শিরোনাম

নৈতিক বিকাশে ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন বই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নৈতিক বিকাশে ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন বই
বই হাতে শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধ, সংস্কৃতিচর্চা, জীবনদক্ষতা ও আনন্দময় শিক্ষার বিকাশ ঘটাতে আগামী বছর থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪টি নতুন বই চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। এসব বিষয়ে পরীক্ষা হবে, মূল্যায়নও হবে, তবে বার্ষিক ফলাফল বা জিপিএতে কোনো নম্বর যোগ হবে না। পরবর্তী শ্রেণিতে উঠতে হলে শিক্ষার্থীদের এসব বিষয়ে পাস করতে হবে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। চতুর্থ শ্রেণিতে সংস্কৃতি ও খেলাধুলাবিষয়ক দুটি বই যুক্ত হবে। আর ষষ্ঠ শ্রেণিতে চালু হবে কর্মমুখী শিক্ষার ধারণাভিত্তিক একটি বই এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষাবিষয়ক আরেকটি বই।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন বইগুলোর বিষয়বস্তু, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে এরইমধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গুরুত্ব পাচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ

এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বই যুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ, সামাজিক আচরণ, সংস্কৃতিচর্চা এবং বাস্তবজীবনমুখী দক্ষতা বাড়ানো। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের ঘাটতির বিষয়টি বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে শেখার পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

নতুন শিক্ষাক্রমে সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক আচরণের মতো বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এ জন্য আলাদা কোনো ‘নৈতিক শিক্ষা’ নামে কোনো বই থাকছে না। সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আনন্দময় শিক্ষা এবং অন্যান্য বিষয়ের পাঠ্যবস্তুর মধ্য দিয়েই এসব মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

এনসিসির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা ও নম্বরকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফল করলেও মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ ও জীবনদক্ষতার বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। নতুন বইগুলো সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করবে।

নতুন ৪টি বইয়ে যা থাকছে

চতুর্থ শ্রেণির সংস্কৃতিবিষয়ক বইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, সামাজিক রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরা হবে। এর লক্ষ্য শিশুদের নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পরিচিত করা এবং সংস্কৃতিচর্চায় আগ্রহী করে তোলা।

একই শ্রেণির খেলাধুলাবিষয়ক বইয়ে শারীরিক সুস্থতা, শরীরচর্চা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব, ক্রীড়া-নৈতিকতা এবং মানসিক বিকাশের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুস্থ জীবনযাপনের পাশাপাশি নেতৃত্ব ও সহমর্মিতার মতো গুণাবলি বিকাশের বিষয়ও এতে থাকবে।

ষষ্ঠ শ্রেণির কর্মমুখী শিক্ষাবিষয়ক বইটি শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই দক্ষতা ও কাজভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করবে।

সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সংযোজন হচ্ছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’। বইটিতে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা, সৃজনশীল কার্যক্রম, দলগত কাজ, ব্যবহারিক বিজ্ঞানচর্চা এবং বাস্তবজীবনের সঙ্গে সংযুক্ত শিক্ষণ পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। লক্ষ্য হবে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শেখার আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করা।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, নতুন বইগুলোর লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ, সংস্কৃতিচর্চা ও জীবনঘনিষ্ঠ দক্ষতার বিকাশে সহায়তা করা।

নম্বর যোগ হবে না, তবু পাস করতে হবে

নতুন ৪টি বইয়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এর মূল্যায়ন পদ্ধতি। এসব বিষয়ে পরীক্ষা বা মূল্যায়ন হবে, কিন্তু প্রাপ্ত নম্বর চূড়ান্ত ফলাফল বা জিপিএতে যোগ হবে না। তবে বিষয়গুলোকে গুরুত্বহীন মনে করার সুযোগও থাকবে না। কারণ পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে হলে শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত মান অর্জন করে পাস করতে হবে।

বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ

নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে শিক্ষক প্রস্তুতিকে। কারণ সংস্কৃতি, খেলাধুলা, কর্মমুখী শিক্ষা কিংবা আনন্দময় শিক্ষার মতো বিষয় শুধু বই পড়ে শেখানো সম্ভব নয়। এসব বিষয়ের জন্য প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক পাঠদান।

এ কারণে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি চলছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, নতুন বইয়ের শিক্ষাক্রম, সিলেবাস ও পাঠ্যবস্তু তৈরির কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে বইগুলো পৌঁছাবে।

এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, নতুন বইগুলোর উদ্দেশ্য নম্বরের প্রতিযোগিতা বাড়ানো নয়। বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তবজীবনমুখী দক্ষতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক আচরণ গড়ে তোলা। মূল্যায়ন থাকবে, তবে তা হবে শেখার অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য, অতিরিক্ত ফলাফলের চাপ তৈরির জন্য নয়।

/এফসি/