‘পায়ে লোহার শিকল, দুবেলার খাবার ভাত ও শুটকি’

‘পায়ে লোহার শিকল, দুবেলার খাবার ভাত ও শুটকি’
কক্সবাজার প্রতিনিধি

আরাকান আর্মির বন্দিশালায় শিকল পরিয়ে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আটকে রাখা হয়। তাদের দিয়ে কৃষিকাজ, বাংকার তৈরি ও রাস্তা মেরামতের কাজ করানো হতো। খাবার দেওয়া হতো দিনে দুবার শুঁটকির তরকারি ও ভাত। যুদ্ধবিমানের বোমা হামলার আতঙ্কের মধ্যেও তাদের দিন কাটে
জোয়ারের স্রোতে ভুলবশত সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার অপরাধে এই জেলেদের জীবন পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। দীর্ঘ ৮ মাস পর বিজিবির প্রচেষ্টায় ১৯ আগস্ট ঘরে ফিরেছেন ২৪ বাংলাদেশি জেলে। মুক্ত হওয়া জেলেরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বন্দিদশার আতঙ্ক।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ আশপাশের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে আরাকান আর্মি। এই এলাকা পুনরুদ্ধারে আরাকান আর্মির অবস্থানে প্রতিনিয়ত বিমানে হামলা, বোমা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। এই অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রাখাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাফ নদীর বিপরীত তীরের বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির কয়েক লাখ মানুষের জীবনেও পড়েছে। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি বাংলাদেশি জেলেরা নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে ঠিক মতো মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। প্রায়ই নৌকাসহ বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৮ আগস্ট নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপের বদরমোকাম জলসীমা থেকে ৩ জন বাংলাদেশি জেলেসহ একটি মাছ ধরার নৌকা ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
১৯ আগস্ট দুপুরে নাফ নদীর মধ্য ভাগে শূন্যরেখায় বিজিবির কাছে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে আরাকান আর্মি। টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ফিরিয়ে আনা ২৪ জেলের পরিচয় যাচাই করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন ও রোহিঙ্গা ২১২ জন। তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির বন্দিশালায় ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা বন্দী রয়েছেন।
ফিরে আসা ২৪ জেলের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানা যায়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনের পশ্চিম পাড়ার মো. ইলিয়াসের একটি ইঞ্জিননৌকা নিয়ে ৬ জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। জেলেদের একজন সেন্টমার্টিনের পশ্চিমপাড়ার মো. আবদুল্লাহ। তিনি জানান, সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে ‘সিতার লামা’ এলাকায় জাল ফেলার পর রাখাইন রাজ্যের দিক থেকে স্পিডবোটে এসে ৮-৯ জন আরাকান আর্মির সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাদের জিম্মি করে। হাত-পা বেঁধে রাখাইন রাজ্যের একটি ঘাঁটিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

আবদুল্লাহ বলেন, ‘আরাকান আর্মির সদস্যরা বারবার জানতে চেয়েছিল, আমরা আরসা কিংবা আরএসওর সদস্য কি না। বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের মংডুর একটি কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দী অবস্থায় প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। কৃষিকাজের পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য বাংকার (গর্ত) তৈরি এবং ভাঙা রাস্তা মেরামতের কাজ করতে হতো। দিনে দুবেলা শুধু শুঁটকি মাছ দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।’
২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের পূর্ব দিক থেকে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির স্পিডবোট সেন্টমার্টিন দ্বীপের আরেকটি নৌকা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং নৌকার পাঁচ জেলেকে চোখ বেঁধে মিয়ানমার সীমান্তে নিয়ে যায়। তাদের একজন মো. নুরুল আলম বলেন, প্রথমে তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা কেন মিয়ানমারের জলসীমায় মাছ ধরছিলেন। এরপর জানতে চাওয়া হয়, তারা সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত কি না।
নুরুল আলম বলেন, প্রথম রাতে তাদের প্লেটে করে অল্প পরিমাণ ভাতের মাড় খেতে দেওয়া হয়। এরপর দুই পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে ফেলে রাখা হয়। কিছুদিন পর দুপুরে ও সন্ধ্যার আগে দুবেলা ভাত দেওয়া শুরু হয়। ভাতের সঙ্গে দিত শুঁটকি মাছের তরকারি। বন্দিদশার ৬ দিনের মাথায় তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তাদের দিয়ে রাস্তা সংস্কার ও মাটি কাটার কাজ করানো হতো। এভাবেই দুঃখ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাদের ৮ মাস কেটেছে।
ফিরে আসা আরেক জেলে জসিম উদ্দিন বলেন, বিস্ফোরণে মংডু শহর কেঁপে উঠত। বন্দিশালায় তখন সবাই আতঙ্কে কান্নাকাটি শুরু করে দিতেন। আরাকান আর্মিও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালাত, যার বিকট শব্দ কানে বাজত। বোমা হামলায় আশপাশের বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেছেন তারা। যুদ্ধের ওই সময়ে তাদের ঠিক মতো খাবার দেওয়া হতো না। সকাল ১০টার দিকে একবার এবং বিকাল ৪টার দিকে আরেকবার শুকনো মাছ ও ডাল দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, আরাকান আর্মি ২০২৪ সালে মিয়ানমারের মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই নাফ নদী ও সাগরে বাংলাদেশি জেলেরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। নদী-সাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জলসীমা বুঝতে না পারায় জেলেরা অসাবধানতাবশত সীমানা পার হন। তখনই আরাকান আর্মি তাদের ধরে নিয়ে যায়।

আরাকান আর্মির বন্দিশালায় শিকল পরিয়ে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আটকে রাখা হয়। তাদের দিয়ে কৃষিকাজ, বাংকার তৈরি ও রাস্তা মেরামতের কাজ করানো হতো। খাবার দেওয়া হতো দিনে দুবার শুঁটকির তরকারি ও ভাত। যুদ্ধবিমানের বোমা হামলার আতঙ্কের মধ্যেও তাদের দিন কাটে
জোয়ারের স্রোতে ভুলবশত সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার অপরাধে এই জেলেদের জীবন পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। দীর্ঘ ৮ মাস পর বিজিবির প্রচেষ্টায় ১৯ আগস্ট ঘরে ফিরেছেন ২৪ বাংলাদেশি জেলে। মুক্ত হওয়া জেলেরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বন্দিদশার আতঙ্ক।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ আশপাশের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে আরাকান আর্মি। এই এলাকা পুনরুদ্ধারে আরাকান আর্মির অবস্থানে প্রতিনিয়ত বিমানে হামলা, বোমা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। এই অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রাখাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাফ নদীর বিপরীত তীরের বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির কয়েক লাখ মানুষের জীবনেও পড়েছে। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি বাংলাদেশি জেলেরা নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে ঠিক মতো মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। প্রায়ই নৌকাসহ বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৮ আগস্ট নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপের বদরমোকাম জলসীমা থেকে ৩ জন বাংলাদেশি জেলেসহ একটি মাছ ধরার নৌকা ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
১৯ আগস্ট দুপুরে নাফ নদীর মধ্য ভাগে শূন্যরেখায় বিজিবির কাছে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে আরাকান আর্মি। টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ফিরিয়ে আনা ২৪ জেলের পরিচয় যাচাই করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন ও রোহিঙ্গা ২১২ জন। তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির বন্দিশালায় ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা বন্দী রয়েছেন।
ফিরে আসা ২৪ জেলের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানা যায়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনের পশ্চিম পাড়ার মো. ইলিয়াসের একটি ইঞ্জিননৌকা নিয়ে ৬ জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। জেলেদের একজন সেন্টমার্টিনের পশ্চিমপাড়ার মো. আবদুল্লাহ। তিনি জানান, সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে ‘সিতার লামা’ এলাকায় জাল ফেলার পর রাখাইন রাজ্যের দিক থেকে স্পিডবোটে এসে ৮-৯ জন আরাকান আর্মির সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাদের জিম্মি করে। হাত-পা বেঁধে রাখাইন রাজ্যের একটি ঘাঁটিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

আবদুল্লাহ বলেন, ‘আরাকান আর্মির সদস্যরা বারবার জানতে চেয়েছিল, আমরা আরসা কিংবা আরএসওর সদস্য কি না। বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের মংডুর একটি কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দী অবস্থায় প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। কৃষিকাজের পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য বাংকার (গর্ত) তৈরি এবং ভাঙা রাস্তা মেরামতের কাজ করতে হতো। দিনে দুবেলা শুধু শুঁটকি মাছ দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।’
২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের পূর্ব দিক থেকে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির স্পিডবোট সেন্টমার্টিন দ্বীপের আরেকটি নৌকা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং নৌকার পাঁচ জেলেকে চোখ বেঁধে মিয়ানমার সীমান্তে নিয়ে যায়। তাদের একজন মো. নুরুল আলম বলেন, প্রথমে তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা কেন মিয়ানমারের জলসীমায় মাছ ধরছিলেন। এরপর জানতে চাওয়া হয়, তারা সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত কি না।
নুরুল আলম বলেন, প্রথম রাতে তাদের প্লেটে করে অল্প পরিমাণ ভাতের মাড় খেতে দেওয়া হয়। এরপর দুই পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে ফেলে রাখা হয়। কিছুদিন পর দুপুরে ও সন্ধ্যার আগে দুবেলা ভাত দেওয়া শুরু হয়। ভাতের সঙ্গে দিত শুঁটকি মাছের তরকারি। বন্দিদশার ৬ দিনের মাথায় তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তাদের দিয়ে রাস্তা সংস্কার ও মাটি কাটার কাজ করানো হতো। এভাবেই দুঃখ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাদের ৮ মাস কেটেছে।
ফিরে আসা আরেক জেলে জসিম উদ্দিন বলেন, বিস্ফোরণে মংডু শহর কেঁপে উঠত। বন্দিশালায় তখন সবাই আতঙ্কে কান্নাকাটি শুরু করে দিতেন। আরাকান আর্মিও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালাত, যার বিকট শব্দ কানে বাজত। বোমা হামলায় আশপাশের বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেছেন তারা। যুদ্ধের ওই সময়ে তাদের ঠিক মতো খাবার দেওয়া হতো না। সকাল ১০টার দিকে একবার এবং বিকাল ৪টার দিকে আরেকবার শুকনো মাছ ও ডাল দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, আরাকান আর্মি ২০২৪ সালে মিয়ানমারের মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই নাফ নদী ও সাগরে বাংলাদেশি জেলেরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। নদী-সাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জলসীমা বুঝতে না পারায় জেলেরা অসাবধানতাবশত সীমানা পার হন। তখনই আরাকান আর্মি তাদের ধরে নিয়ে যায়।

‘পায়ে লোহার শিকল, দুবেলার খাবার ভাত ও শুটকি’
কক্সবাজার প্রতিনিধি

আরাকান আর্মির বন্দিশালায় শিকল পরিয়ে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আটকে রাখা হয়। তাদের দিয়ে কৃষিকাজ, বাংকার তৈরি ও রাস্তা মেরামতের কাজ করানো হতো। খাবার দেওয়া হতো দিনে দুবার শুঁটকির তরকারি ও ভাত। যুদ্ধবিমানের বোমা হামলার আতঙ্কের মধ্যেও তাদের দিন কাটে
জোয়ারের স্রোতে ভুলবশত সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার অপরাধে এই জেলেদের জীবন পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। দীর্ঘ ৮ মাস পর বিজিবির প্রচেষ্টায় ১৯ আগস্ট ঘরে ফিরেছেন ২৪ বাংলাদেশি জেলে। মুক্ত হওয়া জেলেরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বন্দিদশার আতঙ্ক।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ আশপাশের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে আরাকান আর্মি। এই এলাকা পুনরুদ্ধারে আরাকান আর্মির অবস্থানে প্রতিনিয়ত বিমানে হামলা, বোমা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। এই অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রাখাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাফ নদীর বিপরীত তীরের বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির কয়েক লাখ মানুষের জীবনেও পড়েছে। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি বাংলাদেশি জেলেরা নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে ঠিক মতো মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। প্রায়ই নৌকাসহ বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৮ আগস্ট নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপের বদরমোকাম জলসীমা থেকে ৩ জন বাংলাদেশি জেলেসহ একটি মাছ ধরার নৌকা ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
১৯ আগস্ট দুপুরে নাফ নদীর মধ্য ভাগে শূন্যরেখায় বিজিবির কাছে ২৪ বাংলাদেশি জেলেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে আরাকান আর্মি। টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ফিরিয়ে আনা ২৪ জেলের পরিচয় যাচাই করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে বাংলাদেশি ২২২ জন ও রোহিঙ্গা ২১২ জন। তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির বন্দিশালায় ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা বন্দী রয়েছেন।
ফিরে আসা ২৪ জেলের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানা যায়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনের পশ্চিম পাড়ার মো. ইলিয়াসের একটি ইঞ্জিননৌকা নিয়ে ৬ জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। জেলেদের একজন সেন্টমার্টিনের পশ্চিমপাড়ার মো. আবদুল্লাহ। তিনি জানান, সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে ‘সিতার লামা’ এলাকায় জাল ফেলার পর রাখাইন রাজ্যের দিক থেকে স্পিডবোটে এসে ৮-৯ জন আরাকান আর্মির সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাদের জিম্মি করে। হাত-পা বেঁধে রাখাইন রাজ্যের একটি ঘাঁটিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

আবদুল্লাহ বলেন, ‘আরাকান আর্মির সদস্যরা বারবার জানতে চেয়েছিল, আমরা আরসা কিংবা আরএসওর সদস্য কি না। বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের মংডুর একটি কারাগারে পাঠানো হয়। বন্দী অবস্থায় প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। কৃষিকাজের পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য বাংকার (গর্ত) তৈরি এবং ভাঙা রাস্তা মেরামতের কাজ করতে হতো। দিনে দুবেলা শুধু শুঁটকি মাছ দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।’
২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের পূর্ব দিক থেকে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির স্পিডবোট সেন্টমার্টিন দ্বীপের আরেকটি নৌকা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং নৌকার পাঁচ জেলেকে চোখ বেঁধে মিয়ানমার সীমান্তে নিয়ে যায়। তাদের একজন মো. নুরুল আলম বলেন, প্রথমে তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা কেন মিয়ানমারের জলসীমায় মাছ ধরছিলেন। এরপর জানতে চাওয়া হয়, তারা সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত কি না।
নুরুল আলম বলেন, প্রথম রাতে তাদের প্লেটে করে অল্প পরিমাণ ভাতের মাড় খেতে দেওয়া হয়। এরপর দুই পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে ফেলে রাখা হয়। কিছুদিন পর দুপুরে ও সন্ধ্যার আগে দুবেলা ভাত দেওয়া শুরু হয়। ভাতের সঙ্গে দিত শুঁটকি মাছের তরকারি। বন্দিদশার ৬ দিনের মাথায় তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তাদের দিয়ে রাস্তা সংস্কার ও মাটি কাটার কাজ করানো হতো। এভাবেই দুঃখ-কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাদের ৮ মাস কেটেছে।
ফিরে আসা আরেক জেলে জসিম উদ্দিন বলেন, বিস্ফোরণে মংডু শহর কেঁপে উঠত। বন্দিশালায় তখন সবাই আতঙ্কে কান্নাকাটি শুরু করে দিতেন। আরাকান আর্মিও যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি চালাত, যার বিকট শব্দ কানে বাজত। বোমা হামলায় আশপাশের বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেছেন তারা। যুদ্ধের ওই সময়ে তাদের ঠিক মতো খাবার দেওয়া হতো না। সকাল ১০টার দিকে একবার এবং বিকাল ৪টার দিকে আরেকবার শুকনো মাছ ও ডাল দিয়ে খাবার দেওয়া হতো।
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, আরাকান আর্মি ২০২৪ সালে মিয়ানমারের মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই নাফ নদী ও সাগরে বাংলাদেশি জেলেরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। নদী-সাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জলসীমা বুঝতে না পারায় জেলেরা অসাবধানতাবশত সীমানা পার হন। তখনই আরাকান আর্মি তাদের ধরে নিয়ে যায়।









