শিরোনাম
মুদ্রানীতি

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে ৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা ঘোষণা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে ৬০ হাজার কোটির প্রণোদনা ঘোষণা
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

দেশের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আবারও ‘সংকোচনমূলক’ বা কঠোর মুদ্রানীতিতে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) প্রথম ছয়মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬) জন্য ঘোষিত এই মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (পলিসি রেট) ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে, মুদ্রাবাজার কঠোর রাখার পাশাপাশি, ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মুদ্রানীতি বক্তব্য (এমপিএস) প্রকাশ করা হয়।

সুদের হার অপরিবর্তিত: লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রাখার পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে।

টানা দুই বছরের কঠোর মুদ্রানীতির ফলে, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে তা এখনও চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশ ওপরে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে বাগে আনাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অগ্রাধিকার।

অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও ঋণের মন্দা

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকার করেছে যে, দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেও এখনও খেলাপি ঋণ, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের মতো আমদানি পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘কস্ট-পুশ’ বা উৎপাদন ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, কারণ বাজারে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে অতি-সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় এবং সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালের মে শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৫ শতাংশে। ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ এখন উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে।

গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটির ‘মহা-প্যাকেজ’

কঠোর মুদ্রানীতির ধাক্কায় বেসরকারি খাত যাতে স্থবির হয়ে না পড়ে, সেজন্য অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল উদ্দীপনা বা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থায়নের উৎস: এই তহবিলের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে।

লক্ষ্য ও কর্মসংস্থান: আবাসন ও মূল শিল্প খাত, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে লক্ষ্য করে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এই উদ্যোগের ফলে দেশে প্রায় ২৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এক্সচেঞ্জ রেট ও ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কার

বৈদেশিক বাণিজ্য স্থিতিশীল: রাখতে, রপ্তানি বাড়াতে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহকে উৎসাহিত করতে একটি নমনীয় ও সম্পূর্ণ বাজার-ভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে:

আইএফআরএস ৯ এর আওতায় এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস ফ্রেমওয়ার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন।

রিস্ক-বেসড সুপারভিশন জোরদার করা।

সদ্য পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন ২০২৬’ এবং ’আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬’ কঠোরভাবে প্রয়োগ।

করদাতাদের টাকা ব্যবহার না করে ব্যাংকের মন্দ ঋণ নিষ্পত্তির জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ চালুর পরিকল্পনা।

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে সর্বজনীন ও সহজ করতে ব্যাংক ও এমএফএস গুলোর মধ্যে ইন্টারঅপারেবল সুবিধা হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠোর বার্তা এবং উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনার এক ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নিয়ে আগামী ছয় মাসের পথনকশা সাজিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকার চলতি অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে এই মুদ্রানীতি সহায়ক হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

/এমআর/