শিরোনাম

সৌদি থেকে কফিনে এলো ৯ বাংলাদেশির মরদেহ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সৌদি থেকে কফিনে এলো ৯ বাংলাদেশির মরদেহ
সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের কফিনের পাশে শোকার্ত স্বজন

ঋণ করে ৪ বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন মো. ফরিদ শেখ। স্বপ্ন ছিল ভালো কাজ করবেন, ঋণ শোধ করবেন, স্ত্রী ও মাকে নিয়ে সংসার গুছিয়ে নেবেন। দুই সন্তানকে মানুষ করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের আর কোনোদিন বাস্তব হবে না, তিনি ফিরেছেন কফিনে।

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ১৬ বাংলাদেশি। এর মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার (২৭ এপ্রিল) বিকাল ৪টা ৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪০ ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।

নিহতদের মরদেহ গ্রহণ করতে দুপুর থেকেই বিমানবন্দরের ৮ নম্বর কার্গো গেট এলাকায় অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের লাশ বুঝে নেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। এসময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

ফরিদের বোন রুলি বলেন, ‘আমার ভাই সবার ছোট। আমরা বড় বোনেরা মিলে ঋণ করে তাকে সৌদি আরবে পাঠাইছিলাম। ভাবছিলাম, বিদেশে গিয়ে ভালো কাজ করে পরিবারের অভাব দূর করবো। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর সে ঠিকমতো কাজ পায় নাই। এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানিতে কাজ করছে। ঠিকমতো বেতনও পাইতো না। ফলে চার বছরেও ঋণ পরিশোধ করতে পারে নাই।’

একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে ভালো থাকার স্বপ্নও হারিয়েছে

দুপুর থেকেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৮ নম্বর কার্গো গেট এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন নিহত ফরিদের স্বজনরা। কফিন আসার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।

একমাত্র ভাই পরিবারের অভাব ঘোচাবে– এ আশায় বড় বোনেরা মিলে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ঋণ করে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। চার বছর পর সেই ভাইয়ের লাশ নিতে বিমানবন্দরে দাঁড়াতে হয়েছে তাদের। ঋণ শোধ হয়নি। বরং ভাইকে হারিয়ে এখন পরিবারের সামনে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

ফরিদের বোন রুলি বলেন, ‘আমার ভাই সবার ছোট। আমরা বড় বোনেরা মিলে ঋণ করে তাকে সৌদি আরবে পাঠাইছিলাম। ভাবছিলাম, বিদেশে গিয়ে ভালো কাজ করে পরিবারের অভাব দূর করবো। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর সে ঠিকমতো কাজ পায় নাই। এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানিতে কাজ করছে। ঠিকমতো বেতনও পাইতো না। ফলে চার বছরেও ঋণ পরিশোধ করতে পারে নাই।’

অগ্নিকাণ্ডের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল ফরিদের। তখন রান্না করছিলেন। রুলি বলেন, ‘ভাই আমার বলেছিলো গরুর মাংস রান্না করছি, খেয়ে উঠে ঘুমাব। ঘুম থেকে উঠে সবার সঙ্গে কথা বলব। এরপর আর ফোন করা হয়নি। এরপর আগুনের খবর পাই। এর কিছুক্ষণ পর ফরিদের পুড়ে যাবার খবর পাই।’

ফরিদের পরিবারে এখন তার মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পরিবারটি কীভাবে চলবে, কীভাবে সন্তানদের লেখাপড়া হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনরা। সরকারের কাছে ঋণ পরিশোধ এবং সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য সহায়তা চেয়েছেন তারা।

মায়ের কোলে বসে ছিল সোহেলের ৮ মাসের সন্তান। চারপাশে মানুষের ভিড়, স্বজনদের কান্না, সাংবাদিকদের ছোটাছুটি কিছুই বুঝতে পারছিল না শিশুটি। আপন মনে তাকিয়ে ছিল চারপাশে। কখনো সাংবাদিকদের হাতে থাকা বুমের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। শিশুটি জানে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবে না।

অবুঝ সন্তান জানেই না বাবা আর কোলে নেবে না

একই আগুন কেড়ে নিয়েছে সোহেল রানাকেও। তবে সোহেলের মরদেহ নিতে বিমানবন্দরে এসে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা যেন এই মৃত্যুর নির্মমতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

মায়ের কোলে বসে ছিল সোহেলের ৮ মাসের সন্তান। চারপাশে মানুষের ভিড়, স্বজনদের কান্না, সাংবাদিকদের ছোটাছুটি কিছুই বুঝতে পারছিল না শিশুটি। আপন মনে তাকিয়ে ছিল চারপাশে। কখনো সাংবাদিকদের হাতে থাকা বুমের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। শিশুটি জানে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবে না।

সোহেল প্রায় ৪ বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। বিয়ের পর স্ত্রী আমেনার সঙ্গে মাত্র ছয় মাস সংসার করতে পেরেছিলেন। এরপর প্রবাসে চলে যান। মাঝে ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলেন, পরে দুই মাসের সন্তানকে রেখে আবার ফিরে যান সৌদি আরবে। তাদের সন্তানের বয়স এখন ৮ মাস।

সোহেলের শাশুড়ি শরিফা জানান, সোহেলের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। প্রবাসে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছিলেন তিনি। সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের স্বস্তির জন্য যে দূর দেশে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই ফিরলেন নিথর হয়ে।

দেশে ফেরা নিহতদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ৭ জন হলেন উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, কলিমউদ্দিন ইসলাম, মোহন আলী ও তার ছোট ভাই সুমন আলী, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরকার।

এ ছাড়া নাটোরের নলডাঙ্গার মহিষডাঙ্গা গ্রামের রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রামের শ্যামল উদ্দিনের মরদেহও দেশে এসেছে।

মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রবাসীদের মরদেহ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে। কিছু ওয়ারিশের তালিকা এখনো পাওয়া যায়নি। তালিকা পাওয়া গেলেই আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা মর্মাহত। নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আপাতত ৯ জনের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে। অতি দ্রুত বাকি ৭ জনের মরদেহও ফিরিয়ে আনা হবে। তাদের শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এ বিষয়ে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।’

/এফসি/