শিরোনাম

বেবিচকের সেই তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে মন্ত্রণালয়

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
বেবিচকের সেই তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে মন্ত্রণালয়
বেবিচকের তিন প্রকৌশলী

দুর্নীতির মামলায় নাম থাকার পরও ‘মামলা নেই’ উল্লেখ করে দেওয়া দায়মুক্তির চিঠির ভিত্তিতে পদোন্নতি পাওয়ার ঘটনায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানের মধ্যে থাকা আরেক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বেবিচকের যে তিন প্রকৌশলীকে ঘিরে বিষয়টি সামনে এসেছে, তারা হলেন আমিনুল হাসিব, মইদুর রহমান মো. মওদুদ ও এ এইচ এমডি নুরউদ্দীন চৌধুরী। তাদের মধ্যে আমিনুল হাসিব ও মওদুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের মার্চে তাদের ‘কোনো মামলা নেই’ উল্লেখ করে দায়মুক্তির চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির ভিত্তিতে আমিনুল হাসিব নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতিও পান।

পরে দুদক চিঠিটিতে ভুল তথ্য থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তা প্রতিস্থাপন করে নতুন চিঠি দেয়। নতুন চিঠিতে দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে চলমান মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে প্রকৌশলী নুরউদ্দীন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। পাশাপাশি একই প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার (পিই)—দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বেবিচক

বেবিচকের সদস্য প্রশাসন অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, আমিনুল হাসিব ও মওদুদকে দেওয়া দুদকের দায়মুক্তি এবং পরে তা প্রত্যাহারের বিষয়টি তারা জানেন। দায়মুক্তি প্রত্যাহারের চিঠির একটি কপি বেবিচকও পেয়েছে।

তবে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ বা নির্দেশনা বেবিচকে পৌঁছেনি বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য, মন্ত্রণালয় যখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল, তখন দুদক থেকে দায়মুক্তির চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠির ভিত্তিতেই আমিনুল হাসিবকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখন দুদক আগের তথ্য সংশোধন করে দায়মুক্তি প্রত্যাহার করায় মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নুরউদ্দীন চৌধুরীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেবিচকে প্রকৌশলীর সংকট থাকায় তাকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধেও দুদকের তদন্ত চলছে। দুদক কোনো অনুসন্ধানী ফলাফল দিলে সেটির ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দায়মুক্তির চিঠিতে ছিল ‘ভুল তথ্য’

জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একাধিক বিমানবন্দর প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করে দুদক।

দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় আমিনুল হাসিবকে ৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে। একইভাবে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ২১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় মওদুদ ৯ নম্বর আসামি। দুটি মামলাই বর্তমানে দুদকের মানিলন্ডারিং শাখায় তদন্তাধীন।

এরপর ২০২৬ সালের ১১ মার্চ বেবিচকের সিভিল সার্কেল প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী মইদুর রহমান মো. মওদুদকে দায়মুক্তি দিয়ে চিঠি দেয় দুদক।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, দুদকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বেবিচকের ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন নেই।

ওই চিঠি পাওয়ার পর আমিনুল হাসিব নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সমালোচনা শুরু হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদক জানায়, আগের চিঠিতে ভুল তথ্য ছিল। দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানান, একই তারিখ ও স্মারকের আগের চিঠির পরিবর্তে প্রকৃত তথ্য উল্লেখ করে নতুন চিঠি পাঠানো হবে।

নতুন চিঠিতে আমিনুল হাসিব ও মওদুদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানান, একই তারিখ ও স্মারকে প্রতিস্থাপন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আগের স্মারক নম্বর ও ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখ রাখা হলেও পরিচালক মোহাম্মাদ নাজমুল হাসানের স্বাক্ষরের নিচে ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিস্থাপিত চিঠিতে বলা হয়, আমিনুল হাসিব দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এর ৮৫ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি মামলাটি করা হয় এবং তদন্ত এখনো চলছে।

মওদুদ একই কার্যালয়ের ৮৪ নম্বর মামলার ৯ নম্বর আসামি। একই তারিখে করা ওই মামলার তদন্তও চলমান।

বিতর্কে আমিনুল হাসিব

কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৯ সালের নভেম্বরে আমিনুল হাসিবকে বরখাস্ত করেছিল বেবিচক। পরে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খানের সুপারিশে ২০২১ সালে তার চাকরি নিয়মিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর ২০২৩ সালে তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বা সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বেবিচক তাকে ওই দায়িত্ব দেয় এবং প্রায় চার বছর তিনি চলতি দায়িত্বে ছিলেন। পরে দুদকের ‘মামলা নেই’ উল্লেখ করা চিঠি পাওয়ার পর তাকে পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

তার বিরুদ্ধে দুদকের কাছ থেকে দায়মুক্তির চিঠি ও পদোন্নতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি তা অস্বীকার করেছেন।

আমিনুল হাসিবের ভাষ্য, দুদক ভুল করে থাকলে তার কিছু করার নেই। তিনি বলেন, কোনো মামলা থাকলেই যে পদোন্নতি পাওয়া যাবে না, এমন নয়। মামলায় এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। অভিযোগপত্র হলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে কি না, সেটি ভিন্ন বিষয়।

গত বছরের ২১ থেকে ২৮ ডিসেম্বর তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরের সময় কর্তৃপক্ষকে না জানানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সফরকালে তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তিনি দেশে ফেরেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনা নিয়ে বেবিচকে আলোচনা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই প্রকল্পে দুই দায়িত্বে নুরউদ্দীন

অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দীন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একই প্রকল্পে একাধিক দায়িত্ব পালন এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রের দাবি, রাজস্ব খাতে একই পদে বা একই দপ্তরে কোনো কর্মকর্তার তিন বছরের বেশি সময় থাকার সুযোগ নেই। অথচ নুরউদ্দীন চৌধুরী পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই দায়িত্বে রয়েছেন। তাও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে।

তিনি বেবিচকের বাস্তবায়নাধীন ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারিত (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে ওই প্রকল্পে প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা পূর্ণকালীন কোনো পদে নিয়োগ পেলে একই সময়ে অন্য কোনো দায়িত্বে থাকার সুযোগ নেই। বিশেষ করে একই প্রকল্পে একাধিক পদে দায়িত্ব পালন নিয়মবহির্ভূত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিষয়টি খতিয়ে দেখছে মন্ত্রণালয়

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, দুদকের দায়মুক্তির চিঠিতে ভুল তথ্য থাকার বিষয়টি নিয়ে তারা বিব্রত। দুদক নিজেই আগের চিঠির তথ্য সংশোধন করায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমিনুল হাসিব পদোন্নতি পাওয়ার জন্য কোনো ধরনের যোগসাজশ করে দুদক থেকে দায়মুক্তির চিঠি নিয়েছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বেবিচকের প্রকৌশল শাখার যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান বা মামলা রয়েছে, তাদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে না রাখা এবং দুদকের তদন্ত বা মামলার চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

/এমআর/