শিরোনাম

মিরপুরে সড়ক দখল করে ট্রাকস্ট্যান্ড, চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
মিরপুরে সড়ক দখল করে ট্রাকস্ট্যান্ড, চাঁদাবাজি
মিরপুরের কালশীতে সড়ক দখল করে শত শত ট্রাক ও পিকআপভ্যান রাখা হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের সুবিধার জন্য তিন বছর আগে সড়কটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু এখন এই সড়কের বেশিরভাগ এলাকা দখল করে বসানো হয়েছে ট্রাকস্ট্যান্ড। আবার সড়কের এক পাশে বন্ধ করে দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ময়লা ফেলার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)। এতে এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছে হাজারো মানুষ।

এই বিশৃঙ্খল অবস্থা রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বরের কালশী মোড়-বাউনিয়া বাঁধ সড়কের। সড়কটির চার লেনের তিন লেনেই অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড। এখানে শত শত ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপভ্যান রাখা হচ্ছে।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মিত এই সড়কটি মানুষের তেমন উপকারে আসছে না। এটা সরকারি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার এখানে সমিতির নামে প্রতিমাসে গাড়ির মালিকদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির কালশী মোড় থেকে প্রায় ৩৫০ মিটার দীর্ঘদিন বেহাল ছিল। পরে ২০১৭ সালের দিকে মেট্রোরেলের কাজ শুরু হলে মিরপুর ১১ নম্বরের প্রধান সড়কের ওপর রাখা ট্রাকগুলো সরিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়। তখন ট্রাকের সংখ্যা কম ছিল। কিন্তু পরে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় এই অংশ ট্রাকস্ট্যান্ডে পরিণত হয়।

মিরপুরের কালশীতে সড়ক দখল করে রাখা সারি সারি ট্রাক-পিকআপভ্যান। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
মিরপুরের কালশীতে সড়ক দখল করে রাখা সারি সারি ট্রাক-পিকআপভ্যান। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধা কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের প্রস্থ বাড়িয়ে ১২০ ফুট করা হয়। সড়কের মাঝখানে নির্মাণ করা হয় বিশাল সড়ক দ্বীপ (আইল্যান্ড)। সেখানে স্থানীয়দের জন্য পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। ফুটপাতেও বসানো হয়েছে টাইলস। কিন্তু সংস্কার শেষ হওয়ার প্রায় দেড় বছর পরও সরেনি অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড।

সোমবার (২৪ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন সড়কের বিভিন্ন অংশে সারি সারি ট্রাক, লরি ও পিকআপভ্যান রাখা। কোথাও চলছে ট্রাক মেরামত, কোথাও ধোয়া-মোছার কাজ। সড়কের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে সড়ক দ্বীপ ভেঙে রাখা হয়েছে ট্রাক।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে স্ট্যান্ডে ট্রাক-পিকআপ ভ্যানের সংখ্যা দুই শতাধিক। এতে চার লেনের সড়কটি মাত্র এক লেনে পরিণত হয়েছে। সকালের দিক কম থাকলেও সন্ধ্যার পরই এই সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

গাড়িপ্রতি ৬০০ টাকা চাঁদা আদায়

কালশীর এই সড়কের পাশে বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক ও মিনি ট্রাকচালক ইউনিয়নের একটি কার্যালয়। এই ইউনিয়নের একটি কমিটির লোকজন ট্রাকস্ট্যান্ডটি পরিচালনা করে। তারা প্রতিটি গাড়ির জন্য মাসে ৬০০ টাকা করে চাঁদা নেয়। মাসে প্রায় ২ লাখ টাকার ওপর চাঁদা তোলা হয়। কমিটির লোকজনের দাবি, সিকিউরিটি গার্ড ও অনান্য খাতে খরচ আছে। সেজন্য ট্রাক মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয়।

দফায় দফায় বৈঠক, সমাধান নেই

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাকচালক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ও ট্রাক মালিকদের দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। বিকল্প জায়গায় ট্রাকস্ট্যান্ড স্থানান্তরের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বৈঠকের পর বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

ট্রাকস্ট্যান্ড পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি মনসুর আলী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কর্তৃপক্ষ আমাদের সরিয়ে নিয়ে কালশী বালুর মাঠে নেয়ার কথা বলেছিল। আমরা কিছুদিন সেখানে গাড়ি রাখাও শুরু করি। পরে সেখান থেকে আবারও সরিয়ে এখানে (কালশী সড়কে) গাড়ি রাখতে বলে। এরপর থেকে এখানেই আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডিএমপি, সিটি করপোরেশন সবার সঙ্গেই আমাদের বৈঠক হয়েছে। তারা বলেছে, আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা করে দিবে। তারপর আর কোন খোঁজ নেই। নতুন ব্যবস্থা না করে দেওয়া পর্যন্ত তো আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই।‘

ট্রাকস্ট্যান্ডের জন্য ভোগান্তিতে পথচারী ও শিক্ষার্থীরা

এই সড়কের পাশেই কালশী ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়। ট্রাকস্ট্যান্ডের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহায় শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। বিশেষ করে ছাত্রীদের এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সমস্যা বেশি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়কের পাশে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় পথচারীদের চলাচলের জায়গা কমে গেছে। কোথাও ফুটপাত দখল করে বসেছে দোকান। আবার কোথাও ট্রাক মেরামতের যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন সামগ্রী রাখা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাকস্ট্যান্ডই শুধু সমস্যা না, সমস্যা আরও আছে। এখানে বসে কেউ কেউ মাদক সেবন করে। সন্ধ্যা নামলে গাঁজার গন্ধে এখানে টেকা যায় না। এই সড়ক দিয়ে মেয়েরা চলাচল করতেও ভয় পায়। ’

বাউনিয়া বাঁধ এলাকার বাসিন্দা লিপি আক্তার বলেন, ‘ এত বড় একটা রাস্তা। কিন্তু চলার মতো জায়গা নাই। না ফুটপাতে চলতে পারি, না রাস্তায়। সব সময় গাড়ির জটলা লেগেই থাকে।’

ময়লার এসটিএস বাড়াচ্ছে সংকট

কালশীর এই নতুন সড়কের মুখেই রয়েছে ডিএনসিসির ময়লার এসটিএস। এর পেছনেই গড়ে উঠেছে এই ট্রাকস্ট্যান্ড। স্থানীয়দের মতে, এলাকাটিতে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ এই এসটিএস । এছাড়া এই এসটিএসের কারণে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ডিএনসিসির একটি গণশৌচাগার।

স্থানীয়দের মতে, ট্রাকস্ট্যান্ড সরানোর পাশাপাশি এই এসটিএস নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। তা না হলে সড়কে দখল আরও বাড়বে এবং ময়লা-আবর্জনায় ভরে যাবে।

ডিএনসিসির বক্তব্য

কালশীর সড়কের অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা দুই দফা এটি নিয়ে বসেছি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি সমাধানে আসতে পারবো। ইতোমধ্যে সম্পত্তি বিভাগ ও আঞ্চলিক অফিসকে এই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’

/বিবি/