শিরোনাম

যুদ্ধের ছায়া সিলেটের ঈদ বাজারে, বিপাকে ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট
যুদ্ধের ছায়া সিলেটের ঈদ বাজারে, বিপাকে ব্যবসায়ীরা
ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত ক্রেতারা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সিলেটের ঈদের বাজারে। প্রবাসীদের আয় কমে যাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এর সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে সিলেটের বিপণি বিতানগুলোতে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটা কম।

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে, কোথাও ক্রেতাশূন্য, কোথাও উপচে পড়া ভিড়।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সরেজমিনে নগরীর জিন্দাবাজারের শুকরিয়া মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত তেমন কোনো ক্রেতাদের ভিড় নেই। এই মার্কেটে অন্য ঈদ মৌসুমে ব্যাপক ক্রেতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অন্য দিনগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় ছিল সাধারণ সময়ের মতোই।

ঈদের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এমন পরিস্থিতিতে হতাশ মার্কেটের ‘আনন্দ ফ্যাশন’ এর মালিক ইমরান আহমেদ। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘এবার ব্যবসা আসলে শুরু হয়েছে ২০ রমজানের পর। মানুষের কাছে টাকা নেই, তাই বাজারটা জমছে না।’

তার মতে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে অনেক বাংলাদেশি প্রবাসীর কাজকর্মে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সিলেটের বিপুলসংখ্যক মানুষ ওইসব দেশে কাজ করায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে না পারায় দেশে থাকা পরিবারগুলোর কেনাকাটার সক্ষমতাও কমে গেছে।

একই চিত্র নগরীর কুমারপাড়াতেও। এলাকাটিতে বেশ কিছু ব্র্যান্ডের শো-রুম থাকলেও বৃহস্পতিবার রাতে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে ক্রেতার ভিড় নেই।

ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে নানা আলোকসজ্জা দেখা গেলেও বেচা-বিক্রি কম। কথা হয় ‘এম অ্যান্ড এন’ নামের একটি পোশাক বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আব্দুল মুহিতের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিক্রি ধীরে ধীরে কিছুটা বাড়ছে। তবে লক্ষ্যমাত্রার েধারে কাছেও যেতে পারিনি।’

কুমারপাড়ার সুনসান নীরবতার বিপরীতে নয়াসড়ক এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। আলোকসজ্জায় সজ্জিত সড়কে মানুষের ঢল নেমেছে। ‘ইভ’ ও ‘বারনী’ নামে দোকানসহ বেশ কয়েকটি শপে দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। নিজেদের পছন্দ মতো পোশাক বেছে নিতে ব্যস্ত ক্রেতারা। এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দামের পোশাকের চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তুলি চৌধুরী নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘এই (ইভ) দোকানের পরিচয় আমি ফেসবুকে পেয়েছি। এখানে অনেক ধরনের ডিজাইন আছে, বাজেটও বিভিন্ন রকম। তাই দেখতে এসেছি, পছন্দ হলে কিনবো।’

ইভের ব্যবস্থাপক লিটন আহমেদ বলেন, ‘আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত পণ্য দেওয়ার চেষ্টা করি। এজন্যই ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। চাহিদা বাড়ায় আমাদের নতুন নতুন ভ্যারিয়েশন আনতে হচ্ছে, যা ক্রেতারাও পছন্দ করছেন।’

ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ছবি: সিটিজেন জার্নাল

বারনীর ব্যবস্থাপক স্বাধীন আহমেদ বলেন, ‘এবার ঈদের বাজার শুরু হয়েছে একটু দেরিতে। এখন ক্রেতা কিছুটা বাড়লেও সেটা প্রত্যাশিত নয়। সাধারণত এই সময়ে আমাদের লক্ষ্য পূরণ হয়ে যায়।’

একই এলাকার আড়ংয়ের শো-রুমে গিয়েও দেখা গেছে মানুষের ভিড়। নারী-পুরুষসহ শিশুদের কর্নারের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ডিজাইন ও আকার বেধে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার টাকা দামের পোশাক রয়েছে শিশুদের জন্য। বাহারি রকমের বাচ্চাদের ফতোয়া, গেঞ্জি, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা স্থান পেয়েছে শো-রুমে।

কথা হয় ছেলে-মেয়ের জন্য পোশাক কিনতে আসা নগরীর রামের দিঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা শাহরান চৌধুরীর সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘ঈদের কেনাকাটা খুবই কষ্টের। অন্যান্য জায়গায় প্রচুর ঘুরতে হয়, দামাদামি করতে হয়। পছন্দ অনুযায়ী সবকিছু পাওয়াও যায় না। তাই এখানে আসি।’

অন্যদিকে একসময়ের সিলেটের অভিজাত শ্রেণির শপিং সেন্টার নামে পরিচিত আল হামরা শপিং সিটিতে গিয়ে দেখা গেছে, নারীদের জন্য সেন্টারটিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পোশাক। তবে এবার আসা ‘ফারসি’ নামের একটি পোশাক তরুণী-মাঝ বয়সী সবার কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পছন্দের ডিজাইন ও রঙের পোশাকটি বেছে নিয়ে তার ভিড় জমাচ্ছেন শপিং সেন্টারের তৃতীয় তলায় থাকা ‘বধুয়া ফ্যাশন’ নামে দোকানটিতে।

তবে দোকানটির স্বত্বাধিকারী রশীদ আহমেদের কণ্ঠেও ছিল আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘সাধারণত ৮ থেকে ১০ রমজানের মধ্যে ঈদের বাজার শুরু হয় এবং ১৫ রমজানের মধ্যে জমে ওঠে। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন। এখনও বেচা-বিক্রি নির্ধারিত লক্ষ্যের অর্ধেকও পূরণ হয়নি।’

এদিকে, দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। আদনান খান নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘এবার জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। মানুষের হাতে টাকাও কম। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঈদের কেনাকাটা কঠিন হয়ে গেছে।’

ব্যবসায়ীরা এখন তাকিয়ে আছেন শেষ কয়েক দিনের দিকে। অন্য বছরের মতো না হলেও ঈদের পূর্বের দিনগুলোতে বর্তমান পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের।

/এসআর/