শিরোনাম

পিঁপড়া কলোনির গোপন শাসনব্যবস্থা

সিটিজেন ডেস্ক
পিঁপড়া কলোনির গোপন শাসনব্যবস্থা
খাদ্যের সন্ধানে একদল পিঁপড়া।

পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ও সংগঠিত প্রাণীগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পিঁপড়া অন্যতম। আকারে ক্ষুদ্র হলেও তাদের সামাজিক কাঠামো এবং সমন্বয় ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরে মুগ্ধ করে আসছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোনো কেন্দ্রীয় নেতা বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ছাড়াই তারা বিশাল উপনিবেশ পরিচালনা, খাদ্য সংগ্রহ এবং জটিল আবাসস্থল নির্মাণ করে।

অনেকেই মনে করেন, একটি পিঁপড়া উপনিবেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলো রানি পিঁপড়া। কিন্তু বাস্তবে তার ভূমিকা মূলত প্রজননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি ডিম পাড়েন এবং নতুন সদস্য জন্ম দেন, তবে উপনিবেশের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার সরাসরি কোনো কর্তৃত্ব থাকে না।তাহলে এত বড় একটি সমাজ কীভাবে পরিচালিত হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পিঁপড়াদের সম্মিলিত আচরণে। প্রতিটি পিঁপড়া কিছু সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে এবং রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এই অসংখ্য ক্ষুদ্র কার্যক্রম একত্রিত হয়ে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যা বাইরে থেকে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত বলে মনে হয়।

বিজ্ঞানীরা এই ধরনের ব্যবস্থাকে ‘স্ব-সংগঠিত ব্যবস্থা’ বলে থাকেন। এখানে কোনো একক সদস্য পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং সবাই মিলে একটি বৃহৎ সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলে। এটি অনেকটা মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীর মতো। একটি নিউরনের ক্ষমতা সীমিত হলেও অসংখ্য নিউরন একত্রে কাজ করে জটিল চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব করে। একইভাবে, একটি পিঁপড়া একা তেমন কিছু করতে না পারলেও পুরো উপনিবেশ মিলে যেন একটি বিশাল জীবন্ত সত্তার মতো আচরণ করে, যাকে অনেক গবেষক ‘সুপার অর্গানিজম’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

বর্তমানে পৃথিবীতে পিঁপড়ার সংখ্যা প্রায় ২০ কোয়াড্রিলিয়ন বলে ধারণা করা হয়। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশেই তাদের বিস্তার রয়েছে। কয়েকশ সদস্যের ছোট কলোনি থেকে শুরু করে কোটি কোটি সদস্যের বিশাল সুপারকলোনি সব ক্ষেত্রেই তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো সমষ্টিগত কাজের দক্ষতা।

পিঁপড়াদের সমাজে এমন অনেক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা মানুষের সভ্যতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তারা খাদ্য সংগ্রহ ও মজুত করে, জটিল চলাচল ব্যবস্থা তৈরি করে, শিশুদের যৌথভাবে লালন-পালন করে এবং আহত সদস্যদেরও যত্ন নেয়। তবে মানুষের মতো তাদের কোনো প্রশাসন, ব্যবস্থাপক বা নেতৃত্ব কাঠামো নেই।

খাদ্যের সন্ধান পাওয়ার পর একটি কর্মী পিঁপড়া ফেরার পথে ‘ফেরোমন’ নামে পরিচিত বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেয়। অন্য পিঁপড়ারা সেই রাসায়নিক চিহ্ন অনুসরণ করে একই পথে যাতায়াত শুরু করে এবং তারাও নতুন করে ফেরোমন রেখে যায়। ফলে নির্দিষ্ট পথটি ক্রমশ আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো উপনিবেশ দ্রুত খাদ্যের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যায়। আরও মজার বিষয় হলো, তারা প্রায়ই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর পথ নির্বাচন করতে সক্ষম হয়। কারণ ছোট পথে বেশি সংখ্যক পিঁপড়া দ্রুত চলাচল করতে পারে, ফলে সেখানে ফেরোমনের ঘনত্বও বেশি থাকে। অন্যদিকে, দীর্ঘ পথের চিহ্ন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সর্বোত্তম পথটি বেছে নেওয়া হয়।

পিঁপড়ার বাসাগুলোও বিস্ময়করভাবে সুপরিকল্পিত। সেখানে ডিম ও লার্ভা রাখার কক্ষ, খাদ্য সংরক্ষণের স্থান এবং বর্জ্য ফেলার জন্য পৃথক অংশ থাকে। অথচ কোনো একক পিঁপড়ার কাছে পুরো বাসার নকশা বা পরিকল্পনা থাকে না।

তারা আশপাশের পরিবেশে থাকা ক্ষুদ্র সংকেত অনুসরণ করেই কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে কালো বাগান পিঁপড়ার কথা বলা যায়। তারা মাটি খুঁড়ে ছোট ছোট ঢিবি তৈরি করে এবং সেই মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অন্য পিঁপড়াদের একই স্থানের আশপাশে আরও মাটি জমা করতে উৎসাহিত করে। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে স্তম্ভ, দেয়াল এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কাঠামো।

বিজ্ঞানীরা এই ধরনের সমন্বয় প্রক্রিয়াকে ‘স্টিগমার্জি’ নামে অভিহিত করেন। এতে কোনো সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই এক সদস্যের রেখে যাওয়া চিহ্ন বা পরিবর্তন অন্য সদস্যদের কাজকে প্রভাবিত করে।মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো দলের সদস্যসংখ্যা বাড়লে সমন্বয় জটিল হয়ে ওঠে এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। সমাজবিজ্ঞানে এটি ‘রিঙ্গেলম্যান প্রভাব’ নামে পরিচিত। কিন্তু পিঁপড়াদের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায়, ততই সমন্বয়, তথ্য বিনিময় এবং সামগ্রিক কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই কারণেই ক্ষুদ্রাকৃতির হলেও পিঁপড়ারা প্রকৃতির অন্যতম সফল সামাজিক প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়, যাদের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা আজও বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম আকর্ষণ।

/এসবি/