শিরোনাম

‘লালনসম্রাজ্ঞী’ ফরিদা পারভীন শূন্যতার এক বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
‘লালনসম্রাজ্ঞী’ ফরিদা পারভীন শূন্যতার এক বছর
লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন

‘সত্য বল সুপথে চল, ‘জাত গেলো জাত গেলো’, কিংবা ‘মিলন হবে কত দিনে’-লালন সাঁইয়ের এসব গান শুনলেই যার কণ্ঠটি সংগীতপ্রেমীদের কানে বাজে তিনি কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন। তার কণ্ঠে লালনের গান কেবল সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে দর্শন, আত্মঅন্বেষণ এবং মানুষের অন্তর্লোককে আবিষ্কারের এক গভীর মাধ্যম।

২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা লোকসংগীতের এই কিংবদন্তী শিল্পী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭১ বছর।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় দোল পূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে গুরু মোকছেদ আলীর অনুরোধে প্রথম লালনের গান গাওয়ার সুযোগ পান ফরিদা পারভীন। গানটি ছিল ‘সত্য বল সুপথে চল’। শুরুতে খুব একটা আগ্রহী না হলেও গানটি গাওয়ার পর তার ভেতরে তৈরি হয় এক গভীর অনুরণন। পরবর্তী সময়ে ফরিদা পারভীন নিজেই বলেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা তাকে অস্থির করে তুলেছিলো; তার মনে হয়েছিল, এই গান তাকে আরও শিখতে হবে এবং গাইতে হবে। এরপর থেকেই লালন হয়ে ওঠেন তার শিল্পীজীবনের অন্যতম প্রধান আশ্রয়।

ফরিদা পারভীনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এখানেই তিনি লালনের গানকে শুধু পরিবেশনই করেননি, নিজের কণ্ঠ ও গায়কীর মাধ্যমে সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘জাত গেলো জাত গেলো’, ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’ এসব গান তার কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছে।

তার কণ্ঠে ছিলো শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর সাধনা, বাংলার লোকগানের সহজ-সরল মাটির টান এবং লালনের মানবতাবাদী দর্শনের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তাই তার গান কেবল শ্রুতিমধুর সুরের অভিজ্ঞতা নয়; বরং প্রতিটি পরিবেশনা যেন শ্রোতাকে নিজের অন্তর্লোকের দিকে ফিরে তাকানোর আহ্বান জানায়। গানের কথামালা ও সুরের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের ভেতরের সত্য, আত্মপরিচয় ও মানবিক বোধকে স্পর্শ করতেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার অবদানও তাই শুধুমাত্র একজন সফল গায়িকার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তার অনন্য পরিবেশনার মাধ্যমে লালনের দর্শন ও গান দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সংগীতের বৈশ্বিক পরিচিতি।

শ্রোতাদের ভালোবাসায় ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন ফরিদা পারভীন। তবে কোনো উপাধিই তার কাছে গানের চেয়ে বড় ছিল না । লালনের গান ছিল তার শিল্পীসত্তার গভীরে প্রোথিত এক অনুভব, নিজের ভেতরের জগতের সঙ্গে একান্ত আলাপ। ফলে তার কণ্ঠে লালনের দর্শন কখনো শুধু মঞ্চে পরিবেশিত কোনো গান হয়ে থাকেনি; তা ছুঁয়ে গেছে শ্রোতার মন ও আত্মাকে।

ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ‘অচিন পাখি’ যেন মানুষের দেহরূপী খাঁচার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য সত্তার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠতো। একইভাবে ‘আরশিনগর’ হয়ে উঠেছিল আত্মঅনুসন্ধানের প্রতিচ্ছবি-নিজের ভেতরের সেই ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে মানুষের চিরন্তন যাত্রার এক অনন্য প্রকাশ।

দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সংগীতজীবনে ফরিদা পারভীনের অর্জনের তালিকাও ছিল বেশ বিস্তৃত। ১৯৮৭ সালে তিনি দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন। চলচ্চিত্রের গানেও রেখেছেন নিজের স্বাক্ষর। ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রের জন্য অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর সম্মান। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার কণ্ঠে বাংলাদেশের লোকসংগীত ও লালনের দর্শন পরিচিতি পেয়েছে।

তবু সব অর্জনকে ছাপিয়ে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। একাধিক প্রজন্ম তার গান শুনে বেড়ে উঠেছে। সময় বদলেছে, শ্রোতার রুচি বদলেছে, কিন্তু ফরিদা পারভীনের গান হারিয়ে যায়নি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তার গান পৌঁছে দিয়েছে লালনের ভাবনা ও দর্শনকে নতুন করে।

পেরিয়ে গেছে একটি বছর। ফরিদা পারভীন আজ আর নেই, কিন্তু তার কণ্ঠের গান এখনো অমলিন। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ কিংবা ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ শুনলে মনে হয়, কণ্ঠটি যেন এখনো কোথাও থেকে ভেসে আসছে। একজন শিল্পী শারীরিকভাবে চলে গেলেও তার সৃষ্টিই তাকে বাঁচিয়ে রাখে-প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

ফরিদা পারভীনও পাড়ি জমিয়েছেন অচিন দেশের পথে। তবে তার গান, তার কণ্ঠ আর লালনের দর্শনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনন্য সাধনা তাকে আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জীবন্ত করে রেখেছে।

/এসবি/