শিরোনাম

এবার কই-বাটাসহ ৫ দেশি মাছে মিললো মাইক্রোপ্লাস্টিক

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
এবার কই-বাটাসহ ৫ দেশি মাছে মিললো মাইক্রোপ্লাস্টিক
প্রতীকী ছবি

এবার পাঁচ প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। এসব মাছের মাংসপেশি ও অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে। এরপর রয়েছে বাটা, মেনি (ভেদা/নান্দিনা), গুলশা টেংরা এবং পুঁটি মাছ।

গবেষকেরা মতে, কই মাছ সর্বভুক স্বভাবের হওয়ায় তলানি ও প্লাঙ্কটনের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজে গ্রহণ করে। ফলে অন্য মাছের তুলনায় এ মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি দেখা গেছে।

আড়িয়াল বিলের দেশীয় ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। পাঁচ প্রজাতির মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন গবেষণায়।

বাকৃবির মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সড’ এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় আড়িয়াল বিলের পাঁচ প্রজাতির দেশীয় ছোট নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

গবেষকদের দাবি, আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর এই পাঁচটি স্থান থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ১৫০টি দেশীয় মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষাধীন মাছগুলো ছিল কই, বাটা, মেনি (ভেদা/নান্দিনা), গুলশা টেংরা ও পুঁটি।

গবেষণায় ফলাফলে দেখা গেছে, কই মাছেই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক এই তিন মৌসুমেই কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্ত্রে গড়ে ১ দশমিক ৭০ থেকে ১ দশমিক ৯০ এবং ফুলকায় ১ দশমিক ৩০ থেকে ১ দশমিক ৪০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। কইয়ের পর সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বাটা মাছে। এরপর রয়েছে মেনি ও গুলশা টেংরা। সবচেয়ে কম শনাক্ত হয়েছে পুঁটি মাছে।

গবেষকদের মতে, কই মাছ সর্বভুক হওয়ায় তলদেশের পলি, প্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজে গ্রহণ করে। আবার ৩০০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো মাছের পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল অতিক্রম করে মাংসপেশিতে পৌঁছাতে পারে। তৃণভোজী বাটা মাছের অন্ত্রে বর্ষা মৌসুমে গড়ে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। আর মাংসপেশিতে তিন ঋতুতেই প্রায় একই মাত্রায় (শূন্য দশমিক ৮০ থেকে শূন্য দশমিক ৯০টি) প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

মেনি মাছের অন্ত্রে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলক বেশি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। মাংসপেশিতে এর পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৬০ থেকে শূন্য দশমিক ৭০টির মধ্যে। একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে গুলশা টেংরায়। এ মাছের অন্ত্রে শীত মৌসুমে সর্বোচ্চ ১.৩০টি এবং মাংসপেশিতে ০.৫০ থেকে ০.৮০টি কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ছোট আকারের সর্বভুক পুঁটি মাছে সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মাংসপেশিতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৫১টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১ দশমিক ৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২ দশমিক ৩৩ থেকে ১২৭ দশমিক ৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এর আগেও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, চলনবিল, হাওরাঞ্চল, সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকা এবং বঙ্গোপসাগরের মাছ ও চিংড়িতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। একই গবেষক দল চলনবিল ও হাওরের মাছ নিয়েও গবেষণা করেছে। সেখানে তলদেশে বসবাসকারী মাছের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছিল। তবে আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটি নিয়ে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ গবেষণা।

এসব বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, ‘আতঙ্ক নয়, এখন প্রয়োজন উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ। তাই নদী ও সংযোগ খালে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা স্থাপন, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক সুতা ও জালের ব্যবহার বন্ধ, উন্মুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বিল সংলগ্ন এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে।’

/এফআর/