শিরোনাম

সেন্টমার্টিনে উঠছে বহুতল ভবন

কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজার প্রতিনিধি
সেন্টমার্টিনে উঠছে বহুতল ভবন
সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও তা থেমে নেই। সৈকত ঘেঁষে নির্মিত আবাসিক হোটেল

সেন্টমার্টিনের জেটি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে দ্বীপের সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন স্থান শিলবনিয়া সৈকত। এই সৈকত ঘেঁষে টেকনাফ উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে নির্মিত হচ্ছে একটি বহুতল ভবন। ভবনটির উত্তর পাশে গড়ে উঠছে চট্টগ্রামের মজনুর মালিকানায় ‘দীপান্বিতা’ নামে আরেকটি রিসোর্ট। এর পাশেই নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকার ইমতিয়াজুল ফরহাদের সান অ্যান্ড সেন্ড টুইন বিচ রিসোর্ট। একইভাবে গলাচিপা এলাকায় সৈকতের বালিয়াড়ির ওপর কেয়াবনের ভেতরে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থানীয় জহির হোসেনের আরেকটি বহুতল ভবন।

গত ৮ ও ৯ আগস্ট কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ ঘুরে ১০টি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ নির্মাণাধীন দেখা গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই বহুতল ভবন। এসব ভবন নির্মিত হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই। তবে সেন্টমার্টিনে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি অধিদপ্তর কখনোই দেয় না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) একটি সেন্টমার্টিন। এর মানে হলো দ্বীপের পানি, মাটি, বায়ু বা প্রাণীর ক্ষতি করে– এমন কোনো কাজ সেখানে করা যাবে না। এখানে নির্মাণ করা যাবে না কোনো অবকাঠামো। ২০২২ সালে সরকার ঘোষিত এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে ইট-সিমেন্ট নেওয়াও নিষিদ্ধ। দ্বীপটিতে শুধু বাঁশ-কাঠ দিয়ে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তবে এসব নিয়ম থাকার পরও দ্বীপটিতে ইট-সিমেন্টের অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে।

এসব স্থাপনা এমন সময় নির্মাণ হচ্ছে, যখন সেন্টমার্টিনের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সরকার দ্বীপে পর্যটক সীমিত করেছে। পাশাপাশি সেখানে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দ্বীপের হোটেল মালিক সমিতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সেন্টমার্টিনে বহুতল ও একতলা মিলিয়ে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা আড়াইশর বেশি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে তৈরি হয়েছে অন্তত ১৫০টি।

নির্মাণকাজে জড়িত শ্রমিকরা জানান, এক মাস ধরে ভবন নির্মাণকাজ চলছে। এ সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বাধা আসেনি। সেন্টমার্টিনে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ঠেকানোর কাজটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে দ্বীপ রক্ষার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরেরও। সেন্টমার্টিন দ্বীপেই পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কার্যালয় আছে, পুলিশ ফাঁড়ি আছে। তবে সবার চোখের সামনেই দ্বীপটিতে নির্মাণসামগ্রী নেওয়া হয়, কাজ চলে; হোটেল ও রিসোর্ট উদ্বোধন হয়, পর্যটকরা যান; ব্যবসা হয়– কেউ বাধা দেয় না।

টেকনাফ উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেডের ভবন নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে আছেন জিয়াবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি ভবন নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত নই।

উত্তর পাড়ায় বিশাল এলাকা টিনের সীমানা দিয়ে রিসোর্ট নির্মাণ করছেন ঢাকার বাসিন্দা শামীম হক। নির্মাণাধীন এ রিসোর্ট দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন রানা নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, এটা আমাদের কেনা জমি। অন্যরা যেভাবে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন, আমরাও একইভাবে নির্মাণ করছি।

সৈকতের বালিয়াড়ির ওপর কেয়াবনের ভেতরে নির্মাণ করা বহুতল ভবনের মালিক জহির হোসেন বলেন, এটি রিসোর্ট নয়, নিজেদের বাড়ি নির্মাণ করছি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম অনীক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে কোনো সংগঠন আমার অফিসে নেই। এ ছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছোট্ট একটি অফিস থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেখানে কোনো কর্মকর্তা নেই। তারপরও কক্সবাজার থেকে গিয়ে দ্বীপের পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় সর্বোচ্চ কাজ করে যাচ্ছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপে গত এক বছরে অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ৩১টি হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বীপে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে পাথর ও সিমেন্ট।

দ্বীপ ঘুরে দেখা যায়, নির্জন সৈকতের বালিয়াড়ি ও কেয়াবন উজাড় করে অবকাঠামো তৈরির কারণে ডিম পাড়তে আসতে পারছে না মা কচ্ছপ। এলেও কচ্ছপের ডিম খেয়ে নিচ্ছে কুকুর। সৈকতের বালুচর দিয়ে পর্যটকবাহী ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। ফলে শামুক, ঝিনুক, লাল কাঁকড়াসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।

দ্বীপের পরিবেশকর্মী আব্দুল আজিজ বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে সৈকতে মা কচ্ছপ ডিম পাড়তে আসে। এ মৌসুমে কচ্ছপ তেমন একটা চোখে পড়েনি। এটা অশনিসংকেত।

কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে যত্রতত্র ময়লা, আবর্জনা, প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট ও হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য ফেলা হয়। বড় উদ্বেগের দিক হলো দ্বীপে কেয়াবন উজাড় করে হোটেল-রিসোর্ট হচ্ছে। অথচ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে।

২০২০ সালে সেন্টমার্টিন নিয়ে আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, এখন যেভাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপে কার্যক্রম চলছে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হতে পারে।

/এসআর/