শিরোনাম

ঋণের চক্রে সরকার, এপ্রিলে নিয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
ঋণের চক্রে সরকার, এপ্রিলে নিয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা

স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। গতি নেই ব্যবসা-বাণিজ্যে। গত কয়েক মাস ধরে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও কমছে। সবকিছু মিলিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়ের। অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বাড়ছে ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা।

অর্থ আদায়ের বড় ঘাটতি আর অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের খরচ মেটাতে গিয়ে এক বড় ঋণের চক্রে পড়েছে সরকার। বিগত এপ্রিল মাসেই সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নিয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

তবে চিন্তার বিষয় হলো, এই বিশাল অঙ্কের বড় অংশই– প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে আগের নেয়া ঋণের দায় মেটাতে বা সুদ-আসল পরিশোধ করতে। ফলে সরকারের হাতে নিট ঋণ হিসেবে থেকেছে মাত্র ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এভাবে পুরনো ঋণ শোধ করতে নতুন করে ঋণ নেওয়ার এই কৌশল দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

কেন বাড়ছে এই ঋণের প্রবণতা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। রাজস্ব আহরণের এই নাজুক পরিস্থিতির কারণেই মূলত সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে।

এছাড়া, প্রতি বছরই এপ্রিল থেকে জুন– এই শেষ প্রান্তিকে সরকারি প্রকল্প ও ব্যয়ের গতি বাড়ে। ফলে মে ও জুন মাসেও সরকারের ঋণের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার মোট ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

ব্যাংকগুলোর ‘সহজ মুনাফা’ ও বেসরকারি খাতে খরা

নিশ্চিত লাভ এবং শূন্য ঝুঁকির কারণে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী। বর্তমানে ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের স্থিতি প্রায় ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ বাড়লেও, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর মূল কাজ ভালো উদ্যোক্তা খুঁজে ঋণ দেওয়া, কিন্তু সরকারের এই অতি-নির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের খরা তৈরি হচ্ছে, যা কর্মসংস্থানে বাধা দেবে।

ঋণের পাহাড় ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। তা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে ৭৮ হাজার কোটি টাকা এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর থেকে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দিয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে নিয়েছে আরো ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় বিএনপি সরকার ঋণ নিয়েছে ৪১ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের ব্যাংক ঋণের বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, রাজস্ব ঘাটতি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারকে এখন অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রতি ঝুঁকতে হচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে অর্থের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।

সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায়। এর মধ্যে স্থানীয় ঋণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ১১ লাখ ৪৭ হাজার ২৪০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এভাবে ব্যাংক খাত থেকে ধার করা অব্যাহত রাখলে তা বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে, নতুন করদাতা খোঁজা, কর ফাঁকি রোধ করা এবং এনবিআরের সংস্কারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়া এই ঋণের ফাঁদ থেকে বের হওয়ার আর কোনো সহজ বিকল্প নেই।

/এফসি/