শিরোনাম
আড়াই শতাব্দীর মহাকাব্য

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস যেন শেকড় আর প্রযুক্তির অনন্য এক মেলবন্ধন

অমিত কুমার মন্ডল
অমিত কুমার মন্ডল
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস যেন শেকড় আর প্রযুক্তির অনন্য এক মেলবন্ধন
প্রতীকী ছবি

আজ ৪ জুলাই, ২০২৬। আড়াই শতাব্দী আগে, ১৭৭৬ সালের এই দিনে ফিলাডেলফিয়ার এক রুদ্ধদ্বার কক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়ে রোপন করা হয়েছিল নতুন স্বপ্নের বীজ। সেই বীজই আজ ২৫০ বছরের এক বিশাল মহীরুহ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ অনন্য এক মাইলফলক– সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল। দীর্ঘ এই পথচলায় ঘাম, রক্ত আর মুক্তির যে নিরলস সংগ্রাম মিশে আছে; তা স্মরণ করেই গোটা যুক্তরাষ্ট্র মিলেছে ইতিহাস, বিনোদন ও দেশপ্রেমের এক অপূর্ব মোহনায়। কংগ্রেস গঠিত ‘আমেরিকা ২৫০’ এবং হোয়াইট হাউস পরিচালিত ‘ফ্রিডম ২৫০’– এর যৌথ আয়োজনে এটি শুধুই একটি উৎসবের উপলক্ষ নয়, বরং জর্জ ওয়াশিংটনের আমল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের এক জীবন্ত মহাকাব্য।

ইতিহাসের শেকড়কে ছুঁয়ে দেখতে স্বাধীনতার সূতিকাগার ফিলাডেলফিয়ায় চলছে ১৬ দিনব্যাপী ‘ওয়াওয়া ওয়েলকাম আমেরিকা’ উৎসব। আগামী প্রজন্মের কাছে আজকের এই উন্মাদনার গল্প পৌঁছে দিতে সেখানে সযত্নে রেখে দেওয়া হচ্ছে একটি বিশেষ টাইম ক্যাপসুল, যা আলোর মুখ দেখবে আরও ২৫০ বছর পর, ঠিক ২২৭৬ সালে। অন্যদিকে, বোস্টনে ‘বোস্টন পপস আতশবাজি প্রদর্শনী’ আর ঐতিহাসিক যুদ্ধগুলোর নিখুঁত পুনর্মঞ্চায়ন দর্শণার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই অগ্নিঝরা বিপ্লবী যুগে। তবে ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় বা অভিনয়েই আটকে নেই; অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তির সাহায্যে জর্জ ওয়াশিংটনের জীবন্ত প্রতিকৃতি নিয়ে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছে ৬টি ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর বা ‘ফ্রিডম ট্রাক’। অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের এমন মেলবন্ধন সত্যিই অভাবনীয়।

এবারের উদ্যাপনে আকাশ, পানি আর মাটি; সবখানেই উৎসবের জাঁকজমক। নিউ ইয়র্ক হারবারে ‘সেইল ফোর্থ ২৫০’ কর্মসূচির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ৩২টি বন্ধুপ্রতিম দেশের আধুনিক রণতরী ও ঐতিহাসিক পাল তোলা জাহাজের বিশাল বহর মার্কিন সামুদ্রিক ঐতিহ্যের জয়গান গাইছে। আর নিউ ইয়র্কের আকাশ আজ রাতের আঁধার ভুলতে বসবে! মেসি’স আতশবাজির ৫০তম বার্ষিকী আর দেশের ২৫০তম জন্মদিন মিলেমিশে একাকার। হাডসন ও ইস্ট রিভারের আকাশ আলোকিত করবে ৮৫ হাজারেরও বেশি আতশবাজি। যেটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম আতশবাজির প্রদর্শনী। সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছে টাইমস স্কয়ারে। শীতের রাতের চিরচেনা ‘বল ড্রপ’ ঐতিহ্য ভেঙে এই প্রথমবারের মতো জুলাইয়ের তপ্ত রাতে নামানো হচ্ছে সেই আইকনিক ক্রিস্টাল বল। আটটি ভিন্ন টাইম জোনকে ছুঁয়ে যেতে আটবার নামবে এই বল, যার কেন্দ্রে রয়েছে ‘গিভিং ফোর্থ’ উদ্যোগের মাধ্যমে এই দিনটিকে জাতীয় সেবামূলক দিন হিসেবে গড়ে তোলার এক মানবিক আহ্বান।

রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মলে বসেছে ‘গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’, যেখানে ৫০টি অঙ্গরাজ্যের সংস্কৃতি, খাবার ও ঐতিহ্যের এক মহামিলন ঘটেছে। এর ঠিক পাশেই ইউএস ক্যাপিটালের পশ্চিম লনে ঐতিহ্যবাহী ‘এ ক্যাপিটল ফোর্থ’ কনসার্টটি এবার ৪ জুলাইয়ের পরিবর্তে একদিন আগেই, অর্থাৎ ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলফোনসো রিবেরিওর সঞ্চালনায় সেখানে পারফর্ম করেছেন প্যাটি লাবেলে, শিকাগো এবং ট্রেস অ্যাডকিন্সের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা। তবে এই বিপুল আয়োজনের মাঝেও রয়েছে ভ্রুকুটি। রাজধানী যখন ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের তীব্র দাবদাহে পুড়ছে এবং জারি করা হয়েছে ‘হিট অ্যালার্ট’, ঠিক তখন রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে বেশ কয়েকজন শিল্পীর অনুষ্ঠান বয়কটের ঘটনা উৎসবের রঙ কিছুটা হলেও মলিন করেছে।

এরপরও সব প্রতিকূলতা আর বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ২০২৬ সালের এই স্বাধীনতা দিবস আমেরিকানদের কাছে একতার প্রতীক। ২৫০ বছরের দীর্ঘ পথচলা কেবল একটি জাতির টিকে থাকার গল্প নয়, বরং বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের এক রঙিন দর্পণ। আজকের দিনটি আগামী শতাব্দীর জন্য এক নতুন সংকল্পের সূচনা, যেখানে ১৭৭৬- এর গৌরব আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা মিলেমিশে একাকার হয়ে ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।

/এমএকে/