শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কি সত্যিই ১৪ দিনের তেল মজুত আছে

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কি সত্যিই ১৪ দিনের তেল মজুত আছে
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফ্রিপোর্টে অবস্থিত স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ কেন্দ্র। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে একধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দাবি ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নাকি মাত্র ১৪ দিনের তেল মজুত রয়েছে। তবে দাবিটি পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

১৪ দিনের হিসাব

মূলত মার্কিন কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর)-এর বর্তমান পরিমাণকে দেশটির দৈনিক তেল ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করে হিসাবটি দাঁড় করানো হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে দেশটির এসপিআর মজুত কমে দাঁড়ায় প্রায় ২৮৫ মিলিয়ন ব্যারেলে। এ সংখ্যাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিনের প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি ব্যবহারের সঙ্গে ভাগ করলেই ১৪ দিন হিসাবটি আসে।

কিন্তু এখানেই ভুলটি লুকিয়ে আছে। এসপিআরের সম্পূর্ণ তেল একসঙ্গে দেশের প্রতিদিনের সাধারণ চাহিদার জন্য তুলে রাখার কথা নয়। এটি মূলত বড় কোনো সরবরাহ সংকট সামাল দেওয়ার জন্য সরকারের তৈরি করা একটি বিশেষ জরুরি বাফার বা তহবিল। তাই একে দৈনন্দিন মোট ব্যবহারের সঙ্গে ভাগ করে ফেলাটা বাস্তব পরিস্থিতিকে ফুটিয়ে তোলে না।

এসপিআর

সত্তরের দশকে তেলের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ কৌশলগত মজুত গড়ে তোলে। টেক্সাস ও লুইজিয়ানার বিশাল ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারে জমা রাখা হয় এ অপরিশোধিত তেল।

মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, এসপিআর থেকে সর্বোচ্চ দৈনিক প্রায় ৪৪ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া সম্ভব। তবে প্রেসিডেন্টের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর সেই তেল বাজারে পৌঁছাতে প্রায় ১৩ দিন সময় লাগে। এই মজুত দিয়ে দেশের প্রতিদিনের পুরো জ্বালানি চাহিদা দীর্ঘদিন মেটানো সরকারের লক্ষ্য নয়। বরং বৈশ্বিক সরবরাহ লাইনে কোনো বড় বিপর্যয় দেখা দিলে সাময়িক ঘাটতি পূরণ করাই এর আসল কাজ।

জ্বালানি বাজারের বাস্তব ঝুঁকি কোথায়

‘১৪ দিনে তেল ফুরিয়ে যাওয়ার’ দাবিটি ভুল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পরিস্থিতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত তা বলা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতায় বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। এর ওপর সৌদি আরবের প্রধান ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সংকট সামাল দিতে গিয়েই মার্কিন এসপিআর উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকেই দফায় দফায় এ মজুত থেকে তেল ছাড়া হয়েছে।

এমনকি ২০২৬ সালেও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রায় ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এসপিআর থেকে ছাড়ার পরিকল্পনা নেয় মার্কিন প্রশাসন। টানা প্রায় ১২০ দিন ধরে এ কর্মসূচি চলার কারণে জরুরি মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র কি কেবল এসপিআরের ওপর নির্ভরশীল

পুরো বিতর্কের আরেকটি বড় দিক হলো, হিসাবটি করার সময় মার্কিন নিজস্ব তেল উৎপাদন এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক মজুতকে পুরোপুরি হিসাবে ধরা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদক দেশ। তাছাড়া দেশটির বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক গুদামগুলোতেও বিশাল পরিমাণে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি মজুত থাকে, যা এসপিআরের অংশ নয়। ফলে এসপিআর কমে যাওয়ার অর্থ এটা নয় যে আমেরিকার জ্বালানি সরবরাহ একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তেল ফুরিয়ে যাওয়ার দাবিটি সত্য নয়। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কৌশলগত মজুত আগের চেয়ে অনেক কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি কোনো বৈশ্বিক সংকট তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল-নিরাপত্তার সক্ষমতা আগের তুলনায় বেশি চাপে পড়তে পারে।

সূত্র: গালফ নিউজ

/এমএকে/