শিরোনাম

নীল ডায়েরির সূত্র ধরে খোঁজ মিললো সিরিয়ার কুখ্যাত গোয়েন্দাপ্রধানের

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
নীল ডায়েরির সূত্র ধরে খোঁজ মিললো সিরিয়ার কুখ্যাত গোয়েন্দাপ্রধানের

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের এক পরিত্যক্ত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে দামি ব্র্যান্ডের জামাকাপড়, সোনার পদক আর থরে থরে সাজানো নথি। ঘরের এক কোণে পড়ে ছিল একটি সাধারণ নীল ডায়েরি, যাতে লেখা ছিল ১৫৫টি ফোন নম্বর। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হওয়া এ ডায়েরিটিই শেষ পর্যন্ত উন্মোচন করেছে সাবেক একনায়ক বাশার আল-আসাদের সবচেয়ে আতঙ্কের নাম, সিরিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান হুসাম লুকার গোপন আস্তানা।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের রাতে শত শত কোটি টাকার অপরাধের প্রমাণ ও অগণিত স্বজনহারা মানুষের অভিশাপ পেছনে ফেলে নিমিষেই হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন নিষ্ঠুরতার সমর্থক এ গোয়েন্দাপ্রধান।

নীল ডায়েরির সূত্র ধরে খোঁজ মিললো সিরিয়ার কুখ্যাত গোয়েন্দাপ্রধানের

সিরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে হুসাম লুকা পরিচিত ছিলেন ‘দ্য স্পাইডার’ বা ‘মাকড়সা’ নামে। পুরো দেশজুড়ে তথ্যদাতাদের এক বিশাল ও ভয়াল জাল বিছিয়ে রাখার কারণেই তার এ নাম। ২০১১ সালে আসাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান দমনে তিনি যে ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছিলেন, তা এক চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো অবরুদ্ধ করে রাখায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েছিল ইঁদুর খেয়ে বেঁচে থাকতে। এলাকাগুলোর দেয়ালে দেয়ালে লুকার নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখা হতো। জীবন বাঁচাতে চাইলে আত্মসমর্পণ করার কথাও বলা হতো। কিন্তু সেই নম্বরে যোগাযোগের পর নিখোঁজ হয়ে গেছেন হাজারো মানুষ, যাদের সন্ধান আজও মেলেনি।

লুকার নিষ্ঠুরতার অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, ঈদুল আজহার দিনে। হোমসের আল-ওয়ায়ার এলাকায় শিশুরা যখন মাঠে খেলাধুলা করছিল, ঠিক তখন সেখানে বিমান হামলা চালানো হয়। মুহূর্তেই খেলার মাঠ লাল হয়ে যায় রক্তে, প্রাণ হারায় ১৭টি শিশুসহ ২৮ জন সাধারণ মানুষ। এই নৃশংস হামলার মূল কারিগর ছিলেন লুকা নিজেই। এ নিষ্ঠুরতার পুরস্কার হিসেবেই পরবর্তী সময়ে তাকে পদোন্নতি দিয়ে ‘জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেট’-এর প্রধান করা হয়। বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালাতে তিনি ব্যবহার করতেন কুখ্যাত সিদনায়া কারাগার। এটি সাধারণ জনগণের কাছে পরিচিত ছিল মানুষের কসাইখানা হিসেবে।

নীল ডায়েরির সূত্র ধরে খোঁজ মিললো সিরিয়ার কুখ্যাত গোয়েন্দাপ্রধানের (3)

আসাদ সরকারের পতনের পর যখন আন্তর্জাতিকভাবে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তখন তার পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটের সেই নীল ডায়েরি হাতে নেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা। ডায়েরিতে থাকা ১৫৫টি নম্বরের মধ্যে ৫১টি সচল পাওয়া যায়। অনেক কর্মকর্তা ও আত্মীয় পরিচয় পেয়েই ফোন কেটে দিলেও, ধীরে ধীরে ডায়েরির সূত্র ধরে পাওয়া যায় লুকার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ও গাড়িচালকের সন্ধান। জানা যায়, পতনের শেষ রাতে দামেস্ক ছেড়ে না পালানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, গোয়েন্দা কার্যালয়ের সেফ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ লুটে নিয়ে অন্ধকারে উধাও হয়ে যান লুকা।

অনুসন্ধান আরও গভীরে পৌঁছালে বেরিয়ে আসে তার পালানোর রোমাঞ্চকর পথ। হিজবুল্লাহ ও রাশিয়ার সহায়তায় ভুয়া নাম ও একটি আসল রুশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে লেবানন হয়ে তিনি পাড়ি জমান রাশিয়ায়। সেখান থেকেই উদ্ধার হয় লুকার বর্তমান রাশিয়ান নম্বর। পরবর্তীতে ছদ্মবেশে করা এক ফোনালাপে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের সঠিক উত্তর দিয়ে ফাঁদে পা দেন লুকা। কিন্তু সাংবাদিক যখন পরিচয় দিয়ে গণহত্যা ও নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন চরম আতঙ্কে তিনি বলে ওঠেন, আমার বর্তমান অবস্থান থেকে ফোনে কোনো কথা বলা সম্ভব নয়, আপনারা বোঝার চেষ্টা করুন। ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করে, মস্কোর কাছেই লুকিয়ে আছেন এ গোয়েন্দাপ্রধান।

নীল ডায়েরির সূত্র ধরে খোঁজ মিললো সিরিয়ার কুখ্যাত গোয়েন্দাপ্রধানের (2)

যদিও রাশিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় তাকে এখন বিচারের মুখোমুখি করা কঠিন, তবুও আশা হারাননি স্বজনহারারা। হোমসে বোমার আঘাতে নিহত ৭ বছরের শিশু ওয়ায়েলের বাবা মোহাম্মদ তাওয়াকাতলি আজও সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এ ঘাতকের ফাঁসির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নিষ্পাপ শিশুদের রক্তের দাগ কোনোদিন মুছে যেতে পারে না, বিচারের মুখোমুখি তাকে একদিন হতেই হবে।

সূত্র: বিবিসি

/এমএকে/