শিরোনাম

ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল-শিবির আবারও মুখোমুখি হওয়ার কারণ কী

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল-শিবির আবারও মুখোমুখি হওয়ার কারণ কী
(বাঁ থেকে) ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল-ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে টানা দুই দিন ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অন্তত চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দফায় দফায় চলা সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। রড, লাঠি এবং রামদাসহ বিভিন্ন ধারালো দেশীয় অস্ত্র হাতে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান ও সংঘাতের ঘটনায় গোটা ক্যাম্পাস অঙ্গনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার মাত্রা কেবল ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সংঘর্ষে আহতদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানেও প্রতিপক্ষ হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ছাত্রশিবিরের দাবি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভিপি ও জিএসসহ তাদের নেতাকর্মীদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছে ছাত্রদল।

টানা দুই দিনের এ হামলা, ভাঙচুর ও সংঘাতের ঘটনায় উভয় সংগঠনই দায় এড়িয়ে পরস্পরকে কাঠগড়ায় তুলছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের অভিযোগ, সংঘাতের সূচনা করেছিল ছাত্রশিবির। তার ভাষ্যমতে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হামলার জবাব দিতে এবং তাদের প্রতিহত করতেই পরবর্তীতে অন্যান্য ক্যাম্পাসে ছাত্রদল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

অন্যদিকে এই দাবি অস্বীকার করে ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদলের শক্ত কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। কেবল গায়ের জোরে একক আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই তারা শিবিরের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।’

ঢাকা কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ
ঢাকা কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচি, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে তর্কবিতর্কের জেরে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এবং ঢাকা কলেজেও এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের একাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

সহিংসতার সূত্রপাত সোমবার (৩ আগস্ট) রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক মাঠে আয়োজিত প্রদর্শনীতে গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ছবি সংবলিত ফেস্টুন টাঙানো হয়। ওই ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বিকালে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির কর্মীদের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। পরবর্তীতে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং মারামারিতে রূপ নেয়। এতে দুই সংগঠনেরই বেশ কয়েকজন আহত হন।

পরদিন মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও অনুরূপ সংঘাতের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা একটি অনুষ্ঠানে শিবিরের নেতাকর্মীরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কেরানীগঞ্জের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসন ও মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে আনা এসব প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনে ছাত্রদল বাধা দিলে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় শিবির সমর্থিত জকসু প্রতিনিধি ও শিবিরের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দুপুর ২টার দিকে আহতদের খোঁজ নিতে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে গেলে সেখানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে পুলিশ পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সে করে আহত নেতাকর্মীদের সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে লাঠিসোঁটা ও বাঁশ হাতে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে লাঠিসোঁটা ও বাঁশ হাতে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা

একই দিন বিকালে পুরান ঢাকার বকশিবাজারের ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। লাঠিসোটা হাতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মারধর ও ভাঙচুরের ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হন। প্রায় একই সময়ে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও মারামারির ঘটনা ঘটে, যার জের ধরে নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরপর এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রশিবির। একইসঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিবিরের ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় জামায়াতে ইসলামী।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

দেশের অন্তত চারটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এই গোলযোগ ও সহিংস পরিস্থিতির জন্য দুই সংগঠনই পাল্টাপাল্টিভাবে একে অপরকে দায়ী করছে। ছাত্রদলের দাবি, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া শিবিরের হামলার প্রতিক্রিয়াতেই অন্যান্য ক্যাম্পাসে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। তবে ছাত্রশিবির এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে ছাত্রদল বহিরাগতদের নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব হামলা চালাচ্ছে।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বক্তব্য অনুযায়ী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরই প্রথম তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তিনি অভিযোগ করেন, শিবির তাদের অতীতের সন্ত্রাসী রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। ছাত্রদল সভাপতি জানান, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ঘটনার পর একই কায়দায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদলের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা হলে সংগঠনের নেতাকর্মীরা তা প্রতিহত ও জবাব দেয়।

অন্যদিকে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণজমায়েত কর্মসূচির আয়োজন করে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ছাত্রদলের দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে প্রতিহত করতে গিয়ে ছাত্রদল ব্যাকফুটে চলে যায়। সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই তারা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার অন্যান্য ক্যাম্পাসে পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে।

ছাত্রশিবির সভাপতির দাবি, দেশের বেশিরভাগ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল। তাই তারা পেশিশক্তি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পাশাপাশি, দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারের ওপর সৃষ্টি হওয়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতেই শিবিরের ওপর একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংঘর্ষের কারণ

ক্যাম্পাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি অবস্থান ও সংঘাতের ঘটনা নতুন কিছু নয়। গত এপ্রিলে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দেয়াল লিখনে ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল, তার জের ধরেই সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ক্যাম্পাসগুলোতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের এক পুরোনো চর্চা কাজ করে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে শিবির যখন ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য তৈরি করে, ঠিক তখন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলও সেই নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের কব্জায় নিতে চাইছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিনের মতে, সরকার বদলের পর ক্যাম্পাস দখলের এই প্রথা এবার একটু দেরিতে শুরু হয়েছে। বিরোধী অবস্থানে থাকায় বড় বড় ক্যাম্পাসগুলোতে শিবিরের ভিত্তি বেশ শক্ত, আর তাই ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবেই নিজেদের পুরোনো জায়গা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। এ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়গুলোও সহিংসতার পেছনে কাজ করতে পারে।

তবে সমস্যার মূলে প্রধান দলগুলোর প্রত্যক্ষ ভূমিকাকেই দায়ী করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, যতদিন পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনগুলো জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করবে এবং মূল দলগুলো তাদের পেছনে মদদ দিয়ে যাবে, ততদিন ক্যাম্পাসে এই ধরনের সংঘাত কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।

/এমএকে/