শিরোনাম

তপুর জোড়া গোলে ইউরোপে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ

সিটিজেন ডেস্ক
তপুর জোড়া গোলে ইউরোপে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল

ইউরোপের মাটিতে প্রথমবার কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। সান মারিনো স্টেডিয়ামে স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে পরাজিত করে স্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই বাংলাদেশের ডাগআউট থেকে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা ছুটে যান মাঠে। ফুটবলাররা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উদযাপনে মেতে ওঠেন। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসীও আনন্দে ভাসেন ঐতিহাসিক এই জয়ে।

ফিফা র‌্যাংকিংয়ে সান মারিনো বিশ্বের সবচেয়ে নিচের সারির দল হলেও ইউরোপীয় ফুটবলের অংশ হওয়ায় তারা নিয়মিত জার্মানি, স্পেন, ইতালির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। সে কারণে ইউরোপের মাটিতে তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই জয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

এর আগে ২০০০ সালে ইংল্যান্ডে ভারতের বিপক্ষে খেলেছিল বাংলাদেশ, তবে জয় পায়নি। আবার ২০০১ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত এক ম্যাচে বসনিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরেছিল লাল-সবুজের দল। ফলে ইউরোপীয় কোনো দলের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম জয় হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নিল।

এই জয়ের প্রধান নায়ক ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। ম্যাচের দুই অর্ধেই একটি করে গোল করে দলের জয়ের ভিত্তি গড়ে দেন তিনি। দুটি গোলই আসে তার হেড থেকে। দ্বিতীয়ার্ধে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া মাঠ ছাড়ার পর অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও উঠে যায় তপুর হাতে। নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার পরই তিনি দলের জন্য জয়সূচক গোলটি করেন।

প্রথমার্ধ শেষে স্কোরলাইন ছিল ১-১। বিরতির পর বাংলাদেশের কোচ থমাস ডুলি মাঠে নামান সামিত সোম, জায়ান আহমেদ ও সোহেল রানা জুনিয়রকে। তাদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের আক্রমণে নতুন গতি আসে। এক পর্যায়ে ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের জোরালো শট সাইড পোস্টে লেগে ফিরে এলে সম্ভাব্য একটি গোল থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।

ম্যাচের ৭৫ মিনিটের দিকে বিশ্বনাথ ঘোষকে মাঠে নামান ডুলি। স্বাভাবিকভাবে ফুলব্যাক হিসেবে খেললেও এদিন তাকে ডান প্রান্তের আক্রমণভাগে খেলানো হয়। পরবর্তীতে জয়সূচক গোলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

৮৬ মিনিটে হামজা চৌধুরীর নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে বিশ্বনাথের ভলি শট বক্সে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। সে সময় মাটিতে পড়ে থাকা তপু বর্মণ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখনই বল তার মাথায় লেগে জড়িয়ে যায় সান মারিনোর জালে। আর তাতেই নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়।

নির্ধারিত সময় শেষে চার মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করেন চতুর্থ রেফারি। শেষ মুহূর্তগুলোতে সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালায় সান মারিনো। এক পর্যায়ে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাত ফসকে বল গোললাইনের খুব কাছে চলে যায়। তবে বল পুরোপুরি লাইন অতিক্রম না করায় রক্ষা পায় বাংলাদেশ। শেষ দুই মিনিট দক্ষতার সঙ্গে সামলে নিয়ে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা।

ইতালির ভেতরে অবস্থিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সান মারিনোতে এদিন গ্যালারির চিত্রও ছিল ব্যতিক্রমী। ইতালির বিভিন্ন শহর—রোম, ভেনিসসহ নানা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশি প্রবাসীরা হামজা-জামালদের সমর্থন জানাতে স্টেডিয়ামে ভিড় জমান। ফলে স্বাগতিকদের মাঠ হলেও পুরো পরিবেশে ছিল বাংলাদেশের ‘হোম ম্যাচ’-এর আবহ।

তবে ম্যাচের শুরুটা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। প্রথম দিকে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল সান মারিনো। তবে ১০ মিনিটের পর ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায় বাংলাদেশ।

এর ফলও আসে ১৯তম মিনিটে। হামজা চৌধুরীর ফ্রি-কিক থেকে শেখ মোরসালিন ডান প্রান্তে বল পেয়ে নিখুঁত ক্রস বাড়ান। সেই ক্রসে উড়ে গিয়ে হেডে বল জালে জড়ান তপু বর্মণ। গোল হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশি সমর্থকে ভরা গ্যালারি।

তবে বাংলাদেশের সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। গোল করার ১৪ মিনিট পরই নিজের ভুলে প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দেন তপু। সান মারিনোর বেরার্দিকে থামাতে ব্যর্থ হলে তিনি বক্সে কাটব্যাক করেন। সেখানে ফাঁকায় থাকা নিকোলাস শট নেন। মিতুল মারমা বলের গতি রুখতে চেষ্টা করলেও সেটি তার হাতে লেগে জালে ঢুকে যায়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। শেখ মোরসালিনের দুর্দান্ত পাস থেকে সাদ উদ্দিন গোলরক্ষককে একা পেয়েও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি শট। বল উড়ে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।

তবে শেষ পর্যন্ত তপু বর্মণের জোড়া গোলে ইউরোপের মাটিতে প্রথম জয় তুলে নিয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করে বাংলাদেশ। এই জয় শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের সাফল্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের জন্য আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

/এমআর/