শিরোনাম

মধ্যবিত্তের ঈদ এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলার দিন

মধ্যবিত্তের ঈদ এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলার দিন
রাজধানীর ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

এক দিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। বিগত বছরগুলোতে এই ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে সারাদেশ। কিন্তু এবার সেই উচ্ছ্বাস-আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ, জিডিপির নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতি অনেকটা স্থবির। এরই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ঈদুল আজহার বাজারে। নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম ও আয় কমে যাওয়ায় এবার নগরের বিপুলসংখ্যক মানুষ কোরবানি দিতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাজধাসীর বিভিন্ন কোরবানির পশুর হাট ও বিপণিবিতান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিবছর এই সময়ে কোরবানির পশুর হাট এবং ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে চাঙা থাকে, এবার সেখানে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। হাটে পশুর অভাব না থাকলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের পকেট খালি।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এপ্রিলে এসে বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে ঈদের অন্যান্য কেনাকাটা অনেক কমে গেছে। উৎসবের আনন্দকে গ্রাস করেছে পকেটের টান আর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা। সব মিলিয়ে এবারের ঈদ ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে নেই তেমন কোনো আনন্দ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এবারের গরুর বাজার ভালো যাবে বলে মনে হয় না। যারা একাধিক গরু কোরবানি দিতেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ দেশে বা দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন। বাজারে অন্য প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ বিলাসী পণ্য কেনাকাটায় যাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে করোনা মহামারির পর থেকেই আমাদের অর্থনীতি আর ঘুরে দাড়াতে পারেনি। এর সঙ্গে এবারে যুক্ত হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, মূল্যস্ফীতি আর জ্বালানি সংকট। বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতা নেই বললেই চলে। বিক্রেতারা অনেকটাই বিপাকে রয়েছেন।’

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। অর্থাৎ নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

গত এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি সাধারণ চাকরিজীবী বা দিনমজুরদের বেতন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। অর্থাৎ নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত অর্থে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিয়েল ইনকাম’-সেটি নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে।

অর্থনীতির এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কারণ তাদের আয়ের অধিকাংশ অংশ ব্যয় হয় খাদ্যপণ্যে। বেসরকারি খাতের একটি বড় অংশে বেতন বাড়ানোতো দূরের কথা, নিয়মিত বেতন পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করছেন তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায়। মাছ-মাংস পাত থেকে বাদ পড়েছে আগেই, এখন আলু-ডাল কিনতেও হিসাব মেলাতে হিমশিম হচ্ছে । সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া শেষ, এখন অনেক পরিবারই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।

আয়-ব্যয়ের ব্যবধানে পিষ্ট মধ্যবিত্ত

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বেসরকারি খাত কিংবা সাধারণ শ্রমজীবীদের আয় বাড়েনি।

অনেকেই বলছেন, বাসা ভাড়া, ইউটিলিটি বিল আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানোর পর হাতে বাড়তি কোনো টাকা থাকছে না। যেখানে তিন বেলা ঠিকমতো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে ঈদের নতুন পোশাক বা উৎসবের কেনাকাটা এখন অনেকের কাছেই এক প্রকার বিলাসিতা।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে জুনিয়র কর্মকর্তা জহিরুল ইসরাম বলেন, ‘গত বছরও একটা গরুতে তিন ভাগে শরিক হয়েছিলাম। এবার শরিকদের প্রত্যেকেই বলছেন- বাজেট বাড়াতে। কারণ ১ লাখ টাকার নিচে কোনো গরুই নেই। কিন্তু আমার পক্ষে তো বেতন বাড়ানো সম্ভব না। তিনি বলেন, সৎভাবে চাকরি করে এই বাজারে কোরবানি দেওয়া এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে বলতেও পারছি না যে এবার কোরবানি দিতে পারছি না।’

রাজধানীর কমলাপুর জসীমউদ্দিন রোডের মালঞ্চ শিশু শিক্ষালয়ের এক শিক্ষিকা বলেন, ‘এবার ঈদ উপলক্ষে একটা ফ্রিজ কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নিত্যপণ্যের খরচ সামাল দিতে গিয়ে এবার কোরবানি দেওয়াই সম্ভব হবে না, তাই ফ্রিজ কেনা আর হচ্ছে না।’

ওই শিক্ষিকা বলেন, ‘মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো-আমরা গরিবদের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ওএমএসের চাল কিনতে পারি না, আবার ধনীদের মতো বাজারে গিয়ে দাম না দরে কেনাকাটাও করতে পারি না। ঈদের বোনাস যা পেয়েছি, তা দিয়ে এক মাসের বাজারের খরচই উঠছে না। কাঁচাবাজারে মসলার যে দাম, মনে হচ্ছে মাংস কেনার আগেই মসলা কিনতেই পকেট খালি হয়ে যাবে। সন্তানদের আবদার থাকে ঈদে কোরবানি হবে, আনন্দ হবে। কিন্তু এবার হয়তো তাদের বোঝাতে হবে যে, পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। মধ্যবিত্তের ঈদ এখন শুধু মুখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলার দিন।’

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ এখন আর কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বর্তমানে একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে রূপ নিয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রতি বছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এই বাজারে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার লেনদেন হয়। তাই দেশের অর্থনীতিতে কোরবানি বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে।

উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার কোরবানির পশুর হাট। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার গবাদি পশুর দাম যেমন চড়া, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মসলাসহ অন্যান্য পণ্যের দাম। ফলে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, ঈদের দিন পরিবার নিয়ে দুমুঠো ভালো খাবার খাওয়া নিয়েই শঙ্কায় আছেন অনেকে। খাদ্যদ্রব্য, গোখাদ্য, পরিবহন ও চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধির কারণে এবার পশুর দাম গত বছরের তুলনায় ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও হাট সংশ্লিষ্টরা। কয়েকটি হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার ছোট আকারের একটি গরুর দামও হাঁকা হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ওপরে। এর চেয়ে কম দামে কোনো গরু মিলছে না।

ঈদ বাজারে মন্দা: বিপাকে ব্যবসায়ীরা

কোরবানির ঈদে দেশের পোশাক, প্রসাধনী ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবসায়ীরা সারা বছরের লাভের বড় একটি অংশ তুলে নেন। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ হতাশার। শেষ প্রান্তে এসেও রাজধানীর বড় বড় বিপণিবিতানগুলো থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজারে কাপড়ের দাম বেশি হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু ক্রেতাদের পকেটে টাকা না থাকায় তারা বাজারে আসছেন কম। আর এলেও দেখেশুনে খালি হাতেই অনেকে ফিরে যাচ্ছেন। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেচাকেনা গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বা তারও নিচে নেমে এসেছে। অনেক ব্যবসায়ী কর্মচারীদের বেতন ও দোকানের ভাড়া দিতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করছেন।

অর্থনীতির সামগ্রিক চাপ ও শঙ্কা

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলার সংকট, আমদানি সংকোচন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারকির অভাবে অর্থনীতিতে মন্দা ভাব বিরাজ করছে। মজুরি না বাড়ার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আর মানুষ যখন কেনাকাটা কমিয়ে দেয়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সার্বিক জিডিপি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, উৎসবের অর্থনীতি তখনই চাঙা হয়, যখন মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে। এবারের ঈদে মধ্যবিত্তের পকেটে সেই উদ্বৃত্ত টাকা নেই। ফলে বাজার চাঙা হওয়ার কোনো সুযোগই তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কম। মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এক কথায় মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগ স্থিমিত হওয়ার চাপ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার চাপ- সব মিলিয়ে বাজারে চাহিদার একধরনের সংকোচন দেখা যাচ্ছে। তাই এবারের ঈদ উৎসবআর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসতে পারছে না। চারদিকের অর্থনৈতিক টানাটানি আর বাজারের ঊর্ধ্বগতি যেন সাধারণ মানুষের ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।

/বিবি/