করোনাকালে কেনাকাটায় দুর্নীতি: অভিযুক্ত ১৩ ব্যক্তি

করোনাকালে কেনাকাটায় দুর্নীতি: অভিযুক্ত ১৩ ব্যক্তি
মরিয়ম সেঁজুতি

২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের মরণ ছোবলে যখন মানুষ দিশাহারা, তখন সেই দুর্যোগকেই আয়ের উৎস বানিয়েছিলেন স্বাস্থ্য খাতের প্রভাবশালী একদল অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী। মাস্ক থেকে শুরু করে হাসপাতালের বেড, এমনকী মোবাইল অ্যাপ তৈরির নামেও চলেছে দুর্নীতির মহোৎসব। চাঞ্চল্যকর এই লুটপাটের প্রমাণ পেয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৬টি মামলার চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান দল।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুসন্ধান দল দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে কাজ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শেষে তা দুদকে দাখিল করা হয়েছে। নতুন কমিশন এলে তা উত্থাপন করা হবে।
মো. আকতারুল ইসলাম উপ-পরিচালক, দুদক
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ সিন্ডিকেটের নাম। এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত ছিল সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালী অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক পর্যন্ত। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন ইআরপিপি প্রকল্পের সাবেক পিডি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল কবির, সাবেক এডিজি ডা. তাহমিনা জোহরা ও অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিভাগীয় পরিচালক ও উপ-পরিচালকের নাম সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুসন্ধান দল দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে কাজ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শেষে তা দুদকে দাখিল করা হয়েছে। নতুন কমিশন এলে তা উত্থাপন করা হবে।
মাস্ক ও হাসপাতালের বেডেও ভাগ বসানো হয়েছে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাধারণ মানের মাস্ককে এন-৯৫ বা কেএন-৯৫ হিসেবে দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু ‘জাদিদ অটোমোবাইলস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। একইভাবে হাসপাতালের বৈদ্যুতিক বেড কেনার ক্ষেত্রেও বড় অংকের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। ‘ইনশা ট্রেড কর্পোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
প্রচার নেই, তবুও পকেটে গেছে প্রচারের টাকা
বিস্ময়কর এক তথ্য উঠে এসেছে দুদকের ৪ নম্বর মামলার সুপারিশে। সেখানে দেখা যায়, করোনা সচেতনতায় টিভিসি বা বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ‘ই-মিউজিক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো প্রচারণাই চালানো হয়নি। অর্থাৎ জনগণের সচেতনতার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোনো কাজ না করেই পকেটে ভরেছে এই চক্রটি।
ডিজিটাল খাতের ‘ভুতুড়ে’ বিল
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ‘করোনা বিডি’ মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামেও লুটপাটের তথ্য পেয়েছে দুদক। ‘ব্রেইন স্টেশন ২৩’ ও ‘সিম কর্পোরেশন’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই খাতে প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬ নম্বর মামলাটি দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও থার্মোমিটার ও সার্জিক্যাল সামগ্রী ক্রয়ের নামে আরও ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা লুটপাটের আলাদা প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুদকের অনুসন্ধান টিম তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেছে যে, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিবেদনটি এখন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তদন্তের শুরু
করোনার মহামারির মধ্যে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) ৬ কর্মকর্তা ও জেএমআই হাসপাতাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের কর্ণধার মো. আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল দুদক। তবে ওই মামলার তদন্ত আর এগোয়নি।
মামলার এজাহারে জেএমআই গ্রুপের ২০ হাজার ৬১০টি সরবরাহ করা মাস্ক এন৯৫ ছিল না– এমন প্রমাণ পাওয়ার পরও অদৃশ্য কারণে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন আসামিরা। ওই অভিযোগের সঙ্গে নতুন অভিযোগ যুক্ত হলে তা আমলে নিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়। নতুন তদন্ত দল সেইসময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর নথিপত্র তলব করে চিঠি দেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্ব ব্যাংক ও বাংলাদেশ যৌথভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ৬০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এতে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকও অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়।
ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের (ইআরপিপি) আওতায় মাস্ক-পিপিই, হাসপাতালের সরঞ্জামাদি, সচেতনতায় বিজ্ঞাপন ও অ্যাপ নির্মাণে ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও পিডি ডা. ইকবাল কবির পদে পদে নানা অনিয়ম করেন। জানা গেছে, কাজ পাওয়া ৬ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে।

২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের মরণ ছোবলে যখন মানুষ দিশাহারা, তখন সেই দুর্যোগকেই আয়ের উৎস বানিয়েছিলেন স্বাস্থ্য খাতের প্রভাবশালী একদল অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী। মাস্ক থেকে শুরু করে হাসপাতালের বেড, এমনকী মোবাইল অ্যাপ তৈরির নামেও চলেছে দুর্নীতির মহোৎসব। চাঞ্চল্যকর এই লুটপাটের প্রমাণ পেয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৬টি মামলার চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান দল।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুসন্ধান দল দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে কাজ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শেষে তা দুদকে দাখিল করা হয়েছে। নতুন কমিশন এলে তা উত্থাপন করা হবে।
মো. আকতারুল ইসলাম উপ-পরিচালক, দুদক
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ সিন্ডিকেটের নাম। এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত ছিল সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালী অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক পর্যন্ত। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন ইআরপিপি প্রকল্পের সাবেক পিডি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল কবির, সাবেক এডিজি ডা. তাহমিনা জোহরা ও অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিভাগীয় পরিচালক ও উপ-পরিচালকের নাম সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুসন্ধান দল দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে কাজ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শেষে তা দুদকে দাখিল করা হয়েছে। নতুন কমিশন এলে তা উত্থাপন করা হবে।
মাস্ক ও হাসপাতালের বেডেও ভাগ বসানো হয়েছে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাধারণ মানের মাস্ককে এন-৯৫ বা কেএন-৯৫ হিসেবে দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু ‘জাদিদ অটোমোবাইলস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। একইভাবে হাসপাতালের বৈদ্যুতিক বেড কেনার ক্ষেত্রেও বড় অংকের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। ‘ইনশা ট্রেড কর্পোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
প্রচার নেই, তবুও পকেটে গেছে প্রচারের টাকা
বিস্ময়কর এক তথ্য উঠে এসেছে দুদকের ৪ নম্বর মামলার সুপারিশে। সেখানে দেখা যায়, করোনা সচেতনতায় টিভিসি বা বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ‘ই-মিউজিক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো প্রচারণাই চালানো হয়নি। অর্থাৎ জনগণের সচেতনতার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোনো কাজ না করেই পকেটে ভরেছে এই চক্রটি।
ডিজিটাল খাতের ‘ভুতুড়ে’ বিল
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ‘করোনা বিডি’ মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামেও লুটপাটের তথ্য পেয়েছে দুদক। ‘ব্রেইন স্টেশন ২৩’ ও ‘সিম কর্পোরেশন’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই খাতে প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬ নম্বর মামলাটি দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও থার্মোমিটার ও সার্জিক্যাল সামগ্রী ক্রয়ের নামে আরও ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা লুটপাটের আলাদা প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুদকের অনুসন্ধান টিম তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেছে যে, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিবেদনটি এখন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তদন্তের শুরু
করোনার মহামারির মধ্যে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) ৬ কর্মকর্তা ও জেএমআই হাসপাতাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের কর্ণধার মো. আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল দুদক। তবে ওই মামলার তদন্ত আর এগোয়নি।
মামলার এজাহারে জেএমআই গ্রুপের ২০ হাজার ৬১০টি সরবরাহ করা মাস্ক এন৯৫ ছিল না– এমন প্রমাণ পাওয়ার পরও অদৃশ্য কারণে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন আসামিরা। ওই অভিযোগের সঙ্গে নতুন অভিযোগ যুক্ত হলে তা আমলে নিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়। নতুন তদন্ত দল সেইসময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর নথিপত্র তলব করে চিঠি দেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্ব ব্যাংক ও বাংলাদেশ যৌথভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ৬০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এতে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকও অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়।
ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের (ইআরপিপি) আওতায় মাস্ক-পিপিই, হাসপাতালের সরঞ্জামাদি, সচেতনতায় বিজ্ঞাপন ও অ্যাপ নির্মাণে ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও পিডি ডা. ইকবাল কবির পদে পদে নানা অনিয়ম করেন। জানা গেছে, কাজ পাওয়া ৬ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে।

করোনাকালে কেনাকাটায় দুর্নীতি: অভিযুক্ত ১৩ ব্যক্তি
মরিয়ম সেঁজুতি

২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের মরণ ছোবলে যখন মানুষ দিশাহারা, তখন সেই দুর্যোগকেই আয়ের উৎস বানিয়েছিলেন স্বাস্থ্য খাতের প্রভাবশালী একদল অসাধু কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী। মাস্ক থেকে শুরু করে হাসপাতালের বেড, এমনকী মোবাইল অ্যাপ তৈরির নামেও চলেছে দুর্নীতির মহোৎসব। চাঞ্চল্যকর এই লুটপাটের প্রমাণ পেয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৬টি মামলার চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান দল।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুসন্ধান দল দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে কাজ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শেষে তা দুদকে দাখিল করা হয়েছে। নতুন কমিশন এলে তা উত্থাপন করা হবে।
মো. আকতারুল ইসলাম উপ-পরিচালক, দুদক
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ সিন্ডিকেটের নাম। এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত ছিল সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালী অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক পর্যন্ত। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন ইআরপিপি প্রকল্পের সাবেক পিডি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইকবাল কবির, সাবেক এডিজি ডা. তাহমিনা জোহরা ও অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। এ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিভাগীয় পরিচালক ও উপ-পরিচালকের নাম সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুসন্ধান দল দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে কাজ করেছে। বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শেষে তা দুদকে দাখিল করা হয়েছে। নতুন কমিশন এলে তা উত্থাপন করা হবে।
মাস্ক ও হাসপাতালের বেডেও ভাগ বসানো হয়েছে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাধারণ মানের মাস্ককে এন-৯৫ বা কেএন-৯৫ হিসেবে দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু ‘জাদিদ অটোমোবাইলস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। একইভাবে হাসপাতালের বৈদ্যুতিক বেড কেনার ক্ষেত্রেও বড় অংকের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। ‘ইনশা ট্রেড কর্পোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
প্রচার নেই, তবুও পকেটে গেছে প্রচারের টাকা
বিস্ময়কর এক তথ্য উঠে এসেছে দুদকের ৪ নম্বর মামলার সুপারিশে। সেখানে দেখা যায়, করোনা সচেতনতায় টিভিসি বা বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ‘ই-মিউজিক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে কোনো প্রচারণাই চালানো হয়নি। অর্থাৎ জনগণের সচেতনতার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোনো কাজ না করেই পকেটে ভরেছে এই চক্রটি।
ডিজিটাল খাতের ‘ভুতুড়ে’ বিল
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ‘করোনা বিডি’ মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামেও লুটপাটের তথ্য পেয়েছে দুদক। ‘ব্রেইন স্টেশন ২৩’ ও ‘সিম কর্পোরেশন’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই খাতে প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬ নম্বর মামলাটি দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়াও থার্মোমিটার ও সার্জিক্যাল সামগ্রী ক্রয়ের নামে আরও ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা লুটপাটের আলাদা প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুদকের অনুসন্ধান টিম তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেছে যে, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিবেদনটি এখন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তদন্তের শুরু
করোনার মহামারির মধ্যে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) ৬ কর্মকর্তা ও জেএমআই হাসপাতাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের কর্ণধার মো. আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল দুদক। তবে ওই মামলার তদন্ত আর এগোয়নি।
মামলার এজাহারে জেএমআই গ্রুপের ২০ হাজার ৬১০টি সরবরাহ করা মাস্ক এন৯৫ ছিল না– এমন প্রমাণ পাওয়ার পরও অদৃশ্য কারণে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন আসামিরা। ওই অভিযোগের সঙ্গে নতুন অভিযোগ যুক্ত হলে তা আমলে নিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়। নতুন তদন্ত দল সেইসময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর নথিপত্র তলব করে চিঠি দেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্ব ব্যাংক ও বাংলাদেশ যৌথভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ৬০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। এতে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকও অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়।
ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের (ইআরপিপি) আওতায় মাস্ক-পিপিই, হাসপাতালের সরঞ্জামাদি, সচেতনতায় বিজ্ঞাপন ও অ্যাপ নির্মাণে ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও পিডি ডা. ইকবাল কবির পদে পদে নানা অনিয়ম করেন। জানা গেছে, কাজ পাওয়া ৬ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে।




