শিরোনাম

বেরোবিতে ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ ভাড়া বাসে বছরে ব্যয় প্রায় ২ কোটি টাকা, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

বেরোবি সংবাদদাতা
বেরোবি সংবাদদাতা
বেরোবিতে ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ ভাড়া বাসে বছরে ব্যয় প্রায় ২ কোটি টাকা, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা
বেরোবির পরিবহন পুলে থাকা একটি ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ বিআরটিসি বাস। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) সাতটি বাস ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এসব বাসের পেছনে মাসে গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সে হিসাবে বছরে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে এসব বাসের সেবার মান ও ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের পরিবহন সংকট নিরসনে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বিআরটিসির সঙ্গে এক বছরের জন্য চুক্তি করে বেরোবি কর্তৃপক্ষ। চুক্তির আওতায় সাতটি বাস ভাড়া নেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আটটি বাসের পাশাপাশি বিআরটিসির সাতটি ভাড়া বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুল সূত্রে জানা গেছে, বিআরটিসির সাতটি বাসের জন্য প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এই হিসাবে ১২ মাসে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তবে চুক্তির পুরো মেয়াদে প্রকৃত কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে ১১ মাসের বিল ও পরিশোধের তথ্য পাওয়া যায়নি।

চুক্তির মেয়াদ ও ব্যয়ের পুরো হিসাব জানতে চাইলে পরিবহন পুল থেকে জানানো হয়, এ-সংক্রান্ত তথ্য পেতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে। আবেদন যদি অনুমোদন হয় তাহলে তথ্য দেওয়া হবে।

তবে চলতি বছরের এপ্রিল, মে ও জুন মাসের পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। গত এপ্রিল মাসে বিআরটিসিকে ১৭ লাখ, মে মাসে ১৩ লাখ এবং জুন মাসে ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে পরিবহন পুল। তিন মাসে মোট পরিশোধ করা হয়েছে ৪৪ লাখ টাকা। তিন মাসের এই ব্যয়কে মাসিক গড় হিসেবে ধরলে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

এদিকে, বাজেট-সংক্রান্ত নথি থেকে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভাড়া বাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে মোট তিন কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।

চুক্তি অনুযায়ী, ভাড়া করা বাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল করার কথা। এর ফলে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার কথা থাকলেও বাসগুলোর সেবার মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

বিআরটিসির বাসে চলাচলকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বৃষ্টির দিনে বাসের ছাদ ও বিভিন্ন অংশের ফুটো দিয়ে ভেতরে পানি পড়ে। অনেক সময় মাঝপথে বাস বিকলও হয়ে যায়। কোনো কোনো শিক্ষার্থী বাসের সিট থেকে তেলাপোকা বের হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

এছাড়া, বাসে বহিরাগত যাত্রী ওঠানো, নির্ধারিত স্থানে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস না থামানো এবং বাসের ভেতরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেছেন তারা।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী লিমন হোসেন বলেন, আমাকে টিউশনের জন্য শহরের দিকে যেতে হয়। তাই নিয়মিত বাসে উঠতে হয়। বাসে উঠলেই দুর্গন্ধ পাই, আবার সিটগুলোও বসার মতো নয়। গাড়িগুলোর ফিটনেস নিয়েও সন্দেহ আছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের বাস ভাড়ায় নেওয়ার পরিবর্তে ভাড়ার টাকা দিয়ে নতুন বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, বিআরটিসির বাসগুলোতে যাতায়াতের মতো পরিবেশ নেই। সিট ভাঙা, নিচের লোহার পাত কেঁপে ওঠে। একজন নারী শিক্ষার্থী হিসাবে আমার মনে হয়, এসব বাসে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। বসার জায়গাও ছোট। গাড়িগুলোর অবস্থা দেখে ফিটনেস নিয়েও সন্দেহ হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রায় ২ কোটি টাকা বার্ষিক ব্যয়ের বিপরীতে বাসগুলোর ফিটনেস, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে নতুন বাস কেনা কিংবা বাস পরিচালনার জন্য সরাসরি চালক ও হেলপার নিয়োগের অনুমতি নেই। এ-সংক্রান্ত সব অনুমোদন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) আওতাধীন।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় বাসের ঘাটতি থাকায় আমরা ইউজিসির কাছে নতুন বাস কেনার জন্য আবেদন জানিয়েছিলাম। তবে ইউজিসি নতুন বাস কেনার অনুমোদন না দিয়ে বিকল্প হিসেবে চুক্তির ভিত্তিতে বাস ভাড়া নেওয়ার পরামর্শ দেয়। সে অনুযায়ী বিআরটিসির সঙ্গে চুক্তি করা হয়। এর মেয়াদ ইতোমধ্যে এক বছর পূর্ণ হয়েছে। বিআরটিসির সঙ্গে এ চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

/এফআর/