শিরোনাম

দেশে নিরক্ষর ২২.১ শতাংশ মানুষ, ঠকছেন পদে পদে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে নিরক্ষর ২২.১ শতাংশ মানুষ, ঠকছেন পদে পদে
প্রতীকী ছবি

আজ ৮ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেস্কো) সাধারণ সম্মেলনের ১৪ তম অধিবেশনে ৮ সেপ্টেম্বর তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি উদ্‌যাপিত হয়। এ বছর সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। দিবসটি উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘বাংলাদেশে সাক্ষরতা বিস্তারে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। তবে বাংলাদেশে এখনও ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ নিরক্ষর। শুধু অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তারা পদে পদে ঠকছেন। শিকার হচ্ছেন ঘুষ ও হয়রানির।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লক্ষ ৮০ হাজার। এর মধ্যে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। সেই হিসাবে এখনও নিরক্ষর মোট জনগোষ্ঠীর ২২ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ।

সাইপ্রাস যাওয়ার জন্য রাজধানীর একটি এজেন্সিতে যান রফিকুল ইসলাম। তার বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনী। প্রায় দুই বছর ধরে ঘুরলেও এখনো কোনো কুলকিনারা হয়নি। তিনি বলেন, ‘লেখাপড়া না জানার কারণে দালালের মাধ্যমে এজেন্সিতে টাকা দিয়েছি। বিভিন্ন সময়ে লক্ষাধিক টাকা নিয়েছে। তবে এখনও ভিসা হয়নি। ট্রেনিংয়ের জন্য সম্প্রতি ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। তবে এখনও পাঠায়নি। শুধু রফিকুল ইসলাম নন, লেখাপড়া জানেন না বলে প্রতিদিনই পদে পদে ঠকছেন শত শত মানুষ।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। এই অগ্রগতি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘এখনো একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে। তাদের মধ্যে বিদ্যালয় বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ রয়েছে। তাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান শর্ত।’ দেশে ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।’ একাধিক পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাক্ষরতার হার নিয়ে একদিকে যেমন সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে, অন্যদিকে সাক্ষরতার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার সঙ্গেও আমাদের কার্যক্রমের মিল নেই। এ কারণে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার পরিকল্পনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

যদিও স্বাধীনতার পর থেকে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। তবে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের দারিদ্র্যের হার যত কমেছে সাক্ষরতার হার তত বেড়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি আর সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬.৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার নেমে দাঁড়িয়েছে ২১.৪ শতাংশে। গত ৫৫ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৫৮ শতাংশ। এই সময়ে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ৬১.১ শতাংশ।

এদিকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘সাক্ষরতা শুধু পড়া, লেখা ও গণনার দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবন দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, নৈতিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সচেতনতা ও সমাজের সমৃদ্ধিও এর অন্তর্ভুক্ত।’

দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সাক্ষরতার অর্থ এখন আর শুধু পড়া, লেখা ও গণনার মৌলিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতা, তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, জীবনদক্ষতা, পরিবেশ-সচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও যুক্ত হয়েছে। মানুষের উন্নয়ন, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতির সংযোগস্থলেই আজকের সাক্ষরতার অবস্থান। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক, কর্মমুখী ও নৈতিক শিক্ষায় উত্তরণ।’

/জেএইচ/