শিরোনাম

শহীদ মতিউর রহমান পার্ক

ঈদের আনন্দ পুঁজি করে বাণিজ্য

ঈদের আনন্দ পুঁজি করে বাণিজ্য
ঈদের ছুটিতে শহীদ মতিউর পার্কের রাউডে ওঠে উচ্ছ্বসিত শিশুরা। কোলাজ সিটিজেন জার্নাল

ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে শহীদ মতিউর রহমান পার্কে আসেন সাইফুল ইসলাম। কিন্তু তাদের পার্কে প্রবেশ পথে আটকে দেওয়া হয়। পার্কে ঢুকতে হলে মাথাপিছু ১০ টাকা করে ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হবে তাকে।

সরকারি পার্কে প্রবেশের জন্য টিকিট কেনার বিষয়টি একেবারেই জানা ছিল না সাইফুল ইসলামের। সাধারণত সরকারি পার্কের জন্য টিকিট কেনার নিয়ম থাকার কথা নয়। তাই এখানে টিকিট কিনে প্রবেশ করার বিষয়টি জানার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সাইফুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, পার্কে প্রবেশের জন্য টাকা নেওয়া ঠিক নয়। কোনো ধরনের প্রবেশমূল্য ছাড়াই পার্ক সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। পার্কে আসা আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গুলিস্তানের কাছেই মতিউর রহমান পার্ক। পার্কটির তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। ভেতরে রয়েছে একটি বড় পুকুর। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে সান বাঁধানো ঘাট। গাছ-গাছালিতে ভরা মনোরম পরিবেশ। বাচ্চাদের জন্য রয়েছে ৩০ টিরও বেশি রাইড। কিন্তু প্রতিটি রাইডে চড়তে গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা করে।

সোমবার (২৩ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মতিউর রহমান পার্কটি পরিণত হয়েছে বিভিন্ন বয়সী মানুষের আনন্দমুখর মিলনমেলায়। দুপুরের পর থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দর্শনার্থীদের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে পার্কের চারপাশ। বিকাল নাগাদ বাড়তে থাকে শিশুদের দৌড়ঝাঁপ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টিকিট ছাড়া কাউকে পার্কে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। যারা টিকিট কেটে ঢুকছেন, তারা আবার বিভিন্ন রাইডের জন্য আলাদা টিকিট কাটছেন। কেউ ফুড কোর্টে বসে খাবার খাচ্ছেন। তবে পার্কের অন্য স্থান, বিশেষ করে পুকুর পাড়ে ময়লা-আবর্জনা পরে থাকতে দেখা গেছে। পুকুরে নৌকা চালানোর ব্যবস্থা থাকলেও পানি নষ্ট হয়ে কালচে রং ধারন করেছে।

জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখানের ইজাদাররেরও পরিবর্তন হয়। নির্বাচনের পর নতুন করে ইজারাদার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে পার্কে প্রবেশের জন্য সবাইকে টিকিট কাটতে হচ্ছে। দর্শনার্থীরা বলেন, ধানমন্ডি লেক, রমনা পার্ক ও চন্দ্রিমা উদ্যান যখন সবার জন্য উন্মুক্ত, তখন শহীদ মতিউর পার্কের দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া কতটা যৌক্তিক।

দর্শনার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিএসসিসি একটি সেবা সংস্থা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। নাগরিকদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সেবা দেওয়া সংস্থাটির কাজ। কিন্তু তারা তা না করে পার্কটি ইজারা দিয়েছে। এভাবে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সংরক্ষিত করে ফেলেছে ডিএসসিসি। এখন যাদের সাধ্য আছে তারাই পার্কে ঢুকতে পারছেন।

রাজধানীর কমলাপুর থেকে সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, ‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌বাসার কাছেই হওয়ায় সন্তানদের নিয়ে এখানে চলে এলাম। আমরা বড়রা যেমন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তেমনি শিশুরাও পড়াশোনা আর স্কুল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই ঈদের এই ছুটির সময়টাতে একটু বাইরে নিয়ে এসে ওদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করি। তবে সরকারি এ পার্কটিতে প্রবেশের টিকিট রাখা মোটেও ঠিক না। এছাড়া বিভিন্ন রাইডের মূল্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পার্কের চেয়ে বেশি। অথচ সিটি করপোরেশনের এই পার্কে প্রবেশ এবং বিভিন্ন রাইডের মূল্য কম হওয়া দরকার ছিল।

‍‍জানা গেছে, শহীদ মতিউর পার্কটি মূলত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সম্পত্তি। এটি ডিএসসিসির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের অধীন। পার্কের একটি বড় অংশে ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চ। জাতীয় নির্বাচনের পর ডিএসসিসি পার্কটি একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়, যারা এখন পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণ করছে এবং দর্শনার্থীদের কাছ থেকে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ১০ টাকা করে নিচ্ছে।

তবে ডিএসসিসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালে ‘জল-সবুজে ঢাকা’ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে শহীদ মতিউর পার্কটির আধুনিকায়ন করা হয়। তখন চারপাশের দেওয়াল ভেঙে এটি সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। এতে ভাসমান লোকজন এখানে বিশ্রাম এবং পুকুরে গোসল করতে শুরু করেন। এ কারণে কিছুদিনের মধ্যে পার্কটি সৌন্দর্য হারায়। পরে এর চারপাশে লোহার গ্রিল দিয়ে এটি ইজারা দেওয়া হয়।

কিন্তু এই ইজারার মাধ্যমে নগরের মানুষের প্রবেশ কেন সংরক্ষিত করা হয়েছে, তার উত্তর দিতে পারেননি ডিএসসিসি সংশ্লিষ্টরা।

ডিএসসিসির প্রকৌশল দপ্তর সূত্র জানায়, ২০২০ সালের মে মাসে মেয়রের দায়িত্ব নেন শেখ ফজলে নূর তাপস। এরপর তিনি সংস্থাটির রাজস্ব আয় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ১ মার্চ শহীদ মতিউর পার্কটি ২০ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা নেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা মো. অলি উল্লাহ। পরে তারা পার্কে প্রায় ১৫টি রাইড এবং খাবারের দোকান বসান। এখন পার্কটিতে ৩০টির বেশি রাইড এবং খাবারের বেশকিছু দোকান রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্কের এক খাবারের দোকানদার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ইজারাদারের কাছ থেকে আমি এক বছরের জন্য দুটি দোকান ভাড়া নিয়েছি। দোকানগুলোর জন্য ভাড়া গুনতে হয় মাসে ৮০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বছরের অন্য সময়ে তেমন বেচাকেনা হয় না। ঈদ উপলক্ষে এখন কিছুটা ভালো আছে।

এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, আমাদের কাছ থেকে যদি একটু কম ভাড়া নিতো তাহলে আমরাও দর্শণার্থীদের কাছ থেকে কম দামে খাবার বিক্রি করতে পারতাম। এখন ১০ টাকার মুড়ি ভর্তা ৩০ টাকা করে বিক্রি করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) অতিরিক্ত দায়িত্ব মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, পার্কটি সংস্কারের পর তা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। সেখানে ভাসমান লোকজন বসতি গড়ে তুলেছিল। পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপও চলছিল। তাই পার্কটি ইজারা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‌‌‌‌‌‌‌আমাদের আলাদা কোনো আয় নেই। তাই খরচ মেটানোর জন্য আয়েরও ব্যবস্থা করতে হবে। এটা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত, ১০ টাকার বিনিময়ে যে কেউ এখানে প্রবেশ করতে পারবে।

পার্কে শিশুদের রাইডের মূল্য বেশি নির্ধারণে বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, এগুলো সারা বছর চলে না। মূলত, বিশেষ দিনগুলোতে এখানে জনসমাগম হয়। অথচ সারা বছর এই রাইডগুলোর পেছনে খরচ রয়েছে, এদের জন্য কর্মীদের বেতন দিতে হয়। সবকিছু মিলিয়ে খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের এমন বাণিজ্যিক কার্যক্রম ঠিক নয়। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশনের উচিত নগরের প্রতিটি পার্ক-মাঠ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা। এই ধরনের পাবলিক স্পেস ইজারা দিয়ে মানুষের প্রবেশাধিকার ক্ষুণ্ণ করা অন্যায্য।

তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনকে সব সময় জনগণের সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করতে হবে। পার্ক ইজারা না দিয়ে নিজস্ব লোকবল দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। এতে নগরের মানুষ সুফল পাবে।

/বিবি/