শিরোনাম

কর ও ফিডের জালে পোল্ট্রি শিল্প

কর ও ফিডের জালে পোল্ট্রি শিল্প

একদিকে করের বোঝা, অন্যদিকে পশুখাদ্যের আকাশচুম্বী দাম- দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দেশের উদীয়মান পোল্ট্রি শিল্প এখন খাদের কিনারে। খামারিদের কান্না আর শূন্য প্রান্তিক খামারিদের খাঁচাগুলো জানান দিচ্ছে, দেশের পোল্ট্রি খাত আজ কতটা বিপর্যস্ত।

খামারি জানিয়েছেন, পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের এই পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে চলতি বছরে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৃণমূল খামারে। এরমধ্যে চলমান জ্বালানি সংকটে পরিবহন ভাড়া ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অঙ্ক না মেলায় খামার বন্ধ করে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার খামারি।

চলতি বাজেটে এক লাফে কর্পোরেট কর ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধিসহ সব ধরনের কর ও শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় এবং দফায় দফায় পোল্ট্রির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সবমিলিয়ে বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের উদীয়মান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প। যার পরিণতিতে আগামী প্রজন্ম পড়তে যাচ্ছে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে।

আসন্ন বাজেটে পোল্ট্রির শিল্পের ওপর করের বোঝা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন খাত বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, পোল্ট্রির এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো বাজেটে পোল্ট্রি খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কর অব্যাহতি সুবিধা রাখা। আয়কর, আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়করে (এআইটি) সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহায়ক বাজেট ব্যবস্থাপনা এখন জরুরি। তারা জানান, বাজেটে ভালো ব্যবস্থাপনা না থাকলে সাধারণ মানুষের সহজলভ্য প্রোটিনের সবচেয়ে বড় উৎস পোল্ট্রি শিল্প খাদের কিনারে গিয়ে পড়বে। বড় বড় করপোরেট কোম্পানির অধীনে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কিনতে হতে পারে দ্বিগুণ দামে ডিম, মুরগি।

খামারিরা জানান, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হয় সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে অনেক সময় সেটি সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, যেখানে পাইকারি দাম থাকে ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকা। এই অবস্থায় উৎপাদন খরচ কমানো ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা।

খরচের পাহাড়, আয়ের শূন্য ঝুলি

গত পাঁচ বছরে এই শিল্পে উৎপাদন খরচ বেড়েছে অবিশ্বাস্য গতিতে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ সালকে ভিত্তি ধরলে ২০২৪ সালে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৭০ শতাংশ। চলতি ২০২৫ সালে এই ব্যয় ১৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিপরীতে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের হিসাব না মেলায় প্রতিদিন দেশজুড়ে শত শত প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাচ্ছে।

করের খাঁড়ায় বন্দি উদ্যোক্তারা

চলতি বাজেটে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বর্ধিত অগ্রিম আয়কর ও টার্নওভার কর। অথচ ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশগুলো হাঁটছে ভিন্ন পথে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যেখানে ১০ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি দিয়ে পোল্ট্রি শিল্পকে উৎসাহিত করছে, সেখানে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর ফিডের ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম কর বহাল রেখেছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব ও তরুণ উদ্যোক্তা মো. সাফির রহমান বলেন, বাজেটে পোল্ট্রি শিল্পে বিশেষ সুবিধা না দিলে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। পাশাপাশি যারা এ শিল্পের সাথে যুক্ত আছেন তারা বিকল্প খাতে চলে যাবেন। সব মিলিয়ে গভীর সঙ্কটে পরে যাবে সম্ভাবনাময় খাতটি। লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পরবেন।

তিনি আরও বলেন, পোল্ট্রি শিল্পকে শুধুমাত্র একটি ব্যবসা হিসেবে না দেখে একে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার স্তম্ভ হিসেবে দেখা উচিত। আগামী বাজেটে করের বোঝা না কমলে ডিম-মুরগি শুধু বড়লোকের খাবারে পরিণত হবে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কাম্য নয়।

খামারিদের আর্তনাদ

মাঠে চিত্রে দেখা যায়, একটি ডিম উৎপাদনে খরচ যেখানে সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা, পাইকারি বাজারে খামারিদের তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৮ টাকায়। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগিতেও একই চিত্র- উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারমূল্য প্রায়ই কম থাকছে। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার মুন্সিরতাল্লুকের খামারি মো. জয়নাল হাওলাদার বলেন, মুরগি ও ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। দফায় দফায় পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বাড়লেও আমাদের দেখার কেউ নেই। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পথে বসা ছাড়া আর উপায় নেই।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে প্রান্তিক খামারিদের নিয়ে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে খামারিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

খামারিদের দাবি, বর্তমানে তারা প্রতি ডিম সাড়ে ৬ টাকা থেকে সাড়ে ৭ টাকায় বিক্রি করছেন, অথচ উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ১০ থেকে ১১ টাকা। এতে প্রতি ডিমে আড়াই থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রান্তিক খামারি বাবু জানান, ব্যাংকের ঋণ নিয়ে খামার করেছি। এখন লোকসান দিতে দিতে ঋণের কিস্তি দিতে পারছি না। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমাদের পথে বসতে হবে।

বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ-কর অব্যাহতি দাবি

আসন্ন বাজেটে পোল্ট্রির শিল্পের ওপর করের বোঝা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পোল্ট্রি খাতের এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় বাজেটে পোল্ট্রি খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কর অব্যাহতি সুবিধা রাখা। আয়কর, আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়করে (এআইটি) সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহায়ক বাজেট ব্যবস্থাপনা এখন জরুরি।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বাজেটে এক লাফে করপোরেট কর ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধিসহ সব ধরনের কর ও শুল্ক বেড়েছে। এতে দফায় দফায় পোল্ট্রির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সার্বিক দিক দিয়ে বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম এ শিল্প।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী জানান, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কর অব্যাহতি দিয়ে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দিয়ে থাকে। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমরা উল্টোটা করছি। যে কারণে বর্তমানের কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসা জরুরি। তাছাড়া প্রান্তিক খামারিদের আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

সিন্ডিকেটের শঙ্কা ও বিশেষজ্ঞ মত

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এভাবে ছোট ও মাঝারি খামারিরা ধ্বংস হয়ে গেলে পুরো বাজার চলে যাবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় করপোরেট কোম্পানির কব্জায়। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক খামারিরা টিকে না থাকলে ভবিষ্যতে করপোরেটদের বেঁধে দেওয়া দ্বিগুণ দামেই ভোক্তাদের ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল মনে করেন, পোল্ট্রি বাঁচাতে হলে ফিডের উপকরণের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে। কারণ, উৎপাদন খরচের ৮০ শতাংশই হয় খাদ্যের পেছনে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্প বাঁচাতে চাইলে প্রথমে খাদ্যের দাম কমাতে হবে। কম দামে খামারিদের খাদ্য দিতে হলে খাদ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আয়কর ও শুল্ক কমাতে হবে।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে আছে এই পোল্ট্রি খাতের ওপর। নতুন উদ্যোক্তারা এখন এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আসন্ন বাজেটে যদি করের বোঝা কমিয়ে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া না হয়, তবে সস্তার প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ডিম ও মুরগি কেবল ‘ধনী মানুষের’ খাবারে পরিণত হবে। ধ্বংসের হাত থেকে এই শিল্পকে বাঁচাতে এখনই সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ জরুরি।

/এমএস/