‘বেতন ফুরিয়ে যায়, বাবার দায়িত্ব ফুরায় না’

‘বেতন ফুরিয়ে যায়, বাবার দায়িত্ব ফুরায় না’
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

মাসের শেষ সপ্তাহ। রান্নাঘরের বাজার প্রায় শেষ। মেয়েদের স্কুলের পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। অথচ পরের বেতন পেতে এখনও কয়েক দিন বাকি। হাতে থাকা টাকায় কোন খরচটা আগে মিটাবেন, সেটিই তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ঢাকার মালিবাগের বাসিন্দা মো. মুজাহিদ হোসেনের সামনে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন মো. মুজাহিদ। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার তাঁর। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর হিসাবটা স্বাভাবিক মনে হলেও বাসাভাড়া, বাজার, মেয়েদের পড়াশোনা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ একের পর এক খরচ মেটাতে মেটাতে মাসের শেষ দিকে এসে সেই আয় আর যথেষ্ট মনে হয় না।
‘বেতন পাওয়ার পর মনে হয় এবার হয়তো কিছু টাকা জমাতে পারব। কিন্তু মাসের ১৫-২০ দিন যেতেই বুঝতে পারি, হাতে আর তেমন কিছু নেই। এরপর মাসের বাকি দিনগুলো হিসাব করে চলতে হয়,’ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের কাছে এমনটাই বলছিলেন মুজাহিদ।
মুজাহিদের মতো ঢাকার অসংখ্য বেসরকারি চাকরিজীবীর বাস্তবতা অনেকটা একই। আয় বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীদের কাছে মাসের শুরুতে পাওয়া টাকা মাস শেষ পর্যন্ত ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুজাহিদের মাসিক বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যায় বাসাভাড়ায়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেটের বিল যোগ হলে আবাসন খাতেই চলে যায় আয়ের বড় একটি অংশ।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাসাভাড়া কমাতে গেলে দূরে যেতে হবে। দূরে গেলে অফিসে যাতায়াতের খরচ ও সময় দুটোই বাড়ে। আবার অফিসের কাছে থাকলে ভাড়া বেশি। আসলে দুই দিকেই সমস্যা।’
ঢাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বাসাভাড়া দীর্ঘদিন ধরেই বড় ব্যয়ের খাত। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করলে তুলনামূলক একটু বড় বাসা প্রয়োজন হয়। ফলে একা থাকা চাকরিজীবীর সঙ্গে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া চাকরিজীবীর মাসিক হিসাব এক থাকে না।
বাজারের ব্যাগ ছোট হচ্ছে
মুজাহিদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের আরেকটি জায়গা খাবার ও নিত্যপণ্য। মাসের শুরুতে বাজারের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করেন, মাসের শেষ দশ দিনে এসে সেই টাকায় টান পড়ে। মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে সবজি, ডাল ও ডিমের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ‘দাম বৃদ্ধি দেখে মনে হয় ডিমও যেন দিন দিন বিলাসী খাবারে পরিণত হচ্ছে’—এমনটাই বলছিলেন মুজাহিদের স্ত্রী ফারহানা পারভীন রুনা।
রুনা বলেন, ‘আমার হাজবেন্ড বেশি ব্যস্ত থাকায় বাড়ির বাজার আমিই করি। আগে যে টাকায় একসঙ্গে অনেক কিছু কেনা যেত, এখন সেই একই টাকা নিয়ে বাজারে গেলেও ব্যাগ ভরে না। তাই কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা পরে কেনা যাবে, সবসময় সেই অঙ্কই করতে হয়।’
পরিবারের দুই মেয়ের পড়াশোনাও আরেকটি বড় খরচ। স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি, ছোট ছোট খরচ মিলিয়েই মাস শেষে বড় অঙ্ক দাঁড়ায়। মেয়েদের কোনো আবদার পূরণ করতে গেলেও তাঁকে অন্য কোনো খাতে কাটছাঁট করতে হয়।
সঞ্চয় যেন বিলাসিতা
৫০ হাজার টাকা আয় করলেও নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারেন না মুজাহিদ। মাসের শুরুতে সঞ্চয়ের পরিকল্পনা থাকলেও জরুরি কোনো খরচ এলেই সেই টাকা খরচ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘সঞ্চয় করতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাসে কোনো না কোনো অতিরিক্ত খরচ আসবেই। কখনো বাচ্চার অসুখ, কখনো বাড়তি পড়াশোনার খরচ, কখনো বাসার কোনো সমস্যা। ছোট মেয়েকে এবারই স্কুলে ভর্তি করলাম। তার আবদারও ফেলতে পারি না। এসব সময় সঞ্চয়ের টাকা ভাঙতে হয়।’
মুজাহিদের মতো চাকরিজীবীদের কাছে বেতন পাওয়ার দিনটি আনন্দের হলেও মাস শেষ হওয়ার দিনটি অনেক সময় হয়ে ওঠে স্বস্তির। কারণ তখন নতুন করে বেতন পাওয়ার অপেক্ষা শুরু হয়।
‘মাসের শেষ দিকে পকেটে টাকা না থাকলেও পরিবারের সামনে সেটা বোঝাতে চাই না। মেয়েরা কিছু চাইলে সবসময় তো বলা যায় না, টাকা নেই। তাই অনেক সময় নিজের প্রয়োজন বাদ দিই। বেতন ফুরিয়ে গেলেও বাবার দায়িত্ব ফুরায় না,’ বলেন তিনি।
মুজাহিদের আরেক চাপ হলো সামাজিক প্রত্যাশা। ঢাকায় ভালো বেতন পান বলে আত্মীয়-স্বজনের আর্থিক সহায়তার প্রত্যাশা থাকে। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিতে ড্রেসকোড ও ফিটফাট থাকতে পোশাক-পরিচ্ছদেও বাড়তি খরচ হয়। ফলে নিজের সংসার চালিয়ে মাস শেষে টান পড়লেও অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার মানসিক চাপ থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি পরিবারের আর্থিক স্বস্তি শুধু মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধানই প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণ করে। ঢাকার মতো উচ্চ ব্যয়ের শহরে বাসাভাড়া, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ একসঙ্গে বহন করতে হলে মাঝারি আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এসব বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, একজন মানুষের উপার্জনের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করা স্বাভাবিক। বাকি ৩০ শতাংশ চাইলে তিনি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করতে পারেন। এর চেয়ে বেশি ব্যয় হয়ে গেলে সেটিকে কোনোভাবেই আদর্শ বলা যায় না।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অন্যতম কারণ। এ ছাড়া উৎপাদন কমে যাওয়া, সঠিকভাবে বাজার মনিটরিং না করা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি ও যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক প্রভাবও ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

মাসের শেষ সপ্তাহ। রান্নাঘরের বাজার প্রায় শেষ। মেয়েদের স্কুলের পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। অথচ পরের বেতন পেতে এখনও কয়েক দিন বাকি। হাতে থাকা টাকায় কোন খরচটা আগে মিটাবেন, সেটিই তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ঢাকার মালিবাগের বাসিন্দা মো. মুজাহিদ হোসেনের সামনে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন মো. মুজাহিদ। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার তাঁর। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর হিসাবটা স্বাভাবিক মনে হলেও বাসাভাড়া, বাজার, মেয়েদের পড়াশোনা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ একের পর এক খরচ মেটাতে মেটাতে মাসের শেষ দিকে এসে সেই আয় আর যথেষ্ট মনে হয় না।
‘বেতন পাওয়ার পর মনে হয় এবার হয়তো কিছু টাকা জমাতে পারব। কিন্তু মাসের ১৫-২০ দিন যেতেই বুঝতে পারি, হাতে আর তেমন কিছু নেই। এরপর মাসের বাকি দিনগুলো হিসাব করে চলতে হয়,’ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের কাছে এমনটাই বলছিলেন মুজাহিদ।
মুজাহিদের মতো ঢাকার অসংখ্য বেসরকারি চাকরিজীবীর বাস্তবতা অনেকটা একই। আয় বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীদের কাছে মাসের শুরুতে পাওয়া টাকা মাস শেষ পর্যন্ত ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুজাহিদের মাসিক বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যায় বাসাভাড়ায়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেটের বিল যোগ হলে আবাসন খাতেই চলে যায় আয়ের বড় একটি অংশ।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাসাভাড়া কমাতে গেলে দূরে যেতে হবে। দূরে গেলে অফিসে যাতায়াতের খরচ ও সময় দুটোই বাড়ে। আবার অফিসের কাছে থাকলে ভাড়া বেশি। আসলে দুই দিকেই সমস্যা।’
ঢাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বাসাভাড়া দীর্ঘদিন ধরেই বড় ব্যয়ের খাত। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করলে তুলনামূলক একটু বড় বাসা প্রয়োজন হয়। ফলে একা থাকা চাকরিজীবীর সঙ্গে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া চাকরিজীবীর মাসিক হিসাব এক থাকে না।
বাজারের ব্যাগ ছোট হচ্ছে
মুজাহিদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের আরেকটি জায়গা খাবার ও নিত্যপণ্য। মাসের শুরুতে বাজারের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করেন, মাসের শেষ দশ দিনে এসে সেই টাকায় টান পড়ে। মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে সবজি, ডাল ও ডিমের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ‘দাম বৃদ্ধি দেখে মনে হয় ডিমও যেন দিন দিন বিলাসী খাবারে পরিণত হচ্ছে’—এমনটাই বলছিলেন মুজাহিদের স্ত্রী ফারহানা পারভীন রুনা।
রুনা বলেন, ‘আমার হাজবেন্ড বেশি ব্যস্ত থাকায় বাড়ির বাজার আমিই করি। আগে যে টাকায় একসঙ্গে অনেক কিছু কেনা যেত, এখন সেই একই টাকা নিয়ে বাজারে গেলেও ব্যাগ ভরে না। তাই কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা পরে কেনা যাবে, সবসময় সেই অঙ্কই করতে হয়।’
পরিবারের দুই মেয়ের পড়াশোনাও আরেকটি বড় খরচ। স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি, ছোট ছোট খরচ মিলিয়েই মাস শেষে বড় অঙ্ক দাঁড়ায়। মেয়েদের কোনো আবদার পূরণ করতে গেলেও তাঁকে অন্য কোনো খাতে কাটছাঁট করতে হয়।
সঞ্চয় যেন বিলাসিতা
৫০ হাজার টাকা আয় করলেও নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারেন না মুজাহিদ। মাসের শুরুতে সঞ্চয়ের পরিকল্পনা থাকলেও জরুরি কোনো খরচ এলেই সেই টাকা খরচ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘সঞ্চয় করতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাসে কোনো না কোনো অতিরিক্ত খরচ আসবেই। কখনো বাচ্চার অসুখ, কখনো বাড়তি পড়াশোনার খরচ, কখনো বাসার কোনো সমস্যা। ছোট মেয়েকে এবারই স্কুলে ভর্তি করলাম। তার আবদারও ফেলতে পারি না। এসব সময় সঞ্চয়ের টাকা ভাঙতে হয়।’
মুজাহিদের মতো চাকরিজীবীদের কাছে বেতন পাওয়ার দিনটি আনন্দের হলেও মাস শেষ হওয়ার দিনটি অনেক সময় হয়ে ওঠে স্বস্তির। কারণ তখন নতুন করে বেতন পাওয়ার অপেক্ষা শুরু হয়।
‘মাসের শেষ দিকে পকেটে টাকা না থাকলেও পরিবারের সামনে সেটা বোঝাতে চাই না। মেয়েরা কিছু চাইলে সবসময় তো বলা যায় না, টাকা নেই। তাই অনেক সময় নিজের প্রয়োজন বাদ দিই। বেতন ফুরিয়ে গেলেও বাবার দায়িত্ব ফুরায় না,’ বলেন তিনি।
মুজাহিদের আরেক চাপ হলো সামাজিক প্রত্যাশা। ঢাকায় ভালো বেতন পান বলে আত্মীয়-স্বজনের আর্থিক সহায়তার প্রত্যাশা থাকে। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিতে ড্রেসকোড ও ফিটফাট থাকতে পোশাক-পরিচ্ছদেও বাড়তি খরচ হয়। ফলে নিজের সংসার চালিয়ে মাস শেষে টান পড়লেও অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার মানসিক চাপ থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি পরিবারের আর্থিক স্বস্তি শুধু মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধানই প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণ করে। ঢাকার মতো উচ্চ ব্যয়ের শহরে বাসাভাড়া, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ একসঙ্গে বহন করতে হলে মাঝারি আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এসব বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, একজন মানুষের উপার্জনের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করা স্বাভাবিক। বাকি ৩০ শতাংশ চাইলে তিনি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করতে পারেন। এর চেয়ে বেশি ব্যয় হয়ে গেলে সেটিকে কোনোভাবেই আদর্শ বলা যায় না।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অন্যতম কারণ। এ ছাড়া উৎপাদন কমে যাওয়া, সঠিকভাবে বাজার মনিটরিং না করা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি ও যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক প্রভাবও ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

‘বেতন ফুরিয়ে যায়, বাবার দায়িত্ব ফুরায় না’
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

মাসের শেষ সপ্তাহ। রান্নাঘরের বাজার প্রায় শেষ। মেয়েদের স্কুলের পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। অথচ পরের বেতন পেতে এখনও কয়েক দিন বাকি। হাতে থাকা টাকায় কোন খরচটা আগে মিটাবেন, সেটিই তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ঢাকার মালিবাগের বাসিন্দা মো. মুজাহিদ হোসেনের সামনে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন মো. মুজাহিদ। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার তাঁর। মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর হিসাবটা স্বাভাবিক মনে হলেও বাসাভাড়া, বাজার, মেয়েদের পড়াশোনা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ একের পর এক খরচ মেটাতে মেটাতে মাসের শেষ দিকে এসে সেই আয় আর যথেষ্ট মনে হয় না।
‘বেতন পাওয়ার পর মনে হয় এবার হয়তো কিছু টাকা জমাতে পারব। কিন্তু মাসের ১৫-২০ দিন যেতেই বুঝতে পারি, হাতে আর তেমন কিছু নেই। এরপর মাসের বাকি দিনগুলো হিসাব করে চলতে হয়,’ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের কাছে এমনটাই বলছিলেন মুজাহিদ।
মুজাহিদের মতো ঢাকার অসংখ্য বেসরকারি চাকরিজীবীর বাস্তবতা অনেকটা একই। আয় বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীদের কাছে মাসের শুরুতে পাওয়া টাকা মাস শেষ পর্যন্ত ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুজাহিদের মাসিক বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যায় বাসাভাড়ায়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেটের বিল যোগ হলে আবাসন খাতেই চলে যায় আয়ের বড় একটি অংশ।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাসাভাড়া কমাতে গেলে দূরে যেতে হবে। দূরে গেলে অফিসে যাতায়াতের খরচ ও সময় দুটোই বাড়ে। আবার অফিসের কাছে থাকলে ভাড়া বেশি। আসলে দুই দিকেই সমস্যা।’
ঢাকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বাসাভাড়া দীর্ঘদিন ধরেই বড় ব্যয়ের খাত। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করলে তুলনামূলক একটু বড় বাসা প্রয়োজন হয়। ফলে একা থাকা চাকরিজীবীর সঙ্গে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া চাকরিজীবীর মাসিক হিসাব এক থাকে না।
বাজারের ব্যাগ ছোট হচ্ছে
মুজাহিদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের আরেকটি জায়গা খাবার ও নিত্যপণ্য। মাসের শুরুতে বাজারের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করেন, মাসের শেষ দশ দিনে এসে সেই টাকায় টান পড়ে। মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে সবজি, ডাল ও ডিমের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ‘দাম বৃদ্ধি দেখে মনে হয় ডিমও যেন দিন দিন বিলাসী খাবারে পরিণত হচ্ছে’—এমনটাই বলছিলেন মুজাহিদের স্ত্রী ফারহানা পারভীন রুনা।
রুনা বলেন, ‘আমার হাজবেন্ড বেশি ব্যস্ত থাকায় বাড়ির বাজার আমিই করি। আগে যে টাকায় একসঙ্গে অনেক কিছু কেনা যেত, এখন সেই একই টাকা নিয়ে বাজারে গেলেও ব্যাগ ভরে না। তাই কোনটা প্রয়োজন আর কোনটা পরে কেনা যাবে, সবসময় সেই অঙ্কই করতে হয়।’
পরিবারের দুই মেয়ের পড়াশোনাও আরেকটি বড় খরচ। স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি, ছোট ছোট খরচ মিলিয়েই মাস শেষে বড় অঙ্ক দাঁড়ায়। মেয়েদের কোনো আবদার পূরণ করতে গেলেও তাঁকে অন্য কোনো খাতে কাটছাঁট করতে হয়।
সঞ্চয় যেন বিলাসিতা
৫০ হাজার টাকা আয় করলেও নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারেন না মুজাহিদ। মাসের শুরুতে সঞ্চয়ের পরিকল্পনা থাকলেও জরুরি কোনো খরচ এলেই সেই টাকা খরচ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘সঞ্চয় করতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাসে কোনো না কোনো অতিরিক্ত খরচ আসবেই। কখনো বাচ্চার অসুখ, কখনো বাড়তি পড়াশোনার খরচ, কখনো বাসার কোনো সমস্যা। ছোট মেয়েকে এবারই স্কুলে ভর্তি করলাম। তার আবদারও ফেলতে পারি না। এসব সময় সঞ্চয়ের টাকা ভাঙতে হয়।’
মুজাহিদের মতো চাকরিজীবীদের কাছে বেতন পাওয়ার দিনটি আনন্দের হলেও মাস শেষ হওয়ার দিনটি অনেক সময় হয়ে ওঠে স্বস্তির। কারণ তখন নতুন করে বেতন পাওয়ার অপেক্ষা শুরু হয়।
‘মাসের শেষ দিকে পকেটে টাকা না থাকলেও পরিবারের সামনে সেটা বোঝাতে চাই না। মেয়েরা কিছু চাইলে সবসময় তো বলা যায় না, টাকা নেই। তাই অনেক সময় নিজের প্রয়োজন বাদ দিই। বেতন ফুরিয়ে গেলেও বাবার দায়িত্ব ফুরায় না,’ বলেন তিনি।
মুজাহিদের আরেক চাপ হলো সামাজিক প্রত্যাশা। ঢাকায় ভালো বেতন পান বলে আত্মীয়-স্বজনের আর্থিক সহায়তার প্রত্যাশা থাকে। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিতে ড্রেসকোড ও ফিটফাট থাকতে পোশাক-পরিচ্ছদেও বাড়তি খরচ হয়। ফলে নিজের সংসার চালিয়ে মাস শেষে টান পড়লেও অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার মানসিক চাপ থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি পরিবারের আর্থিক স্বস্তি শুধু মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধানই প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণ করে। ঢাকার মতো উচ্চ ব্যয়ের শহরে বাসাভাড়া, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ একসঙ্গে বহন করতে হলে মাঝারি আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এসব বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, একজন মানুষের উপার্জনের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করা স্বাভাবিক। বাকি ৩০ শতাংশ চাইলে তিনি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করতে পারেন। এর চেয়ে বেশি ব্যয় হয়ে গেলে সেটিকে কোনোভাবেই আদর্শ বলা যায় না।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অন্যতম কারণ। এ ছাড়া উৎপাদন কমে যাওয়া, সঠিকভাবে বাজার মনিটরিং না করা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি ও যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক প্রভাবও ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।








আদর্শেন্যায়ভিত্তিকসমাজগড়ারআহ্বানরাষ্ট্রপতির-CznNewsLab-25c269.jpg)