শিরোনাম

চন্দনাইশের আদিবাসীপাড়ায় হাহাকার, দেখা নেই মৌলিক সেবার

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
চন্দনাইশের আদিবাসীপাড়ায় হাহাকার, দেখা নেই মৌলিক সেবার
চন্দনাইশের একটি আদিবাসীপাড়ার চলাচলের রাস্তা

ভোর হলেই শতবর্ষী খেচাই খেয়াংকে ঘিরে ধরে পাহাড়ি পাড়ার শিশুরা। বয়সের ভারে নিজে বিছানা থেকে উঠতে না পারলেও শিশুদের এই সাহচর্যই যেন তার বেঁচে থাকার মূল আনন্দ। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে এমন প্রবীণ ও নবীনদের জীবনের ছবিটা একদিকে যেমন মায়াময়, অন্যদিকে ঠিক তেমনই করুণ ও নির্মম। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও খেয়াং, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা সম্প্রদায়ের বহু পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের মৌলিক সেবা এখনো অধরা।

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের গুংগুরু, কওছড়া, সম্বনিয়া, লেমুঝিড়ি ও ইমানুয়েলসহ একাধিক পাড়ায় শত শত পরিবার বসবাস করছে। এসব অঞ্চলের অধিবাসীদের অভিযোগ, ব্রিটিশ আমল এমনকি তিন প্রজন্ম ধরে তারা এখানে বসবাস করলেও আজও মেলেনি নাগরিক সুবিধার ন্যূনতম ছোঁয়া।

পাড়ায় নেই কোনো পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ কিংবা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কোনো গর্ভবতী নারী বা গুরুতর অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হলে এখনো কয়েক কিলোমিটার পথ কাঁধে করে বা কাপড়ে পেঁচিয়ে নিয়ে যেতে হয় ধোপাছড়ি বাজারে।

স্থানীয় বাসিন্দা সুজন ত্রিপুরা বলেন, ২০১৬ সালে জুম চাষের সময় গাছ পড়ে পা হারান তিনি। সঠিক ও দ্রুত চিকিৎসার অভাবে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়, অন্য অংশও অচল হয়ে যায়। এখন একটি ছোট টং দোকানে হুইলচেয়ারে বসেই চলছে তার জীবনের যুদ্ধ।

এছাড়া আদিবাসী পরিবারগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে বাস করা নব্বই বছরের প্রবীণ বাঙালি মো. ইসলাম মিয়া তিনবার স্ট্রোক করলেও এখনো পাননি কোনো বয়স্ক ভাতা।

শিক্ষার আলো থেকেও অনেকটাই বঞ্চিত এই দুর্গম জনপদ। পাড়ায় সরকারি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা হ্লাক্রইং খেয়ায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘খেচাই টি মেনাই প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এবং কিছু মিশনারি আবাসিকের ওপর ভর করেই চলছে শিশুদের পড়াশোনার চেষ্টা। এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও কয়েকশ পরিবারের মধ্যেচন্দ্রমহন ত্রিপুরা নামে একজন সুযোগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।

প্রবীণ খেচাই খেয়াংয়ের পরিবার জানায়, খেয়াং ও মংলা বিল এলাকায় তাদের পূর্বপুরুষদের প্রায় ২৩২ কানি জমি ছিল। ১৯৮৫ সালে স্থানীয় কয়েকজন বাঙালি বন্দোবস্তের কাগজ দেখিয়ে সেই জমির মালিকানা দাবি করলে তারা ভিটেমাটি ছেড়ে রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতরে চলে আসতে বাধ্য হন। এখন বন বিভাগকে বার্ষিক টাকা দিয়ে জুম চাষ এবং ফলমূল বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয় তাদের। ১৯৮৮ সালে বিলাইছড়ি থেকে আসা ত্রিপুরা পরিবারগুলোকেও স্কুল, রাস্তা ও জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

উপজেলা সদরে যোগাযোগের খরচও আকাশচুম্বী। একবার যাতায়াতেই বাইকভাড়া দিতে হয় এক হাজার থেকে বারো শত টাকা।

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে সেবা পৌঁছানো কঠিন। আমরা জমি সংক্রান্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ পাইনি।

অন্যদিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মতে, এলাকাগুলো সংরক্ষিত বনের (রিজার্ভ ফরেস্ট) ভেতরে হওয়ায় অবকাঠামো নির্মাণে আইনি জটিলতা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আড়ম্বর বা প্রচার-প্রচারণা সম্পর্কে ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোর মানুষের কোনো ধারণাই নেই। তাদের দাবি কোনো করুণা বা সহানুভূতি নয়; তারা চান একটি পাকা রাস্তা, একটি সরকারি স্কুল, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার সমান অধিকার। স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও অসুস্থ মানুষকে কাঁধে নিয়ে মাইল পার হতে হওয়া শুধু পাহাড়ি দুর্গমতার গল্প নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও নাগরিক অধিকারের এক বড় প্রশ্ন।

/এসবি/