পাঠকশূন্য ‘ঢাকা কেন্দ্র’, নীরবে আগলে রাখছে ঢাকার ইতিহাস

পাঠকশূন্য ‘ঢাকা কেন্দ্র’, নীরবে আগলে রাখছে ঢাকার ইতিহাস
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার সরু গলি পেরিয়ে ২৩ নম্বর মোহিনী মোহন দাস লেনে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্য এক ঢাকা। কাচের বাক্সে সাজানো প্রাচীন মুদ্রা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রেডিও, পুরোনো টেলিভিশন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি- সব মিলিয়ে এখানে যেন আটকে আছে শহরের বহু পুরোনো সময়। অথচ এত সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভাণ্ডারেও নেই পাঠকের ভিড়। লাইব্রেরির চেয়ারগুলো ফাঁকা, নীরবে পড়ে আছে বইয়ের সারি।
তবে এই নীরবতা কেবল পাঠকশূন্যতার গল্প নয় বরং ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন এক ভাণ্ডারকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। পুরান ঢাকার সরুগলি, সংস্কৃতি, মানুষের জীবন ও নগর-ইতিহাস ধরে রাখতে কাজ করে যাওয়া ‘ঢাকা কেন্দ্র’ এখন আরও পাঠক, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীর অপেক্ষায়।
মাওলা বখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কেন্দ্র শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়, বরং ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও চর্চার একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিষয়ক গবেষণা, প্রকাশনা, প্রদর্শনী ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে আসছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা কেন্দ্রের দুই তলা ভবনের পাঠকক্ষে নেই পাঠকের উপস্থিতি। বইয়ে ঠাসা তাক, পড়ার জন্য সাজানো চেয়ার-টেবিল থাকলেও পরিদর্শনের সময় পাঠকশূন্যই ছিল লাইব্রেরি। তবে নীরব এই পরিবেশের মধ্যেও সংরক্ষিত বই, দলিল ও নিদর্শনগুলো জানান দিচ্ছে ঢাকার অতীতকে ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। ইতিহাস ও গবেষণায় আগ্রহী তরুণদের কাছে জায়গাটি আরও পরিচিত করা গেলে এই নীরব পাঠকক্ষই হয়ে উঠতে পারে প্রাণবন্ত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই ঢাকা কেন্দ্র খোলা থাকে। গবেষকদের জন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য বিকfল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ পাঠকদের জন্য নির্দিষ্ট সময়েই এখানে এসে বই পড়া ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। গবেষকদের জন্য ফরমের মূল্য ৫০ টাকা রাখা হয়েছে। এই ফরমের মাধ্যমে গবেষকরা টানা তিন দিন ঢাকা কেন্দ্রের গবেষণা ও পাঠাগার সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ পান। তবে সাধারণ পাঠকদের জন্য কোনো ফরম বা প্রবেশমূল্য নেই। তারা বিনামূল্যেই লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারেন।
শুধু এসবই নয়, গ্যালারিতে রয়েছে বন্দুকের কার্টুজসহ ব্যাগ, গ্রামোফোন, হাতল-বিশিষ্ট পুরোনো ব্যাগ, কলের গানের মেশিন, টাইপরাইটার, পিতল ও রুপার তৈরি আসবাবপত্র, শঙ্খ ও খুরচুন। এছাড়াও রয়েছে পুরোনো ইট, পুরান ঢাকার বিলুপ্ত লোহারপুল সেতুর খণ্ড, খাবার গরম করার চীনামাটির পাত্র, ওষুধ তৈরির যন্ত্র, বিশেষ ধরনের ওজন মাপার যন্ত্র, আতরদানি, গোলাপজলদানিপুরোনো ক্যামেরা, ঘড়ি এবং বিভিন্ন সময়ের মানচিত্র। আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে এসব বস্তু কেবল পুরোনো সামগ্রীই নয়- এগুলো নগরজীবনের পরিবর্তন, মানুষের ব্যবহার ও সংস্কৃতির বিবর্তনের দৃশ্যমান দলিল।
ঢাকা কেন্দ্রের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ‘ঢাকার পঞ্চায়েত গ্যালারি’। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে ঢাকার প্রাচীন পঞ্চায়েত পরিচালনার দলিল, চিঠি, ব্যবহৃত আসবাব ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। একসময় পাড়া-মহল্লার সামাজিক ব্যবস্থাপনা, বিরোধ মীমাংসা কিংবা নানা সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এসব পঞ্চায়েত। সেই সময়ের দলিল ও ব্যবহার্য সামগ্রী এখন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। ঢাকার পঞ্চায়েত ও প্রতিষ্ঠাতা মাওলা বখশ সরদারকে ঘিরে নানা ঐতিহাসিক উপাদান এই কেন্দ্রের সংগ্রহে রয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এর লাইব্রেরি। এখানে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, গবেষণা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ে প্রায় বারো হাজার বই ও প্রকাশনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের সংবাদপত্র, সাময়িকী ও ঢাকা-সংক্রান্ত তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে বই বিক্রয় কেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক পরিবেশসম্মত একটি বাগান। ফলে ঢাকা কেন্দ্র শুধু পুরোনো নিদর্শন দেখার জায়গা নয়; অবসর সময় কাটানো, ইতিহাস পড়া, গবেষণা করা এবং ঢাকাকে নতুনভাবে জানারও একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে পাঠকশূন্যতার কারণে ঢাকা কেন্দ্রের গুরুত্বের জায়গাটি অনেকটা আড়ালে পড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এটাকে তরুণদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঠ ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানো এবং নিয়মিত ইতিহাসভিত্তিক আয়োজনের মাধ্যমে পাঠক তৈরি করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা কেন্দ্র ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আপন বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে মনে হলো যেন অতীত আমার চোখের সামনে চলে এসেছে। প্রতিটি নিদর্শন শুধু ইতিহাস নয়, আমাদের সংস্কৃতির গভীর রূপও তুলে ধরে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি বই, প্রতিটি কাচের প্রদর্শনী ঢাকার ইতিহাসের কথা বলে। একজন ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে এখানে আসাটা আমার জন্য যেমন গবেষণার খোরাক, তেমনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও ভাণ্ডার। তবে এই জায়গাকে মানুষের কাছে পরিচিত করা জরুরি।’
ঢাকা কেন্দ্রের সমন্বয়ক মনিরুজ্জামান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রের এই বই সংগ্রহের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ঢাকাকে নিয়ে প্রকাশিত বই, গবেষণাগ্রন্থ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা সংগ্রহ করে আসছি। বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে প্রায় ১২ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইতিহাস নয়, ঢাকার সংস্কৃতি, স্থাপত্য, রাজনীতি, সমাজ, আন্দোলন-সংগ্রামসহ নানা বিষয়ের বই ও দলিল রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহ এখনো থেমে নেই। কোথাও ঢাকাকে নিয়ে কোনো মৌলিক বা গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সন্ধান পেলেই সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। আমরা মনে করি, ঢাকাকে জানতে হলে শুধু বর্তমানকে দেখলেই হবে না, এর অতীত, মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব ও প্রতিরোধের ইতিহাসও জানা প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই এই বই সংগ্রহের কাজটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই ঢাকা কেন্দ্র শুধু বই পড়ার জায়গা হয়ে না থাকুক। এটি এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে মানুষ বইয়ের মাধ্যমে ঢাকাকে জানবে, গবেষণা করবে, আলোচনা করবে এবং শহরটির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কার করবে।’

পুরান ঢাকার সরু গলি পেরিয়ে ২৩ নম্বর মোহিনী মোহন দাস লেনে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্য এক ঢাকা। কাচের বাক্সে সাজানো প্রাচীন মুদ্রা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রেডিও, পুরোনো টেলিভিশন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি- সব মিলিয়ে এখানে যেন আটকে আছে শহরের বহু পুরোনো সময়। অথচ এত সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভাণ্ডারেও নেই পাঠকের ভিড়। লাইব্রেরির চেয়ারগুলো ফাঁকা, নীরবে পড়ে আছে বইয়ের সারি।
তবে এই নীরবতা কেবল পাঠকশূন্যতার গল্প নয় বরং ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন এক ভাণ্ডারকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। পুরান ঢাকার সরুগলি, সংস্কৃতি, মানুষের জীবন ও নগর-ইতিহাস ধরে রাখতে কাজ করে যাওয়া ‘ঢাকা কেন্দ্র’ এখন আরও পাঠক, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীর অপেক্ষায়।
মাওলা বখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কেন্দ্র শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়, বরং ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও চর্চার একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিষয়ক গবেষণা, প্রকাশনা, প্রদর্শনী ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে আসছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা কেন্দ্রের দুই তলা ভবনের পাঠকক্ষে নেই পাঠকের উপস্থিতি। বইয়ে ঠাসা তাক, পড়ার জন্য সাজানো চেয়ার-টেবিল থাকলেও পরিদর্শনের সময় পাঠকশূন্যই ছিল লাইব্রেরি। তবে নীরব এই পরিবেশের মধ্যেও সংরক্ষিত বই, দলিল ও নিদর্শনগুলো জানান দিচ্ছে ঢাকার অতীতকে ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। ইতিহাস ও গবেষণায় আগ্রহী তরুণদের কাছে জায়গাটি আরও পরিচিত করা গেলে এই নীরব পাঠকক্ষই হয়ে উঠতে পারে প্রাণবন্ত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই ঢাকা কেন্দ্র খোলা থাকে। গবেষকদের জন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য বিকfল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ পাঠকদের জন্য নির্দিষ্ট সময়েই এখানে এসে বই পড়া ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। গবেষকদের জন্য ফরমের মূল্য ৫০ টাকা রাখা হয়েছে। এই ফরমের মাধ্যমে গবেষকরা টানা তিন দিন ঢাকা কেন্দ্রের গবেষণা ও পাঠাগার সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ পান। তবে সাধারণ পাঠকদের জন্য কোনো ফরম বা প্রবেশমূল্য নেই। তারা বিনামূল্যেই লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারেন।
শুধু এসবই নয়, গ্যালারিতে রয়েছে বন্দুকের কার্টুজসহ ব্যাগ, গ্রামোফোন, হাতল-বিশিষ্ট পুরোনো ব্যাগ, কলের গানের মেশিন, টাইপরাইটার, পিতল ও রুপার তৈরি আসবাবপত্র, শঙ্খ ও খুরচুন। এছাড়াও রয়েছে পুরোনো ইট, পুরান ঢাকার বিলুপ্ত লোহারপুল সেতুর খণ্ড, খাবার গরম করার চীনামাটির পাত্র, ওষুধ তৈরির যন্ত্র, বিশেষ ধরনের ওজন মাপার যন্ত্র, আতরদানি, গোলাপজলদানিপুরোনো ক্যামেরা, ঘড়ি এবং বিভিন্ন সময়ের মানচিত্র। আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে এসব বস্তু কেবল পুরোনো সামগ্রীই নয়- এগুলো নগরজীবনের পরিবর্তন, মানুষের ব্যবহার ও সংস্কৃতির বিবর্তনের দৃশ্যমান দলিল।
ঢাকা কেন্দ্রের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ‘ঢাকার পঞ্চায়েত গ্যালারি’। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে ঢাকার প্রাচীন পঞ্চায়েত পরিচালনার দলিল, চিঠি, ব্যবহৃত আসবাব ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। একসময় পাড়া-মহল্লার সামাজিক ব্যবস্থাপনা, বিরোধ মীমাংসা কিংবা নানা সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এসব পঞ্চায়েত। সেই সময়ের দলিল ও ব্যবহার্য সামগ্রী এখন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। ঢাকার পঞ্চায়েত ও প্রতিষ্ঠাতা মাওলা বখশ সরদারকে ঘিরে নানা ঐতিহাসিক উপাদান এই কেন্দ্রের সংগ্রহে রয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এর লাইব্রেরি। এখানে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, গবেষণা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ে প্রায় বারো হাজার বই ও প্রকাশনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের সংবাদপত্র, সাময়িকী ও ঢাকা-সংক্রান্ত তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে বই বিক্রয় কেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক পরিবেশসম্মত একটি বাগান। ফলে ঢাকা কেন্দ্র শুধু পুরোনো নিদর্শন দেখার জায়গা নয়; অবসর সময় কাটানো, ইতিহাস পড়া, গবেষণা করা এবং ঢাকাকে নতুনভাবে জানারও একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে পাঠকশূন্যতার কারণে ঢাকা কেন্দ্রের গুরুত্বের জায়গাটি অনেকটা আড়ালে পড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এটাকে তরুণদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঠ ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানো এবং নিয়মিত ইতিহাসভিত্তিক আয়োজনের মাধ্যমে পাঠক তৈরি করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা কেন্দ্র ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আপন বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে মনে হলো যেন অতীত আমার চোখের সামনে চলে এসেছে। প্রতিটি নিদর্শন শুধু ইতিহাস নয়, আমাদের সংস্কৃতির গভীর রূপও তুলে ধরে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি বই, প্রতিটি কাচের প্রদর্শনী ঢাকার ইতিহাসের কথা বলে। একজন ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে এখানে আসাটা আমার জন্য যেমন গবেষণার খোরাক, তেমনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও ভাণ্ডার। তবে এই জায়গাকে মানুষের কাছে পরিচিত করা জরুরি।’
ঢাকা কেন্দ্রের সমন্বয়ক মনিরুজ্জামান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রের এই বই সংগ্রহের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ঢাকাকে নিয়ে প্রকাশিত বই, গবেষণাগ্রন্থ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা সংগ্রহ করে আসছি। বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে প্রায় ১২ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইতিহাস নয়, ঢাকার সংস্কৃতি, স্থাপত্য, রাজনীতি, সমাজ, আন্দোলন-সংগ্রামসহ নানা বিষয়ের বই ও দলিল রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহ এখনো থেমে নেই। কোথাও ঢাকাকে নিয়ে কোনো মৌলিক বা গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সন্ধান পেলেই সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। আমরা মনে করি, ঢাকাকে জানতে হলে শুধু বর্তমানকে দেখলেই হবে না, এর অতীত, মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব ও প্রতিরোধের ইতিহাসও জানা প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই এই বই সংগ্রহের কাজটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই ঢাকা কেন্দ্র শুধু বই পড়ার জায়গা হয়ে না থাকুক। এটি এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে মানুষ বইয়ের মাধ্যমে ঢাকাকে জানবে, গবেষণা করবে, আলোচনা করবে এবং শহরটির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কার করবে।’

পাঠকশূন্য ‘ঢাকা কেন্দ্র’, নীরবে আগলে রাখছে ঢাকার ইতিহাস
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

পুরান ঢাকার সরু গলি পেরিয়ে ২৩ নম্বর মোহিনী মোহন দাস লেনে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্য এক ঢাকা। কাচের বাক্সে সাজানো প্রাচীন মুদ্রা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার রেডিও, পুরোনো টেলিভিশন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি- সব মিলিয়ে এখানে যেন আটকে আছে শহরের বহু পুরোনো সময়। অথচ এত সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভাণ্ডারেও নেই পাঠকের ভিড়। লাইব্রেরির চেয়ারগুলো ফাঁকা, নীরবে পড়ে আছে বইয়ের সারি।
তবে এই নীরবতা কেবল পাঠকশূন্যতার গল্প নয় বরং ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন এক ভাণ্ডারকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়। পুরান ঢাকার সরুগলি, সংস্কৃতি, মানুষের জীবন ও নগর-ইতিহাস ধরে রাখতে কাজ করে যাওয়া ‘ঢাকা কেন্দ্র’ এখন আরও পাঠক, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীর অপেক্ষায়।
মাওলা বখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা কেন্দ্র শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়, বরং ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও চর্চার একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিষয়ক গবেষণা, প্রকাশনা, প্রদর্শনী ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে আসছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা কেন্দ্রের দুই তলা ভবনের পাঠকক্ষে নেই পাঠকের উপস্থিতি। বইয়ে ঠাসা তাক, পড়ার জন্য সাজানো চেয়ার-টেবিল থাকলেও পরিদর্শনের সময় পাঠকশূন্যই ছিল লাইব্রেরি। তবে নীরব এই পরিবেশের মধ্যেও সংরক্ষিত বই, দলিল ও নিদর্শনগুলো জানান দিচ্ছে ঢাকার অতীতকে ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। ইতিহাস ও গবেষণায় আগ্রহী তরুণদের কাছে জায়গাটি আরও পরিচিত করা গেলে এই নীরব পাঠকক্ষই হয়ে উঠতে পারে প্রাণবন্ত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিনই ঢাকা কেন্দ্র খোলা থাকে। গবেষকদের জন্য সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য বিকfল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফলে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ পাঠকদের জন্য নির্দিষ্ট সময়েই এখানে এসে বই পড়া ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। গবেষকদের জন্য ফরমের মূল্য ৫০ টাকা রাখা হয়েছে। এই ফরমের মাধ্যমে গবেষকরা টানা তিন দিন ঢাকা কেন্দ্রের গবেষণা ও পাঠাগার সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ পান। তবে সাধারণ পাঠকদের জন্য কোনো ফরম বা প্রবেশমূল্য নেই। তারা বিনামূল্যেই লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারেন।
শুধু এসবই নয়, গ্যালারিতে রয়েছে বন্দুকের কার্টুজসহ ব্যাগ, গ্রামোফোন, হাতল-বিশিষ্ট পুরোনো ব্যাগ, কলের গানের মেশিন, টাইপরাইটার, পিতল ও রুপার তৈরি আসবাবপত্র, শঙ্খ ও খুরচুন। এছাড়াও রয়েছে পুরোনো ইট, পুরান ঢাকার বিলুপ্ত লোহারপুল সেতুর খণ্ড, খাবার গরম করার চীনামাটির পাত্র, ওষুধ তৈরির যন্ত্র, বিশেষ ধরনের ওজন মাপার যন্ত্র, আতরদানি, গোলাপজলদানিপুরোনো ক্যামেরা, ঘড়ি এবং বিভিন্ন সময়ের মানচিত্র। আধুনিক প্রযুক্তির এই সময়ে এসব বস্তু কেবল পুরোনো সামগ্রীই নয়- এগুলো নগরজীবনের পরিবর্তন, মানুষের ব্যবহার ও সংস্কৃতির বিবর্তনের দৃশ্যমান দলিল।
ঢাকা কেন্দ্রের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ‘ঢাকার পঞ্চায়েত গ্যালারি’। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে ঢাকার প্রাচীন পঞ্চায়েত পরিচালনার দলিল, চিঠি, ব্যবহৃত আসবাব ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। একসময় পাড়া-মহল্লার সামাজিক ব্যবস্থাপনা, বিরোধ মীমাংসা কিংবা নানা সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এসব পঞ্চায়েত। সেই সময়ের দলিল ও ব্যবহার্য সামগ্রী এখন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। ঢাকার পঞ্চায়েত ও প্রতিষ্ঠাতা মাওলা বখশ সরদারকে ঘিরে নানা ঐতিহাসিক উপাদান এই কেন্দ্রের সংগ্রহে রয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এর লাইব্রেরি। এখানে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, গবেষণা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ে প্রায় বারো হাজার বই ও প্রকাশনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের সংবাদপত্র, সাময়িকী ও ঢাকা-সংক্রান্ত তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আছে বই বিক্রয় কেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক পরিবেশসম্মত একটি বাগান। ফলে ঢাকা কেন্দ্র শুধু পুরোনো নিদর্শন দেখার জায়গা নয়; অবসর সময় কাটানো, ইতিহাস পড়া, গবেষণা করা এবং ঢাকাকে নতুনভাবে জানারও একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে পাঠকশূন্যতার কারণে ঢাকা কেন্দ্রের গুরুত্বের জায়গাটি অনেকটা আড়ালে পড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এটাকে তরুণদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাঠ ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানো এবং নিয়মিত ইতিহাসভিত্তিক আয়োজনের মাধ্যমে পাঠক তৈরি করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা কেন্দ্র ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আপন বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে মনে হলো যেন অতীত আমার চোখের সামনে চলে এসেছে। প্রতিটি নিদর্শন শুধু ইতিহাস নয়, আমাদের সংস্কৃতির গভীর রূপও তুলে ধরে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি বই, প্রতিটি কাচের প্রদর্শনী ঢাকার ইতিহাসের কথা বলে। একজন ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে এখানে আসাটা আমার জন্য যেমন গবেষণার খোরাক, তেমনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারও ভাণ্ডার। তবে এই জায়গাকে মানুষের কাছে পরিচিত করা জরুরি।’
ঢাকা কেন্দ্রের সমন্বয়ক মনিরুজ্জামান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রের এই বই সংগ্রহের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ঢাকাকে নিয়ে প্রকাশিত বই, গবেষণাগ্রন্থ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা সংগ্রহ করে আসছি। বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে প্রায় ১২ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ইতিহাস নয়, ঢাকার সংস্কৃতি, স্থাপত্য, রাজনীতি, সমাজ, আন্দোলন-সংগ্রামসহ নানা বিষয়ের বই ও দলিল রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহ এখনো থেমে নেই। কোথাও ঢাকাকে নিয়ে কোনো মৌলিক বা গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সন্ধান পেলেই সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। আমরা মনে করি, ঢাকাকে জানতে হলে শুধু বর্তমানকে দেখলেই হবে না, এর অতীত, মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব ও প্রতিরোধের ইতিহাসও জানা প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই এই বই সংগ্রহের কাজটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই ঢাকা কেন্দ্র শুধু বই পড়ার জায়গা হয়ে না থাকুক। এটি এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে মানুষ বইয়ের মাধ্যমে ঢাকাকে জানবে, গবেষণা করবে, আলোচনা করবে এবং শহরটির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে নতুন করে আবিষ্কার করবে।’

শত বছর পেরিয়েও সচল পুরান ঢাকার দুই কুয়া
পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ যাবে নতুন মেট্রোরেল, ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা







