গ্যাসের সংকটে কমে গেছে আয়, অটোরিকশা চালকেরা বিপাকে

গ্যাসের সংকটে কমে গেছে আয়, অটোরিকশা চালকেরা বিপাকে
মেহেদী হাছান মাহীম

ঘড়িতে রাত তখন ১টা। ব্যস্ত ঢাকা যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনও জেগে আছেন মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে শুধু মুখভর্তি ক্লান্তির ছাপ। অটোরিকশার গ্যাস নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে করতে তারা অনেকটা বিরক্তও।
এই কষ্ট, এই বেদনার গল্প নগরের সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের। শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন জীবিকার চাকা সচল রাখতেই তাদের শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষার পালা।
স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডের সামনে অপর কয়েকজন অটোরিকশা চালকদের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. সোলাইমান। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তিনি দীর্ঘ ২৬ থেকে ২৭ বছর ধরে ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্ত্রী রাশেদা বেগম ও সাত বছরের ছেলে মো. শিপনকে নিয়ে থাকেন খিলগাঁও এলাকার সিপাহীবাগ বাজারের পাশে। সম্প্রতি দেশে গ্যাস সংকটের কারণে আয়-রোজগারে ভাটা পড়েছে তার। সোলাইমান জানালেন, ‘গ্যাসের সমস্যার আগে সিএনজির মালিককে দৈনিক ৬০০ টেকা দেওয়ার পরেও আমি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ইনকাম করতাম। এখন ১৫ হাজার ইনকাম করতেও কষ্ট হইয়া যাইতাছে।’
আক্ষেপ করে সোলাইমান বলেন, ‘ জীবনে গ্যাসের এমন সংকট আর দেখি নাই। এভাবে যদি গ্যাস-সংকট চলতে থাকে, তাইলে ঢাকা শহরে আর থাকতে পারমু না। ইনকামের অবস্থা খারাপ, ঢাকায় থাকার কোনো উপায়ও দেখতাছি না। নিয়ত কইরা রাখছি, গ্রামে গিয়া চাষবাস কইরা পরিবার চালামু।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আয় তো বাড়তাছে না। কিন্তু, ব্যয় ঠিকই বাড়তাছে। আগে বাসা ভাড়া সাড়ে ৫ হাজার দিতাম। এখন প্রতিমাসে ৬ হাজার টেকা বাসা ভাড়া দেওন লাগে। খাওনের খরচ, নিজের খরচ, স্ত্রী আর পোলার খরচ— সবকিছু মিটাইতে আমি খুব খারাপ অবস্থার মইধ্যে আছি। আগে পরিবারের সকল খরচের পরও আমার হাতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মতো থাকতো। এখন উল্টো টুকটাক হাওলাত করা লাগে। এভাবে আর কত! সরকার কি আমাগো কষ্ট দেখে না!’
দীর্ঘ ১ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার পর গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। ৩০০ টাকার গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে তাকে মাত্র ১০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হয়েছে। সোলাইমান জানান, দৈনিক ৫০০ টাকার গ্যাস লাগে তার। কিন্তু সংকটের কারণে এখন ২০০ টাকার গ্যাসও নিতে পারেন না। এর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার ভোগান্তি তো রয়েছেই।
বুধবার দিবাগত রাত ১টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর এলাকার স্ক্যামকো সিএনজি ফিলিং স্টেশন, শাহজালাল সিএনজি লিমিটেড ও ঢাকা সিএনজি লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে সিএনজি ও প্রাইভেটকার গ্যাস নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এই তিনটি স্টেশনে মোট ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১৫টি প্রাইভেটকার ও একটি অ্যাম্বুলেন্সকে গ্যাস নিতে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

শাহজালাল সিএনজি লিমিটেডে গ্যাস নিতে আসেন অটোরিকশা চালক মো. সাগর। তিনি বলেন, ‘২ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি, এখনো গ্যাস নিতে পারিনি। কখন নিতে পারবো, তা-ও জানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল ধোলাইপাড়ের একটি পাম্প স্টেশনে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র ৮৫ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছি।’
স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের কর্মকর্তা মো. শুভ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী সিএনজি এবং প্রাইভেটকার চালকদেরকে গ্যাস দিতে পারছি। পাম্পে গ্যাসের চাপ একদমই কম। কেউ ৩০০ টাকার গ্যাসের জন্য আসলে তাকে না ফিরিয়ে দিয়ে অন্তত ১০০ টাকার গ্যাস দিচ্ছি। এভাবেই আমরা ব্যালেন্স করে সবাইকে গ্যাস দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টির মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং প্রাইভেটকার গ্যাস নিতে আমাদের এখানে আসে।’
শাহজালাল সিএনজি লিমিটেডের কেশিয়ার মো. শাকিল হোসেনও একই মন্তব্য করেন।
গ্যাস-সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রিয়াজ নামের আরেকজন অটোরিকশা চালক। তিনি বলেন, ‘ঘন্টার পর ঘন্টা গ্যাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাই না। যা পাই তাতেও বেশিক্ষণ সিএনজি চালাতে পারি না। সেজন্য আমাদেরকেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে।’
মেরিনা আক্তার নামের একজন যাত্রী বলেন, ‘আমার অফিস মতিঝিলে এবং বাসা হচ্ছে মিরপুর কালশী স্টিলের ব্রিজের পাশে। আমি বেশিরভাগ সময় সিএনজি দিয়ে কারওয়ান বাজার থেকে যাতায়াত করি। ২ মাস আগেও ভাড়া ছিল ৩৫০ টাকা করে। আর এখন সেটা বেড়ে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাড়া বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে-সে বিষয়ে আমি সিএনজি চালকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা আমাকে গ্যাসের সংকটের কারণে ভাড়া বেশি নেওয়ার কথা বলছেন।’
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে এই মুহূর্তে ভাড়ায় ১৫ হাজার ৫৯৬ টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে। গ্যাসের সংকটের কারণে চালকরা খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তারা ঠিকমতো গ্যাস পায় না, যেটা পায় সেটাও চাহিদা অনুযায়ী নয়। ইনকাম করুক বা না করুক, কিন্তু মালিককে প্রতিদিন টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গ্যাস সংকট এভাবে চলতে থাকলে চালকরা সিএনজি চালানো হয়তো বন্ধ করেও দিতে পারে।’
গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে গ্যাসের যে কার্গো রয়েছে, সেটির সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
তিনি জানান, ‘ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।’
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ঘাটতি আগেও ছিল। এখন অর্থনীতির আকার বাড়ায় জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে।’

ঘড়িতে রাত তখন ১টা। ব্যস্ত ঢাকা যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনও জেগে আছেন মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে শুধু মুখভর্তি ক্লান্তির ছাপ। অটোরিকশার গ্যাস নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে করতে তারা অনেকটা বিরক্তও।
এই কষ্ট, এই বেদনার গল্প নগরের সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের। শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন জীবিকার চাকা সচল রাখতেই তাদের শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষার পালা।
স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডের সামনে অপর কয়েকজন অটোরিকশা চালকদের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. সোলাইমান। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তিনি দীর্ঘ ২৬ থেকে ২৭ বছর ধরে ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্ত্রী রাশেদা বেগম ও সাত বছরের ছেলে মো. শিপনকে নিয়ে থাকেন খিলগাঁও এলাকার সিপাহীবাগ বাজারের পাশে। সম্প্রতি দেশে গ্যাস সংকটের কারণে আয়-রোজগারে ভাটা পড়েছে তার। সোলাইমান জানালেন, ‘গ্যাসের সমস্যার আগে সিএনজির মালিককে দৈনিক ৬০০ টেকা দেওয়ার পরেও আমি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ইনকাম করতাম। এখন ১৫ হাজার ইনকাম করতেও কষ্ট হইয়া যাইতাছে।’
আক্ষেপ করে সোলাইমান বলেন, ‘ জীবনে গ্যাসের এমন সংকট আর দেখি নাই। এভাবে যদি গ্যাস-সংকট চলতে থাকে, তাইলে ঢাকা শহরে আর থাকতে পারমু না। ইনকামের অবস্থা খারাপ, ঢাকায় থাকার কোনো উপায়ও দেখতাছি না। নিয়ত কইরা রাখছি, গ্রামে গিয়া চাষবাস কইরা পরিবার চালামু।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আয় তো বাড়তাছে না। কিন্তু, ব্যয় ঠিকই বাড়তাছে। আগে বাসা ভাড়া সাড়ে ৫ হাজার দিতাম। এখন প্রতিমাসে ৬ হাজার টেকা বাসা ভাড়া দেওন লাগে। খাওনের খরচ, নিজের খরচ, স্ত্রী আর পোলার খরচ— সবকিছু মিটাইতে আমি খুব খারাপ অবস্থার মইধ্যে আছি। আগে পরিবারের সকল খরচের পরও আমার হাতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মতো থাকতো। এখন উল্টো টুকটাক হাওলাত করা লাগে। এভাবে আর কত! সরকার কি আমাগো কষ্ট দেখে না!’
দীর্ঘ ১ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার পর গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। ৩০০ টাকার গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে তাকে মাত্র ১০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হয়েছে। সোলাইমান জানান, দৈনিক ৫০০ টাকার গ্যাস লাগে তার। কিন্তু সংকটের কারণে এখন ২০০ টাকার গ্যাসও নিতে পারেন না। এর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার ভোগান্তি তো রয়েছেই।
বুধবার দিবাগত রাত ১টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর এলাকার স্ক্যামকো সিএনজি ফিলিং স্টেশন, শাহজালাল সিএনজি লিমিটেড ও ঢাকা সিএনজি লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে সিএনজি ও প্রাইভেটকার গ্যাস নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এই তিনটি স্টেশনে মোট ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১৫টি প্রাইভেটকার ও একটি অ্যাম্বুলেন্সকে গ্যাস নিতে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

শাহজালাল সিএনজি লিমিটেডে গ্যাস নিতে আসেন অটোরিকশা চালক মো. সাগর। তিনি বলেন, ‘২ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি, এখনো গ্যাস নিতে পারিনি। কখন নিতে পারবো, তা-ও জানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল ধোলাইপাড়ের একটি পাম্প স্টেশনে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র ৮৫ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছি।’
স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের কর্মকর্তা মো. শুভ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী সিএনজি এবং প্রাইভেটকার চালকদেরকে গ্যাস দিতে পারছি। পাম্পে গ্যাসের চাপ একদমই কম। কেউ ৩০০ টাকার গ্যাসের জন্য আসলে তাকে না ফিরিয়ে দিয়ে অন্তত ১০০ টাকার গ্যাস দিচ্ছি। এভাবেই আমরা ব্যালেন্স করে সবাইকে গ্যাস দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টির মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং প্রাইভেটকার গ্যাস নিতে আমাদের এখানে আসে।’
শাহজালাল সিএনজি লিমিটেডের কেশিয়ার মো. শাকিল হোসেনও একই মন্তব্য করেন।
গ্যাস-সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রিয়াজ নামের আরেকজন অটোরিকশা চালক। তিনি বলেন, ‘ঘন্টার পর ঘন্টা গ্যাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাই না। যা পাই তাতেও বেশিক্ষণ সিএনজি চালাতে পারি না। সেজন্য আমাদেরকেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে।’
মেরিনা আক্তার নামের একজন যাত্রী বলেন, ‘আমার অফিস মতিঝিলে এবং বাসা হচ্ছে মিরপুর কালশী স্টিলের ব্রিজের পাশে। আমি বেশিরভাগ সময় সিএনজি দিয়ে কারওয়ান বাজার থেকে যাতায়াত করি। ২ মাস আগেও ভাড়া ছিল ৩৫০ টাকা করে। আর এখন সেটা বেড়ে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাড়া বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে-সে বিষয়ে আমি সিএনজি চালকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা আমাকে গ্যাসের সংকটের কারণে ভাড়া বেশি নেওয়ার কথা বলছেন।’
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে এই মুহূর্তে ভাড়ায় ১৫ হাজার ৫৯৬ টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে। গ্যাসের সংকটের কারণে চালকরা খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তারা ঠিকমতো গ্যাস পায় না, যেটা পায় সেটাও চাহিদা অনুযায়ী নয়। ইনকাম করুক বা না করুক, কিন্তু মালিককে প্রতিদিন টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গ্যাস সংকট এভাবে চলতে থাকলে চালকরা সিএনজি চালানো হয়তো বন্ধ করেও দিতে পারে।’
গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে গ্যাসের যে কার্গো রয়েছে, সেটির সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
তিনি জানান, ‘ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।’
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ঘাটতি আগেও ছিল। এখন অর্থনীতির আকার বাড়ায় জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে।’

গ্যাসের সংকটে কমে গেছে আয়, অটোরিকশা চালকেরা বিপাকে
মেহেদী হাছান মাহীম

ঘড়িতে রাত তখন ১টা। ব্যস্ত ঢাকা যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। রাজধানীর অধিকাংশ মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনও জেগে আছেন মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষ। তাদের চোখে ঘুম নেই, আছে শুধু মুখভর্তি ক্লান্তির ছাপ। অটোরিকশার গ্যাস নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে করতে তারা অনেকটা বিরক্তও।
এই কষ্ট, এই বেদনার গল্প নগরের সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের। শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন জীবিকার চাকা সচল রাখতেই তাদের শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষার পালা।
স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশন লিমিটেডের সামনে অপর কয়েকজন অটোরিকশা চালকদের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. সোলাইমান। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তিনি দীর্ঘ ২৬ থেকে ২৭ বছর ধরে ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্ত্রী রাশেদা বেগম ও সাত বছরের ছেলে মো. শিপনকে নিয়ে থাকেন খিলগাঁও এলাকার সিপাহীবাগ বাজারের পাশে। সম্প্রতি দেশে গ্যাস সংকটের কারণে আয়-রোজগারে ভাটা পড়েছে তার। সোলাইমান জানালেন, ‘গ্যাসের সমস্যার আগে সিএনজির মালিককে দৈনিক ৬০০ টেকা দেওয়ার পরেও আমি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ইনকাম করতাম। এখন ১৫ হাজার ইনকাম করতেও কষ্ট হইয়া যাইতাছে।’
আক্ষেপ করে সোলাইমান বলেন, ‘ জীবনে গ্যাসের এমন সংকট আর দেখি নাই। এভাবে যদি গ্যাস-সংকট চলতে থাকে, তাইলে ঢাকা শহরে আর থাকতে পারমু না। ইনকামের অবস্থা খারাপ, ঢাকায় থাকার কোনো উপায়ও দেখতাছি না। নিয়ত কইরা রাখছি, গ্রামে গিয়া চাষবাস কইরা পরিবার চালামু।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আয় তো বাড়তাছে না। কিন্তু, ব্যয় ঠিকই বাড়তাছে। আগে বাসা ভাড়া সাড়ে ৫ হাজার দিতাম। এখন প্রতিমাসে ৬ হাজার টেকা বাসা ভাড়া দেওন লাগে। খাওনের খরচ, নিজের খরচ, স্ত্রী আর পোলার খরচ— সবকিছু মিটাইতে আমি খুব খারাপ অবস্থার মইধ্যে আছি। আগে পরিবারের সকল খরচের পরও আমার হাতে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মতো থাকতো। এখন উল্টো টুকটাক হাওলাত করা লাগে। এভাবে আর কত! সরকার কি আমাগো কষ্ট দেখে না!’
দীর্ঘ ১ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার পর গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। ৩০০ টাকার গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে তাকে মাত্র ১০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হয়েছে। সোলাইমান জানান, দৈনিক ৫০০ টাকার গ্যাস লাগে তার। কিন্তু সংকটের কারণে এখন ২০০ টাকার গ্যাসও নিতে পারেন না। এর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার ভোগান্তি তো রয়েছেই।
বুধবার দিবাগত রাত ১টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর এলাকার স্ক্যামকো সিএনজি ফিলিং স্টেশন, শাহজালাল সিএনজি লিমিটেড ও ঢাকা সিএনজি লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে সিএনজি ও প্রাইভেটকার গ্যাস নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এই তিনটি স্টেশনে মোট ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১৫টি প্রাইভেটকার ও একটি অ্যাম্বুলেন্সকে গ্যাস নিতে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

শাহজালাল সিএনজি লিমিটেডে গ্যাস নিতে আসেন অটোরিকশা চালক মো. সাগর। তিনি বলেন, ‘২ ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি, এখনো গ্যাস নিতে পারিনি। কখন নিতে পারবো, তা-ও জানি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল ধোলাইপাড়ের একটি পাম্প স্টেশনে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর মাত্র ৮৫ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছি।’
স্ক্যামকো সিএনজি স্টেশনের কর্মকর্তা মো. শুভ সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী সিএনজি এবং প্রাইভেটকার চালকদেরকে গ্যাস দিতে পারছি। পাম্পে গ্যাসের চাপ একদমই কম। কেউ ৩০০ টাকার গ্যাসের জন্য আসলে তাকে না ফিরিয়ে দিয়ে অন্তত ১০০ টাকার গ্যাস দিচ্ছি। এভাবেই আমরা ব্যালেন্স করে সবাইকে গ্যাস দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টির মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং প্রাইভেটকার গ্যাস নিতে আমাদের এখানে আসে।’
শাহজালাল সিএনজি লিমিটেডের কেশিয়ার মো. শাকিল হোসেনও একই মন্তব্য করেন।
গ্যাস-সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রিয়াজ নামের আরেকজন অটোরিকশা চালক। তিনি বলেন, ‘ঘন্টার পর ঘন্টা গ্যাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কারণে আমরা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাই না। যা পাই তাতেও বেশিক্ষণ সিএনজি চালাতে পারি না। সেজন্য আমাদেরকেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে।’
মেরিনা আক্তার নামের একজন যাত্রী বলেন, ‘আমার অফিস মতিঝিলে এবং বাসা হচ্ছে মিরপুর কালশী স্টিলের ব্রিজের পাশে। আমি বেশিরভাগ সময় সিএনজি দিয়ে কারওয়ান বাজার থেকে যাতায়াত করি। ২ মাস আগেও ভাড়া ছিল ৩৫০ টাকা করে। আর এখন সেটা বেড়ে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাড়া বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে-সে বিষয়ে আমি সিএনজি চালকদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা আমাকে গ্যাসের সংকটের কারণে ভাড়া বেশি নেওয়ার কথা বলছেন।’
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে এই মুহূর্তে ভাড়ায় ১৫ হাজার ৫৯৬ টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে। গ্যাসের সংকটের কারণে চালকরা খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তারা ঠিকমতো গ্যাস পায় না, যেটা পায় সেটাও চাহিদা অনুযায়ী নয়। ইনকাম করুক বা না করুক, কিন্তু মালিককে প্রতিদিন টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গ্যাস সংকট এভাবে চলতে থাকলে চালকরা সিএনজি চালানো হয়তো বন্ধ করেও দিতে পারে।’
গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে গ্যাসের যে কার্গো রয়েছে, সেটির সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
তিনি জানান, ‘ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।’
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ঘাটতি আগেও ছিল। এখন অর্থনীতির আকার বাড়ায় জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে।’









