তমান সংকটের দায় পুরোপুরি সরকারের ওপর চাপানো যাচ্ছে না, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তিনি বলেন, ‘এবার কেউ এই সরকারের ওপর দোষ চাপাতে পারে না, কারণ ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শ্রীলঙ্কার হাতে নেই।’
তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা দিসানায়েকের নেতৃত্বাধীন সরকারকে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে চাপে শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার মুখপাত্র ও মন্ত্রী নালিন্দা জয়াতিসসা জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া ১২ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। তবে জ্বালানির দাম কমলে বাসভাড়াও পুনরায় কমানো হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে সাধারণ শ্রীলঙ্কানদের জন্য এই আশ্বাস খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ তাদের আয় বাড়েনি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে।
ট্রিকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শিরান ইলানপেরুমা বলেন, জ্বালানি সংকটের পরোক্ষ প্রভাব শ্রীলঙ্কার জন্য অত্যন্ত গুরুতর হতে যাচ্ছে।
তিনি জানান, জ্বালানির দাম বাড়ানো সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা সরকার প্রতি মাসে প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনছে বলে জয়াতিসসা উল্লেখ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সরকার পেট্রোলের যে দাম বাড়িয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের বৃদ্ধির তুলনায় কম। ফলে সরকার কার্যত ভর্তুকি দিয়ে জনগণের জন্য জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
তিনি বলেন, এই ভর্তুকির ফলে যে লোকসান হচ্ছে, সেটি পুরো আন্তর্জাতিক মূল্য চাপিয়ে দিলে অর্থনীতির যে ক্ষতি হতো তার চেয়ে কম। কারণ তখন পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত, কাজকর্ম স্থবির হয়ে যেত এবং কর্মসংস্থানে বড় সংকট তৈরি হতো।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংকটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও সরকার জনগণকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
জ্বালানি রেশনিংয়ের পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা ‘সাপ্তাহিক একদিন কর্মবিরতি’ নীতি চালু করেছে। এর আওতায় জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি অফিস ও স্কুল প্রতি বুধবার বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি
যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর শ্রীলঙ্কা সরকার মস্কো থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনায় এগোচ্ছে। এ লক্ষ্যে রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী রোমান মার্শাভিন সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সফর করে আলোচনা করেছেন।
ট্রিকন্টিনেন্টালের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ইলানপেরুমা বলেছেন, শ্রীলঙ্কা রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়মূল্যে জ্বালানি কেনার জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে যেতে পারে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর তেল শোধনাগারগুলো রাশিয়ার জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ইরানের পক্ষ থেকে জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তবে দেশটির নিজস্ব জাহাজ না থাকায় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিসভার মুখপাত্র জয়াতিসসা।
এদিকে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লিট্রো গ্যাস দেশের এলপিজি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ৮ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন।
সরকার জানিয়েছে, নতুন অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং কিছু এলপিজি মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর ছোট নৌযানের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় আনা হবে।
এলপিজি বিক্রেতা মোহাম্মদ সাহির জানান, বাজারে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং আতঙ্কজনিত ক্রয় এই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় এলপিজির দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘আমরা বিপদে পড়তে যাচ্ছি’
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ইলানপেরুমা বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে সরকারের হাতে জ্বালানি রেশনিং, জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই।
মাঝারি মেয়াদে তিনি শ্রীলঙ্কার জন্য জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, উন্নত দেশগুলোর মতো দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি মজুত রাখার পর্যাপ্ত অবকাঠামো শ্রীলঙ্কার নেই।
তিনি বলেন, দেশটি মূলত তিনটি সংরক্ষণ স্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি মজুত রাখে, যা মাত্র এক মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তবে শ্রীলঙ্কার সরকার জানিয়েছে, আরও আটটি নতুন সংরক্ষণ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত এক সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়া ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিনকোমালিতে ঔপনিবেশিক আমলের একটি জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্র সংস্কার ও ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইলানপেরুমা সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধারাবাহিকভাবে ব্যাহত হলে শুধু জ্বালানি নয়, শ্রীলঙ্কার খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার মতে, সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। চীন যদি তা সংগ্রহ করতে না পারে, তবে এর সরাসরি প্রভাব শ্রীলঙ্কার খাদ্য সরবরাহেও পড়বে।
অন্যদিকে টুকটুক চালক কীর্তি রথনার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এক ধরনের অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটে জাহাজগুলো দেশজুড়ে নোঙর করলেও তখন সরকারের কাছে অর্থ ছিল না জ্বালানি কেনার জন্য। আর এখন সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকলেও জ্বালানি বহনকারী জাহাজ আসছে না।
সূত্র: আল জাজিরা

ইরান যুদ্ধ: নতুন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কা
সিটিজেন ডেস্ক

শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি শহর ক্যান্ডিতে এক রৌদ্রোজ্জ্বল মার্চ সকালে টুকটুক চালক কীর্তি রথনা জ্বালানি কেনার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন।
সরকার নির্ধারিত রেশন অনুযায়ী তিনি সপ্তাহে ২০ লিটার (প্রায় ৫ গ্যালন) পেট্রোল পান। আগে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় জ্বালানি কিনতে পারতেন, কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
যুদ্ধের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
শ্রীলঙ্কা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশটির এক মাসের বেশি জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই। ফলে পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার কিউআরভিত্তিক জ্বালানি রেশন ব্যবস্থা চালু করে, যা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও ব্যবহৃত হয়েছিল।
নতুন রেশন অনুযায়ী মোটরবাইক সপ্তাহে ৮ লিটার, টুকটুক ২০ লিটার, গাড়ি ২৫ লিটার, বাস ১০০ লিটার ডিজেল এবং লরি ২০০ লিটার ডিজেল পাচ্ছে।
তবে এই সীমিত জ্বালানির দামও বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে সার সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। কারণ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে এশিয়াজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনেক শ্রীলঙ্কানের জন্য এই পরিস্থিতি আবারও ২০২২ সালের সেই অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যেটিকে তারা অতীতে ফেলে এসেছে বলে মনে করেছিল।
‘পরিচিত ব্যবস্থা, তবে এবার নতুন ধাক্কা’
চার বছর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের শাসনামলে অর্থনৈতিক সংকটের সময় শ্রীলঙ্কার জনগণ জ্বালানি রেশনিং ও মূল্যবৃদ্ধির একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
তৎকালীন সরকারকে এমন নীতি গ্রহণের জন্য সমালোচনা করা হয়, যা শ্রীলঙ্কাকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ (ডিফল্ট) অবস্থায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে সরকার জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি সীমিত করতে বাধ্য হয়, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
২০২২ সালের জুলাইয়ে তরুণদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের মুখে গোতাবায়া রাজাপাকস দেশ ত্যাগ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মধ্যবয়সী টুকটুক চালক কীর্তি রথনা বলেন, আগের অর্থনৈতিক সংকট এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, এবার শ্রীলঙ্কায় ২০২৪ সালে একটি বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং বর্তমান সংকটের দায় পুরোপুরি সরকারের ওপর চাপানো যাচ্ছে না, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তিনি বলেন, ‘এবার কেউ এই সরকারের ওপর দোষ চাপাতে পারে না, কারণ ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শ্রীলঙ্কার হাতে নেই।’
তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুরা দিসানায়েকের নেতৃত্বাধীন সরকারকে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে চাপে শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার মুখপাত্র ও মন্ত্রী নালিন্দা জয়াতিসসা জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া ১২ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে। তবে জ্বালানির দাম কমলে বাসভাড়াও পুনরায় কমানো হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে সাধারণ শ্রীলঙ্কানদের জন্য এই আশ্বাস খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ তাদের আয় বাড়েনি, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে।
ট্রিকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শিরান ইলানপেরুমা বলেন, জ্বালানি সংকটের পরোক্ষ প্রভাব শ্রীলঙ্কার জন্য অত্যন্ত গুরুতর হতে যাচ্ছে।
তিনি জানান, জ্বালানির দাম বাড়ানো সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা সরকার প্রতি মাসে প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনছে বলে জয়াতিসসা উল্লেখ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সরকার পেট্রোলের যে দাম বাড়িয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের বৃদ্ধির তুলনায় কম। ফলে সরকার কার্যত ভর্তুকি দিয়ে জনগণের জন্য জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
তিনি বলেন, এই ভর্তুকির ফলে যে লোকসান হচ্ছে, সেটি পুরো আন্তর্জাতিক মূল্য চাপিয়ে দিলে অর্থনীতির যে ক্ষতি হতো তার চেয়ে কম। কারণ তখন পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত, কাজকর্ম স্থবির হয়ে যেত এবং কর্মসংস্থানে বড় সংকট তৈরি হতো।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংকটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও সরকার জনগণকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
জ্বালানি রেশনিংয়ের পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা ‘সাপ্তাহিক একদিন কর্মবিরতি’ নীতি চালু করেছে। এর আওতায় জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি অফিস ও স্কুল প্রতি বুধবার বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি
যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর শ্রীলঙ্কা সরকার মস্কো থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনায় এগোচ্ছে। এ লক্ষ্যে রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী রোমান মার্শাভিন সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সফর করে আলোচনা করেছেন।
ট্রিকন্টিনেন্টালের রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ইলানপেরুমা বলেছেন, শ্রীলঙ্কা রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়মূল্যে জ্বালানি কেনার জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে যেতে পারে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর তেল শোধনাগারগুলো রাশিয়ার জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ইরানের পক্ষ থেকে জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তবে দেশটির নিজস্ব জাহাজ না থাকায় সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিসভার মুখপাত্র জয়াতিসসা।
এদিকে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লিট্রো গ্যাস দেশের এলপিজি বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ৮ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন।
সরকার জানিয়েছে, নতুন অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং কিছু এলপিজি মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর ছোট নৌযানের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় আনা হবে।
এলপিজি বিক্রেতা মোহাম্মদ সাহির জানান, বাজারে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং আতঙ্কজনিত ক্রয় এই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কায় এলপিজির দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘আমরা বিপদে পড়তে যাচ্ছি’
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ইলানপেরুমা বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে সরকারের হাতে জ্বালানি রেশনিং, জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই।
মাঝারি মেয়াদে তিনি শ্রীলঙ্কার জন্য জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, উন্নত দেশগুলোর মতো দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি মজুত রাখার পর্যাপ্ত অবকাঠামো শ্রীলঙ্কার নেই।
তিনি বলেন, দেশটি মূলত তিনটি সংরক্ষণ স্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি মজুত রাখে, যা মাত্র এক মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তবে শ্রীলঙ্কার সরকার জানিয়েছে, আরও আটটি নতুন সংরক্ষণ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত এক সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়া ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিনকোমালিতে ঔপনিবেশিক আমলের একটি জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্র সংস্কার ও ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইলানপেরুমা সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধারাবাহিকভাবে ব্যাহত হলে শুধু জ্বালানি নয়, শ্রীলঙ্কার খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার মতে, সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। চীন যদি তা সংগ্রহ করতে না পারে, তবে এর সরাসরি প্রভাব শ্রীলঙ্কার খাদ্য সরবরাহেও পড়বে।
অন্যদিকে টুকটুক চালক কীর্তি রথনার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এক ধরনের অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটে জাহাজগুলো দেশজুড়ে নোঙর করলেও তখন সরকারের কাছে অর্থ ছিল না জ্বালানি কেনার জন্য। আর এখন সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকলেও জ্বালানি বহনকারী জাহাজ আসছে না।
সূত্র: আল জাজিরা




