শিরোনাম

ব্যাংক এমডিদের দক্ষতা মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যাংক এমডিদের দক্ষতা মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে অভিন্ন ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস’ বা কেপিআই ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ কাঠামোয় পাঁচটি ক্ষেত্রে এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা পরিমাপে জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো– ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, খেলাপি ঋণ, মুনাফা, সুশাসন এবং গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। মূল্যায়নের ফলাফল তাদের পারিশ্রমিক, প্রণোদনা, পুনর্নিয়োগ, মেয়াদ বৃদ্ধি ও উত্তরসূরি নির্বাচনের সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ এ-সংক্রান্ত নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে। দেশের সব ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে প্রজ্ঞাপনের কপি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমানতকারী ও ব্যাংকের স্বার্থ সুরক্ষায় এ কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এমডি/সিইও নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে খেলাপি ঋণ কমানো এবং অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এসব বিষয়কে আরো সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যমান এমডি/সিইওদের ক্ষেত্রে এ কাঠামোয় প্রথম লক্ষ্যমাত্রার সময় হবে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭। পরিচালনা পর্ষদকে ৬ মাস পরপর রোলিং-ফরওয়ার্ড পদ্ধতিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। পুরো মেয়াদের জন্য নির্ধারিত কেপিআই কাঠামো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে এবং প্রতিটি মূল্যায়ন শেষে ১৫ দিনের মধ্যে পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

কেপিআই সূচকের কোনোটিতে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলে তা ‘শূন্য’ বলে বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে মোট স্কোর থেকে অতিরিক্ত নম্বর কাটা হবে। আর সামগ্রিক স্কোর ১০০-তে কোনো এমডি ৬৫-এর নিচে পেলে তিনি ‘বিলো অ্যাভারেজ’ বা গড় মানের চেয়ে নিম্নমানের বলে বিবেচিত হবেন।

কেপিআইয়ের মূল্যায়নটি কে করবে– এ প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, নিজ নিজ ব্যাংকের পর্ষদ এমডির কেপিআই মূল্যায়ন রিপোর্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাবে। আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেগুলো নিরীক্ষা করে দেখবে। ত্রুটিপূর্ণ বা জালিয়াতি হলে পর্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, যদি মূল্যায়নে কোনো শীর্ষ নির্বাহীর পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে খারাপ দেখা যায়, তাহলে তার মেয়াদ না-ও বাড়তে হতে পারে। আবার খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে তাকে অপসারণে পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কে এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য মোট পাঁচটি ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল্যায়নের সামগ্রিক স্কোর বা নম্বর হবে ১০০। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ করে নম্বর রাখা হয়েছে ব্যাংকের ‘সলভেন্সি অ্যান্ড লিকুইডিটি’ ও ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি’তে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মুনাফার ওপর রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ। সুশাসন ও ইন্টারনাল কন্ট্রোলের জন্য রাখা হয়েছে ২৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ থাকবে ‘ইনক্লুশন, কাস্টমার অ্যান্ড মার্কেট কন্ডাক্ট’-এর আওতায়।

কেপিআই সূচকের কোনোটিতে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলে তা ‘শূন্য’ বলে বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে মোট স্কোর থেকে অতিরিক্ত নম্বর কাটা হবে। আর সামগ্রিক স্কোর ১০০-তে কোনো এমডি ৬৫-এর নিচে পেলে তিনি ‘বিলো অ্যাভারেজ’ বা গড় মানের চেয়ে নিম্নমানের বলে বিবেচিত হবেন। সামগ্রিক স্কোর ৬৫ থেকে ৭৫-এর নিচে হলে ‘অ্যাভারেজ’ এবং ৭৫ বা তার বেশি হলে ‘অ্যাবাভ অ্যাভারেজ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।

ব্যাংক নির্বাহীদের অনেকে বলছেন, জারি করা প্রজ্ঞাপনটি ব্যাংক এমডিদের জন্য ‘অপমানজনক’। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনেক ব্যাংকের এমডি স্বাধীন নন। এক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানই সর্বেসর্বা। এমন বাস্তবতায় শুধু এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করতে গেলে দুর্বল ব্যাংকগুলো এমডিই খুঁজে পাবে না।

এদিকে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন জানান, কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে তার প্রাথমিক মূল্যায়ন ইতিবাচক। তিনি বলেন, ব্যাংকের এমডিদের কর্মদক্ষতা বহুমাত্রিক সূচকে পরিমাপ করার উদ্যোগ সময়োপযোগী। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এরইমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো চালু হয়েছে। এ কেপিআই পদ্ধতি সেই বৃহত্তর জবাবদিহিমূলক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে একটা মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। একজন এমডিকে যে ফলাফলের জন্য জবাবদিহি করা হবে, সেই ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্তৃত্বও তার থাকতে হবে।

/এফসি/