শিরোনাম

অনলাইন সহিংসতার শিকার সাড়ে ৬৩ শতাংশ নারী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
অনলাইন সহিংসতার শিকার  সাড়ে ৬৩ শতাংশ নারী

দেশের প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। এই ডিজিটাল উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর অনলাইন হয়রানির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইনে প্রায় ৬৩ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার ও উন্নয়নমূলক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা লাইট হাউজ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জকরিয়া; মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শায়লা শারমিন জামান এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের সাবেক উপদেষ্টা ও নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় দেশের বড় একটি অংশ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। এর ফলে নারীরা শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, ফ্রিল্যান্সিং এবং সামাজিক যোগাযোগে নতুন সুযোগ পাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। এই ডিজিটাল উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর অনলাইন হয়রানির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬৩ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ নারী অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য পেয়েছেন ৫৩ দশমিক ২৮ শতাংশ নারী যৌন প্রস্তাব বা অশ্লীল ছবি গ্রহণ করেছেন এবং ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে হয়রানি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ ভুক্তভোগী কোনো ধরনের অভিযোগই করেন না। যা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে তোলে।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে , অনলাইন সহিংসতার প্রবণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৭ সালে যেখানে ৭৩ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোনো না কোনো ধরনের সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০২১ সালে তা বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে সাইবার সহায়তা প্ল্যাটফর্মে ৯ হাজার ১১৭টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। যা প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার দ্রুত বিস্তার নির্দেশ করে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইন সহিংসতার কারণে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা হতাশায় ভোগেন এবং ৪২ দশমিক ৭৯ শতাংশ নারী সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশে নিরুৎসাহিত হন। এসব তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে ডিজিটাল সহিংসতা কেবল অনলাইন সমস্যা নয়, বরং এটি নারীর সামাজিক অংশগ্রহণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সহিংসতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর ব্যাপকতা এবং গোপনীয়তা। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা, ভয় বা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অভিযোগই করেন না। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনগত সুরক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা এখনও যথেষ্ট নয়। ফলে ভুক্তভোগীরা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে মিডিয়া অ্যাডভোকেসির মূল লক্ষ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ, ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশ তৈরি, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা, সহায়তা সেবার তথ্য প্রচার এবং নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহমর্মিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন নয়, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। এই উদ্যোগ গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজকে একত্রিত করে একটি নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। বক্তারা বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

প্রসঙ্গত, লাইট হাউজ একটি মানবাধিকার ও উন্নয়নমূলক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশের গ্রামীন ও শহুরে দরিদ্র, প্রান্তিক ও উচ্চ ঝুঁকির জনগোষ্ঠী, হিজড়া, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী, কৃষক, দূর্যোগকবলিত জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করছে।

/এসবি/