হামে প্রাণহানি ছাড়াল ৫০০, দিনে গড় মৃত্যু ৭

হামে প্রাণহানি ছাড়াল ৫০০, দিনে গড় মৃত্যু ৭
সিটিজেন ডেস্ক

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাতজনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দৈনিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণে দেখা গেছে। মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
শনিবার (২৩ মে) প্রকাশিত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১২ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে একজন। ফলে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত আক্রান্তদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করলেও মৃতদের বয়স, আর্থসামাজিক অবস্থা, কত দিন আক্রান্ত থাকার পর মৃত্যু হয়েছে কিংবা কী ধরনের চিকিৎসা পেয়েছিল—এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রচার-প্রচারণাও নেই। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে, হামের রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মৃত্যুর হার কমছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাদের মতে, আরও কিছু কার্যকর উদ্যোগ নিলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব ছিল।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু ভেন্টিলেটর বাড়ালেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তার ভাষায়, হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে হবে। শুধু ভেন্টিলেটর দিয়ে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব নয়।
সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ২২ মে পর্যন্ত টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩১ হাজার ১৪৯ শিশু। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশুকেও টিকা দেওয়ায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
কয়েক দিন আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের চারজনই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, আক্রান্ত শিশুদের ৮ থেকে ১০ শতাংশ ডায়রিয়ায় ভোগে, ২০ শতাংশের কান পাকে এবং প্রায় ৫ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই বেশি মারা যাচ্ছে।
যেভাবে বাড়ল মৃত্যুর সংখ্যা
চলতি বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর ২ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত হামের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ওই দিন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত আক্রান্ত মিলিয়ে মোট ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ছিল ১৩ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ২৭ জনের।
প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, সময়মতো চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। ১ মে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮০ জনে। তখন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় ২৩১ জন এবং নিশ্চিত আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৪৯ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় ৪০ জন। এরপর ৩ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় আরও ২৪০ জন। আর মে মাসের প্রথম ২২ দিনেই প্রাণ হারিয়েছে ২৩২ জন। অর্থাৎ গত ৭০ দিনে দেশে হামে গড়ে প্রতিদিন সাতজনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ৫০৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৭৮ জন রোগী।
সরকারের পদক্ষেপ ও বাস্তবতা
শুরু থেকেই সরকার দাবি করে আসছে, হামের রোগীদের চিকিৎসায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সরবরাহের কথাও জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা জানিয়েছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ হামের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সব আইসিইউ শিশুদের জন্য উপযোগী নয়।
এ ছাড়া আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ জুবায়ের চিশতির উদ্ভাবিত ‘বাবল-সিপ্যাপ’ প্রযুক্তিও কয়েকটি হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি এমন একটি সহজ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুরা সহজে অক্সিজেন নিতে পারে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও পৃথক ওয়ার্ড খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু করা হয়। এরপর ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তার আশা, মৃত্যুহারও কমে আসবে। তবে সারা দেশের আইসিইউতে থাকা রোগীদের সঠিক অবস্থা একসঙ্গে নির্ভুলভাবে জানানো কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি। প্রথমত, বিদ্যমান আইসিইউগুলোকে শিশুদের উপযোগী করে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের আইসিইউ সুবিধাগুলো সরকারকে প্রয়োজন হলে অধিগ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সব রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হয় না; অনেকের শুধু অক্সিজেন সহায়তাই যথেষ্ট। তবে তারও আগে দরকার কমিউনিটি আইসোলেশন ব্যবস্থা। আক্রান্ত শিশুদের বাড়িতে না রেখে উপজেলা বা শহর পর্যায়ে পৃথক স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া গেলে সংক্রমণ ও জটিলতা দুটোই কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি বলে মত দেন তিনি।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাতজনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দৈনিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণে দেখা গেছে। মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
শনিবার (২৩ মে) প্রকাশিত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১২ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে একজন। ফলে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত আক্রান্তদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করলেও মৃতদের বয়স, আর্থসামাজিক অবস্থা, কত দিন আক্রান্ত থাকার পর মৃত্যু হয়েছে কিংবা কী ধরনের চিকিৎসা পেয়েছিল—এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রচার-প্রচারণাও নেই। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে, হামের রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মৃত্যুর হার কমছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাদের মতে, আরও কিছু কার্যকর উদ্যোগ নিলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব ছিল।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু ভেন্টিলেটর বাড়ালেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তার ভাষায়, হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে হবে। শুধু ভেন্টিলেটর দিয়ে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব নয়।
সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ২২ মে পর্যন্ত টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩১ হাজার ১৪৯ শিশু। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশুকেও টিকা দেওয়ায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
কয়েক দিন আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের চারজনই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, আক্রান্ত শিশুদের ৮ থেকে ১০ শতাংশ ডায়রিয়ায় ভোগে, ২০ শতাংশের কান পাকে এবং প্রায় ৫ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই বেশি মারা যাচ্ছে।
যেভাবে বাড়ল মৃত্যুর সংখ্যা
চলতি বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর ২ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত হামের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ওই দিন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত আক্রান্ত মিলিয়ে মোট ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ছিল ১৩ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ২৭ জনের।
প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, সময়মতো চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। ১ মে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮০ জনে। তখন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় ২৩১ জন এবং নিশ্চিত আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৪৯ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় ৪০ জন। এরপর ৩ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় আরও ২৪০ জন। আর মে মাসের প্রথম ২২ দিনেই প্রাণ হারিয়েছে ২৩২ জন। অর্থাৎ গত ৭০ দিনে দেশে হামে গড়ে প্রতিদিন সাতজনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ৫০৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৭৮ জন রোগী।
সরকারের পদক্ষেপ ও বাস্তবতা
শুরু থেকেই সরকার দাবি করে আসছে, হামের রোগীদের চিকিৎসায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সরবরাহের কথাও জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা জানিয়েছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ হামের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সব আইসিইউ শিশুদের জন্য উপযোগী নয়।
এ ছাড়া আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ জুবায়ের চিশতির উদ্ভাবিত ‘বাবল-সিপ্যাপ’ প্রযুক্তিও কয়েকটি হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি এমন একটি সহজ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুরা সহজে অক্সিজেন নিতে পারে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও পৃথক ওয়ার্ড খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু করা হয়। এরপর ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তার আশা, মৃত্যুহারও কমে আসবে। তবে সারা দেশের আইসিইউতে থাকা রোগীদের সঠিক অবস্থা একসঙ্গে নির্ভুলভাবে জানানো কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি। প্রথমত, বিদ্যমান আইসিইউগুলোকে শিশুদের উপযোগী করে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের আইসিইউ সুবিধাগুলো সরকারকে প্রয়োজন হলে অধিগ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সব রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হয় না; অনেকের শুধু অক্সিজেন সহায়তাই যথেষ্ট। তবে তারও আগে দরকার কমিউনিটি আইসোলেশন ব্যবস্থা। আক্রান্ত শিশুদের বাড়িতে না রেখে উপজেলা বা শহর পর্যায়ে পৃথক স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া গেলে সংক্রমণ ও জটিলতা দুটোই কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি বলে মত দেন তিনি।

হামে প্রাণহানি ছাড়াল ৫০০, দিনে গড় মৃত্যু ৭
সিটিজেন ডেস্ক

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাতজনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দৈনিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণে দেখা গেছে। মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
শনিবার (২৩ মে) প্রকাশিত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১২ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে একজন। ফলে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত আক্রান্তদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করলেও মৃতদের বয়স, আর্থসামাজিক অবস্থা, কত দিন আক্রান্ত থাকার পর মৃত্যু হয়েছে কিংবা কী ধরনের চিকিৎসা পেয়েছিল—এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রচার-প্রচারণাও নেই। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে, হামের রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মৃত্যুর হার কমছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাদের মতে, আরও কিছু কার্যকর উদ্যোগ নিলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব ছিল।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু ভেন্টিলেটর বাড়ালেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তার ভাষায়, হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে হবে। শুধু ভেন্টিলেটর দিয়ে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব নয়।
সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ২২ মে পর্যন্ত টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩১ হাজার ১৪৯ শিশু। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশুকেও টিকা দেওয়ায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
কয়েক দিন আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের চারজনই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, আক্রান্ত শিশুদের ৮ থেকে ১০ শতাংশ ডায়রিয়ায় ভোগে, ২০ শতাংশের কান পাকে এবং প্রায় ৫ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই বেশি মারা যাচ্ছে।
যেভাবে বাড়ল মৃত্যুর সংখ্যা
চলতি বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর ২ এপ্রিল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত হামের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ওই দিন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত আক্রান্ত মিলিয়ে মোট ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ছিল ১৩ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ২৭ জনের।
প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, সময়মতো চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। ১ মে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮০ জনে। তখন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় ২৩১ জন এবং নিশ্চিত আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৪৯ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় ৪০ জন। এরপর ৩ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মারা যায় আরও ২৪০ জন। আর মে মাসের প্রথম ২২ দিনেই প্রাণ হারিয়েছে ২৩২ জন। অর্থাৎ গত ৭০ দিনে দেশে হামে গড়ে প্রতিদিন সাতজনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ৫০৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৪ হাজার ৩৭৮ জন রোগী।
সরকারের পদক্ষেপ ও বাস্তবতা
শুরু থেকেই সরকার দাবি করে আসছে, হামের রোগীদের চিকিৎসায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সরবরাহের কথাও জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা জানিয়েছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর বড় একটি অংশ হামের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সব আইসিইউ শিশুদের জন্য উপযোগী নয়।
এ ছাড়া আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ জুবায়ের চিশতির উদ্ভাবিত ‘বাবল-সিপ্যাপ’ প্রযুক্তিও কয়েকটি হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি এমন একটি সহজ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুরা সহজে অক্সিজেন নিতে পারে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও পৃথক ওয়ার্ড খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান শুরু করা হয়। এরপর ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তার আশা, মৃত্যুহারও কমে আসবে। তবে সারা দেশের আইসিইউতে থাকা রোগীদের সঠিক অবস্থা একসঙ্গে নির্ভুলভাবে জানানো কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি। প্রথমত, বিদ্যমান আইসিইউগুলোকে শিশুদের উপযোগী করে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের আইসিইউ সুবিধাগুলো সরকারকে প্রয়োজন হলে অধিগ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সব রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হয় না; অনেকের শুধু অক্সিজেন সহায়তাই যথেষ্ট। তবে তারও আগে দরকার কমিউনিটি আইসোলেশন ব্যবস্থা। আক্রান্ত শিশুদের বাড়িতে না রেখে উপজেলা বা শহর পর্যায়ে পৃথক স্থানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া গেলে সংক্রমণ ও জটিলতা দুটোই কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি বলে মত দেন তিনি।




