শ্রেণিকৃত ঋণ পৌনে ৬ লাখ কোটি ছাড়ালো, প্রভিশন ঘাটতি আকাশচুম্বী

শ্রেণিকৃত ঋণ পৌনে ৬ লাখ কোটি ছাড়ালো, প্রভিশন ঘাটতি আকাশচুম্বী
মরিয়ম সেঁজুতি

আর্থিক খাতের বিষফোঁড়াখ্যাত খেলাপি ঋণ প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ নাগাদ দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পৌনে ৬ লাখ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
মূলত সুশাসনের অভাব, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণে জর্জরিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বাড়ছে। কারণ হলো, বিগত দিনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের’ বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলেও খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপির সুদ যোগ হয়ে মোট খেলাপির পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে। তিনি বলেন, ঋণ চাহিদা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যেন বন্ধ কারখানা চালু ও অর্থনীতি সক্রিয় হয়।
এর আগে ঋণ আদায় ও পুনঃতফসিল সুবিধায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নবায়ন হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বরে হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, খেলাপি ঋণ হলো ক্যান্সারের মতো। এটা স্বল্প সময়ে না কমলে মৃত্যু নিশ্চিত। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের কারণে সবাই টাকা হারাচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় কার কী দায়িত্ব, তা নির্ধারিত হলেও অনেকে মানছেন না। এ জন্য নির্দেশিত ঋণ হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়ে পড়ছে।
মোট খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট শ্রেণিকৃত ঋণের সিংহভাগই এখন প্রকৃত খেলাপি ঋণ। সর্বশেষ ৩১ মার্চের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১.৮৮ কোটি টাকা (হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ)। অর্থাৎ, মাত্র এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১ শতাংশ পয়েন্ট।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৯৩.৬৯ শতাংশই ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ ক্যাটাগরির ঋণ, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই ধরনের ঋণ আদায় হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই গণ্য করা হয়, যা ব্যাংকের স্থায়ী সম্পদ ও তারল্যকে সরাসরি গ্রাস করছে। এছাড়া ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের আগাম ইঙ্গিতবাহী ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ বা বিশেষ বিবেচনায় রাখা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী প্রান্তিকের চেয়ে ২৮ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বেশি।
প্রভিশন ঘাটতি ছাড়ালো ২ লাখ কোটি টাকা
ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঋণের মানভেদে নির্ধারিত নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড় জমায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ৩১ মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট রক্ষিতব্য প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতাই প্রকাশ করছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের মহাধস
ব্যাংকগুলোর ধরন বা ক্লাস্টার ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাবরের মতোই রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা এই খাতের সর্বোচ্চ ৪৫.৮৫ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে; তাদের বিতরণকৃত ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকা শ্রেণিকৃত হয়ে পড়েছে, যা শতাংশের হিসাবে ৩০.১১ শতাংশ। বিগত প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকে এই হার ছিল ২৮.২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের জন্য গঠিত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪০.৭২ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের শ্রেণিকৃত ঋণের হার কিছুটা বেড়ে ৪.৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হারের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩০.৮১ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বেসরকারি ব্যাংকের নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১২.৩৩ শতাংশ।
এক বছরে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ
খেলাপির এই ভয়াবহ প্রসারের মধ্যেও ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে এসে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, বিগত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ৪.৭৫ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে, যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৮৫ কোটি ৬ লাখ টাকা (প্রবৃদ্ধি ৫.৫৬ শতাংশ)। পক্ষান্তরে, সবচেয়ে কম ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে, মাত্র ০.৯২ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণ বিতরণের এই প্রবৃদ্ধির চেয়ে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধির গতি প্রায় ৪ গুণ বেশি। ঋণ বিতরণের বড় অংশই যদি খেলাপি এবং মন্দ ঋণে পরিণত হতে থাকে, তবে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা যেমন কমবে, তেমনি সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রভিশন ও স্থগিত সুদের সঙ্গে সমন্বয়ের পর সামগ্রিক খাতের নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১৫.০১ শতাংশে পৌঁছানো কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।

আর্থিক খাতের বিষফোঁড়াখ্যাত খেলাপি ঋণ প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ নাগাদ দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পৌনে ৬ লাখ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
মূলত সুশাসনের অভাব, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণে জর্জরিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বাড়ছে। কারণ হলো, বিগত দিনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের’ বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলেও খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপির সুদ যোগ হয়ে মোট খেলাপির পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে। তিনি বলেন, ঋণ চাহিদা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যেন বন্ধ কারখানা চালু ও অর্থনীতি সক্রিয় হয়।
এর আগে ঋণ আদায় ও পুনঃতফসিল সুবিধায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নবায়ন হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বরে হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, খেলাপি ঋণ হলো ক্যান্সারের মতো। এটা স্বল্প সময়ে না কমলে মৃত্যু নিশ্চিত। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের কারণে সবাই টাকা হারাচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় কার কী দায়িত্ব, তা নির্ধারিত হলেও অনেকে মানছেন না। এ জন্য নির্দেশিত ঋণ হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়ে পড়ছে।
মোট খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট শ্রেণিকৃত ঋণের সিংহভাগই এখন প্রকৃত খেলাপি ঋণ। সর্বশেষ ৩১ মার্চের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১.৮৮ কোটি টাকা (হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ)। অর্থাৎ, মাত্র এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১ শতাংশ পয়েন্ট।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৯৩.৬৯ শতাংশই ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ ক্যাটাগরির ঋণ, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই ধরনের ঋণ আদায় হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই গণ্য করা হয়, যা ব্যাংকের স্থায়ী সম্পদ ও তারল্যকে সরাসরি গ্রাস করছে। এছাড়া ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের আগাম ইঙ্গিতবাহী ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ বা বিশেষ বিবেচনায় রাখা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী প্রান্তিকের চেয়ে ২৮ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বেশি।
প্রভিশন ঘাটতি ছাড়ালো ২ লাখ কোটি টাকা
ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঋণের মানভেদে নির্ধারিত নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড় জমায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ৩১ মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট রক্ষিতব্য প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতাই প্রকাশ করছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের মহাধস
ব্যাংকগুলোর ধরন বা ক্লাস্টার ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাবরের মতোই রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা এই খাতের সর্বোচ্চ ৪৫.৮৫ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে; তাদের বিতরণকৃত ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকা শ্রেণিকৃত হয়ে পড়েছে, যা শতাংশের হিসাবে ৩০.১১ শতাংশ। বিগত প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকে এই হার ছিল ২৮.২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের জন্য গঠিত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪০.৭২ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের শ্রেণিকৃত ঋণের হার কিছুটা বেড়ে ৪.৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হারের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩০.৮১ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বেসরকারি ব্যাংকের নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১২.৩৩ শতাংশ।
এক বছরে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ
খেলাপির এই ভয়াবহ প্রসারের মধ্যেও ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে এসে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, বিগত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ৪.৭৫ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে, যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৮৫ কোটি ৬ লাখ টাকা (প্রবৃদ্ধি ৫.৫৬ শতাংশ)। পক্ষান্তরে, সবচেয়ে কম ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে, মাত্র ০.৯২ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণ বিতরণের এই প্রবৃদ্ধির চেয়ে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধির গতি প্রায় ৪ গুণ বেশি। ঋণ বিতরণের বড় অংশই যদি খেলাপি এবং মন্দ ঋণে পরিণত হতে থাকে, তবে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা যেমন কমবে, তেমনি সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রভিশন ও স্থগিত সুদের সঙ্গে সমন্বয়ের পর সামগ্রিক খাতের নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১৫.০১ শতাংশে পৌঁছানো কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।

শ্রেণিকৃত ঋণ পৌনে ৬ লাখ কোটি ছাড়ালো, প্রভিশন ঘাটতি আকাশচুম্বী
মরিয়ম সেঁজুতি

আর্থিক খাতের বিষফোঁড়াখ্যাত খেলাপি ঋণ প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ নাগাদ দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পৌনে ৬ লাখ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।
মূলত সুশাসনের অভাব, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণে জর্জরিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বাড়ছে। কারণ হলো, বিগত দিনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের’ বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলেও খেলাপি ঋণ, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপির সুদ যোগ হয়ে মোট খেলাপির পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে। তিনি বলেন, ঋণ চাহিদা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যেন বন্ধ কারখানা চালু ও অর্থনীতি সক্রিয় হয়।
এর আগে ঋণ আদায় ও পুনঃতফসিল সুবিধায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নবায়ন হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বরে হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, খেলাপি ঋণ হলো ক্যান্সারের মতো। এটা স্বল্প সময়ে না কমলে মৃত্যু নিশ্চিত। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের কারণে সবাই টাকা হারাচ্ছে। দেশের ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাব রয়েছে। পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় কার কী দায়িত্ব, তা নির্ধারিত হলেও অনেকে মানছেন না। এ জন্য নির্দেশিত ঋণ হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়ে পড়ছে।
মোট খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট শ্রেণিকৃত ঋণের সিংহভাগই এখন প্রকৃত খেলাপি ঋণ। সর্বশেষ ৩১ মার্চের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১.৮৮ কোটি টাকা (হার ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ)। অর্থাৎ, মাত্র এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১ শতাংশ পয়েন্ট।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৯৩.৬৯ শতাংশই ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ ক্যাটাগরির ঋণ, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই ধরনের ঋণ আদায় হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই গণ্য করা হয়, যা ব্যাংকের স্থায়ী সম্পদ ও তারল্যকে সরাসরি গ্রাস করছে। এছাড়া ভবিষ্যৎ খেলাপি ঋণের আগাম ইঙ্গিতবাহী ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ বা বিশেষ বিবেচনায় রাখা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী প্রান্তিকের চেয়ে ২৮ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বেশি।
প্রভিশন ঘাটতি ছাড়ালো ২ লাখ কোটি টাকা
ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঋণের মানভেদে নির্ধারিত নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড় জমায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ৩১ মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট রক্ষিতব্য প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতাই প্রকাশ করছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের মহাধস
ব্যাংকগুলোর ধরন বা ক্লাস্টার ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাবরের মতোই রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা এই খাতের সর্বোচ্চ ৪৫.৮৫ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে; তাদের বিতরণকৃত ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকা শ্রেণিকৃত হয়ে পড়েছে, যা শতাংশের হিসাবে ৩০.১১ শতাংশ। বিগত প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকে এই হার ছিল ২৮.২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের জন্য গঠিত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪০.৭২ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের শ্রেণিকৃত ঋণের হার কিছুটা বেড়ে ৪.৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হারের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩০.৮১ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বেসরকারি ব্যাংকের নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১২.৩৩ শতাংশ।
এক বছরে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ
খেলাপির এই ভয়াবহ প্রসারের মধ্যেও ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে এসে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, বিগত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ৪.৭৫ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে, যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৮৫ কোটি ৬ লাখ টাকা (প্রবৃদ্ধি ৫.৫৬ শতাংশ)। পক্ষান্তরে, সবচেয়ে কম ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে, মাত্র ০.৯২ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণ বিতরণের এই প্রবৃদ্ধির চেয়ে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধির গতি প্রায় ৪ গুণ বেশি। ঋণ বিতরণের বড় অংশই যদি খেলাপি এবং মন্দ ঋণে পরিণত হতে থাকে, তবে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা যেমন কমবে, তেমনি সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রভিশন ও স্থগিত সুদের সঙ্গে সমন্বয়ের পর সামগ্রিক খাতের নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১৫.০১ শতাংশে পৌঁছানো কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।

খেলাপি ঋণ অবলোপনে ‘সময়সীমার বাধা’ তুলে নতুন নির্দেশনা


