শিরোনাম

এডি সিরিঞ্জের টেন্ডারে ‘একক’ সুবিধার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
এডি সিরিঞ্জের টেন্ডারে ‘একক’ সুবিধার অভিযোগ
এডি সিরিঞ্জ

মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের জন্য ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার অটো ডিজঅ্যাবল (এডি) সিরিঞ্জ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর (ডিজিএফপি)। এ জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হলেও এর কারিগরি স্পেসিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে সুবিধা দিতে এবারের দরপত্রে এমন কিছু শর্ত ও মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অধিকাংশ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পণ্য পূরণ করতে পারছে না।

দরপত্রের নথি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৫ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডি-২২ প্যাকেজে (টেন্ডার আইডি-১২৭৩১৪৪) এ দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ১, ৩, ৫ ও ১০ মিলিলিটারের মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার এডি সিরিঞ্জ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। দরপত্র জমার শেষ সময় আগামী ১০ আগস্ট।

এডি সিরিঞ্জ একবার ব্যবহারের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকেজো হয়ে যায়। ফলে একই সিরিঞ্জ পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ থাকে না এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে। পরিবার পরিকল্পনা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে এ ধরনের সিরিঞ্জের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবার সিরিঞ্জের বিভিন্ন অংশের দৈর্ঘ্য, ব্যাস ও গঠন নিয়ে অত্যন্ত নির্দিষ্ট মাপ বেঁধে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সরবরাহকারীদের।

গত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত প্রাক্-দরপত্র সভায় কয়েকজন সম্ভাব্য দরদাতা এসব শর্ত সহজ বা সংশোধনের অনুরোধ করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। সভার কার্যবিবরণীতে প্রকল্প পরিচালক এ এফ এম আরাফাত হোসেনের স্বাক্ষরিত এক কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, কোনো সংশোধনী বা ‘অ্যামেন্ডমেন্ট’ দেওয়া হবে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০২৪ সালের দরপত্রের তুলনায় এবারের কারিগরি স্পেসিফিকেশনে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের দরপত্রে শর্তগুলো তুলনামূলকভাবে সাধারণ থাকায় দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পেরেছিল। এবার নির্দিষ্ট মাপ যুক্ত করায় বাজারে প্রচলিত বহু প্রতিষ্ঠানের পণ্য বাদ পড়ে যাচ্ছে।

গত বছরের দরপত্রে ১ মিলিলিটার সিরিঞ্জে ২২জি × ১ ইঞ্চি সুচের কথা বলা হলেও এবার ২৩জি × ১ ইঞ্চি সুচ চাওয়া হয়েছে। সিরিঞ্জের মোট দৈর্ঘ্য ১২০±৩ মিলিমিটার থেকে বাড়িয়ে ১৪০±৫ মিলিমিটার এবং ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ৭১±৪ মিলিমিটার থেকে ৯০±৫ মিলিমিটার করা হয়েছে। ব্যারেলের ভেতরের ব্যাসও ১০±১ মিলিমিটার থেকে পরিবর্তন করে ৪ দশমিক ৫±০ দশমিক ৫ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১০ মিলিলিটার সিরিঞ্জের মোট দৈর্ঘ্য ১৫৬±৪ মিলিমিটার, প্লাঞ্জারের দৈর্ঘ্য ১০১±৩ মিলিমিটার এবং ব্যারেলের বাইরের ব্যাস ১৬ দশমিক ৬±১ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩ মিলিলিটারের ক্ষেত্রে মোট দৈর্ঘ্য ১৩১ দশমিক ৫±২ মিলিমিটার এবং ব্যারেলের বাইরের ব্যাস ১১ দশমিক ৩০±০ দশমিক ৫ মিলিমিটার চাওয়া হয়েছে। ৫ মিলিলিটারের সিরিঞ্জে মোট দৈর্ঘ্য ১৩৯±৫ মিলিমিটার এবং প্লাঞ্জারের দৈর্ঘ্য ৮৫±৩ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবার নতুন করে সরবরাহ করা সিরিঞ্জ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পারফরম্যান্স, কোয়ালিটি অ্যান্ড সেফটি (পিকিউএস) তালিকার ই০০৮/ই০১৩ক্যাটাগরিভুক্ত হতে হবে বলে একটি শর্ত যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি দরদাতার গত পাঁচ বছরে অন্তত ৬ কোটি টাকার সিরিঞ্জ সরবরাহের অভিজ্ঞতা এবং ৮ কোটি টাকার নগদ সম্পদ থাকার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জসিম সার্জিক্যালের স্বত্বাধিকারী মো. জসিম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, নতুন স্পেসিফিকেশন দেখে মনে হচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে মাথায় রেখে তা তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা কমবে এবং সরকার কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ হারাতে পারে।

জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাকও স্পেসিফিকেশনকে আরও সাধারণ ও প্রতিযোগিতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট পণ্য কেনায় বেশি প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরকারি অর্থ সাশ্রয় হবে।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই ধরনের ক্রয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় ‘ফিক্সড নিডল উইথ প্রটেক্টিভ ক্যাপ’ শর্ত থাকলেও চীনের আনহুই টিয়ানকাং মেডিকেল টেকনোলজির সরবরাহ করা সিরিঞ্জে নিডল ফিক্সড না থাকার অভিযোগ ছিল। তারপরও সেগুলো গ্রহণ করা হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, কার্যকরী চাহিদা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করেই স্পেসিফিকেশন তৈরি করা হয়েছে। পিপিআর ও টেন্ডার স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্টস অনুসরণ করেই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে শর্ত তৈরি করা হয়নি।

/এসবি/