শিরোনাম

গুলিস্তান: অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
গুলিস্তান: অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি
রাজধানীর গুলিস্তানে সড়কের মাঝখানে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা দোকানের জায়গা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা গুলিস্তান। রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এসে মিলেছে এই এলাকায়। ফলে প্রতিদিনই এখানে মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। সড়কের দুই পাশে রয়েছে অসংখ্য পাইকারি ও খুচরা দোকান। দেশের অন্যতম বড় পাতাল মার্কেটও গুলিস্তানে, যেখানে মোবাইল ফোন সার্ভিসিং ও পুরোনো মোবাইল কেনাবেচা হয়।

গুলিস্তানের কাছেই রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। বঙ্গভবন থেকে গুলিস্তান স্কয়ার মোড়ের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার। পুলিশ সদর দপ্তরও খুব বেশি দূরে নয়। গুলিস্তান থেকে হেঁটে কয়েক মিনিটেই সচিবালয়ে পৌঁছানো যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ও এর কাছাকাছি। একই এলাকায় রয়েছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম ও গোলাপ শাহ মাজার।

এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও মানুষের ব্যস্ত চলাচলের কেন্দ্র হওয়ার পরও গুলিস্তানের চিত্র ভিন্ন। ছিনতাই, পকেটমারি, চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা, প্রতারণা ও চোরাই পণ্যের ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে এলাকাটিতে। ফুটপাত ও সড়কের বড় অংশ দখল করে বসেছে অবৈধ দোকান। যানবাহন চলাচলেও রয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। অপরিচ্ছন্নতা ও মানুষের হাঁটাচলার অনুপযোগী পরিবেশ যেন গুলিস্তানের নিত্যদিনের চিত্র।

অথচ ‘গুলিস্তান’ শব্দের অর্থ ফুলের বাগান। শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘ঢাকাকোষ’-এর তথ্য অনুযায়ী, রমনার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের উত্তরে ঢাকা জেলা ক্রীড়া মিলনায়তন ও পল্টন মাঠের পাশে ১৯৫৩ সালে ‘গুলিস্তান’ নামে একটি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সিনেমা হলের নাম থেকেই পরে এলাকাটির নাম হয় গুলিস্তান।

চলচ্চিত্রবিষয়ক সাংবাদিক অনুপম হায়াৎ তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতার চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোশানি ঢাকায় এসে এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। এটি ছিল ঢাকার প্রথম শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আধুনিক সিনেমা হলগুলোর একটি। শুরুতে এর নাম ছিল ‘লিবার্টি’। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘গুলিস্তান’ রাখা হয়। এখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সিনেমা প্রদর্শিত হতো।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে চলচ্চিত্র ও শিল্প-সংস্কৃতির জগতে গুলিস্তানের ছিল আলাদা পরিচিতি। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিতি অনেকটাই বদলে গেছে। এখন ব্যস্ত এই এলাকাটি বিশৃঙ্খলা, অপরাধ ও অনিয়মের কারণে বেশি আলোচিত।

চাঁদাবাজি পুরোনো, বদলেছে কেবল নিয়ন্ত্রণ

গুলিস্তানের প্রায় সব ফুটপাত এবং সড়কের বড় একটি অংশ হকারদের দখলে। এসব দোকান বসানো ও ব্যবসা চালানোর বিনিময়ে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দোকানভেদে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আবার বিভিন্ন বিপণিবিতানের পাশে ফুটপাতে দোকান বসাতে মাসিক ভাড়াও দিতে হয়। দোকানের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী এই ভাড়া ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত।

গুলিস্তানে চাঁদাবাজি অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সরকারের সময়েই এখানে ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯ সালে ‘ইতালিয়ান সোসিওলজিক্যাল রিভিউ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘নগর, অনানুষ্ঠানিকতা ও দারিদ্র্য: ঢাকা শহরের হকারদের মেরুকরণ’ শীর্ষক এক গবেষণায়ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতের ব্যবসা নিয়ে এমন তথ্য উঠে আসে।

গুলিস্তানসহ ঢাকার পাঁচটি এলাকার ওপর করা ওই গবেষণায় বলা হয়, ফুটপাতে ব্যবসা করা হকারদের প্রায় ৭০ শতাংশকেই কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যবসা চালাতে হয়। তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ৩৫ শতাংশ পুলিশ, সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং ১৪ শতাংশ সন্ত্রাসী বা অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার কথা জানিয়েছিলেন।

ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গুলিস্তানে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এসেছে। সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সামনে ভ্যানে করে পোশাক বিক্রি করা এক হকার বলেন, ‘আগে একদলের নেতারা খাইছে, এখন আরেক দলের নেতারা খাচ্ছে।’

গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টারের বিপরীতে ফ্লাইওভারসংলগ্ন সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট ও পোলট্রি পট্টি এলাকায় ফুটপাতের দোকান এবং পণ্যবাহী যানবাহন থেকে টাকা তোলার অভিযোগও রয়েছে। সেখানে টাকা নেওয়ার সময় রসিদ দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।

এমন একটি রসিদ সংগ্রহ করে দেখা যায়, সেখানে গুলিস্তানসহ মোট ১৬টি স্থানে টোল আদায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রসিদে ইজারাদার হিসেবে শেখ নিয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে।

এলাকায় ‘জুম্মন’ নামে পরিচিত শেখ নিয়াজ মোর্শেদ বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। তিনি চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে তার নামে কিছু এলাকার ইজারা নেওয়া রয়েছে এবং সেখানে রসিদের মাধ্যমে খাজনা আদায় করা হয়।

তবে ওই রসিদ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটির প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন জানান, রসিদটি বৈধ নয়। তার ভাষ্য, সিটি করপোরেশন বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ইজারা দিয়ে থাকে এবং বৈধ ইজারার রসিদে ইজারার মেয়াদ উল্লেখ থাকে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

চোখের সামনেই ছিনতাই

গুলিস্তান একটি থানার অধীনে নয়। এলাকার একাংশ পল্টন, একাংশ শাহবাগ এবং আরেকাংশ বংশাল থানার আওতাভুক্ত। ফলে শুধু গুলিস্তান এলাকার অপরাধের আলাদা পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।

গুলিস্তানে অপরাধের নানা ঘটনা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। গত বছরের ৯ জানুয়ারি গুলিস্তানের একটি মসজিদে ইমামতির আড়ালে মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গত ৪ জুলাই রমনা ভবন মার্কেটের সামনের ফুটপাতে এক কাপড়ের দোকানের কর্মচারীকে অচেতন করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবনের দৃশ্যও দেখা যায়। তরুণ ও কিশোরদের একটি অংশকে বিভিন্ন স্থানে মাদক গ্রহণ করতে দেখা যায়। এমনকি ট্রাফিক পুলিশের বক্সের আশপাশেও মাদক গ্রহণের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, গুলিস্তানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। তবে অপরাধীদের অনেকে গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় অপরাধের সঙ্গে আর্থসামাজিক বাস্তবতারও সম্পর্ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনা গেলে এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

গুলিস্তানের সঙ্গে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে নানা প্রয়োজনে এই এলাকায় আসতে হয়।

আদি ঢাকাবাসী ফোরামের সদস্যসচিব জাভেদ জাহান বলেন, বঙ্গভবনে যাতায়াতের জন্য আলাদা পথ রয়েছে। একইভাবে পুলিশ কর্মকর্তারাও পুলিশ সদর দপ্তরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত গুলিস্তানের পথ ব্যবহার করেন না। ফলে গুলিস্তানের মূল ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, যাঁরা প্রয়োজনেই সেখানে যান এবং অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করেন।

গুলিস্তানের পরিস্থিতি পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, সমস্যাগুলো চোখের সামনে থাকার পরও যদি সেগুলো না দেখার ভান করা হয়, তাহলে কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না।

একসময় যে গুলিস্তান ছিল সিনেমা, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র, সময়ের ব্যবধানে সেটিই এখন নানা অনিয়ম ও অপরাধের ভারে জর্জরিত। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যকেন্দ্রকে স্বাভাবিক ও নিরাপদ করতে হলে শুধু অভিযান চালানো নয়, ফুটপাত দখল, চাঁদাবাজি, মাদক, ছিনতাই এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলোকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে।

/এমআর/