শিরোনাম

কম্বোডিয়ায় বন্দী ছিলেন শফিকুল, জানালেন দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
কম্বোডিয়ায় বন্দী ছিলেন শফিকুল, জানালেন দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা
মো. শফিকুল ইসলাম

দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন মো. শফিকুল ইসলাম। সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। অনলাইনে প্রতারণার কাজে রাজি না হওয়ায় তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে ৩ হাজার ২০০ ডলার দেওয়ার পর মুক্তি পান বলে দাবি করেছেন এই যুবক।

শফিকুলের ভাষ্য, কম্বোডিয়ায় ২২ দিনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার পর তিনি দেশে ফিরেছেন। সেই দেশে তাকে একটি ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ (প্রতারণাকেন্দ্র) ১৭ দিন বন্দী রাখা হয়েছিল। সেখানে নিয়মিত মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। তাকে বিক্রির চেষ্টাও করা হয়েছিল।

রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে শফিকুলের সংসার। প্রায় ৮ বছর ধরে তিনি অগ্নিনির্বাপণসামগ্রীর ব্যবসা করতেন। ফেসবুকে মো. মাসুদ মিয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের পর বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পান। একপর্যায়ে কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। তবে সেখানে তাকে আটকে রাখা, নির্যাতন করা হয়।

শফিকুল বলেন, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার আগে তিনি কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ শেখেন। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে মাসুদের সঙ্গে তার সাড়ে চার লাখ টাকার চুক্তি হয়। ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ ভবনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ডও পান তিনি। প্রথমে গত ১৬ অক্টোবর তার ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিলো। পরে তা পরিবর্তন করে ২৬ অক্টোবর করা হয়। ঢাকায় বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ইমিগ্রেশন পুলিশ শফিকুলকে আটকে দেয়। প্রবাসী ডেস্ক থেকে স্মার্টকার্ড যাচাই করে আসতে বলা হয়।

শফিকুল আরও বলেন, ‘প্রবাসী ডেস্কের একজন কর্মী সবার কার্ড স্ক্যান করে যাচাই করছিলেন। আমার পাসপোর্ট দেওয়ার পর নাম দেখে যাচাই ছাড়াই ছেড়ে দেন। এরপর আবার ইমিগ্রেশনে গেলে অনুমতি দেয় পুলিশ।’

তবে কম্বোডিয়া পৌঁছার পর শফিকুলকে আটকে দেয় দেশটির ইমিগ্রেশন। পাসপোর্ট জব্দ করে রাখে পুলিশ। তখন তিনি নমপেন বিমানবন্দর থেকে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মাসুদের সহযোগী মোস্তফা মুকুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। কিছুক্ষণ পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য শফিকুলের ফোনের বার্তাগুলো দেখেন। পরে তার এমপ্লয়মেন্ট ভিসা পরিবর্তন করে ভ্রমণ ভিসা দেওয়া হয়। এরপর বিমানবন্দর থেকে ছাড়া পান।

শফিকুলের ভাষায়, নমপেন বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন মুকুলের সহযোগী আরিফ। তার সঙ্গে একটি অটোরিকশায় করে ৪০ মিনিট পর শফিকুল পৌঁছান একটি আবাসিক ভবনে। এরপর গত বছরের ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি কমপ্লেক্সে পৌঁছান। পুরো চত্বর ছিল অনেকটা কারাগারের মতো। বের হওয়ার উপায় নেই। চারপাশে নিরাপত্তা প্রহরী। মুঠোফোন ও পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়। চীনা ভাষায় লেখা একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে রাখে। এরপর হিন্দি ও ইংরেজি দুই ভাষায় দুটি স্ক্রিপ্ট দেয়। এগুলো মুখস্থ করতে বলা হয়। এভাবে এক দিন পার করেন তারা। ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় কাজ। দায়িত্ব পড়ে ‘কলিং রুমে’। এটি মূলত ‘স্ক্যাম সেন্টার’। চীনা মালিক, চালান পাকিস্তানিরা।

শফিকুল জানান, ২৮ অক্টোবর কলিং রুমের দ্বিতীয় ধাপের কাজে তিনি ও ইশতিয়াক রাব্বী নামের আরেকজন যোগ দেন। সেন্টারে অধিকাংশ পাকিস্তানি কাজ করেন। কিছু বাংলাদেশি ও ভারতীয় আছেন। দুই দিন পর কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করা হয়। ওই দিন রাতেই ইন্টারভিউ হয়, বিক্রি হয়ে যান রাব্বী। তার ওপর শুরু হয় নির্যাতন। বৈদ্যুতিক শক, মারধর চলে। বারবার বিক্রির চেষ্টা করেও পারেনি। হঠাৎ ১৬ নভেম্বর ছেড়ে দিয়ে একটি গাড়িতে তুলে দেয়। পরে নির্জন এক জায়গায় নামিয়ে দেয়। পাসপোর্ট আর মুঠোফোন ফেরত দেয়। গাড়ির চালককে অনুরোধ করার পর তিনি একটি বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের টিকিট করে দেন।

ফোনে দেশে কথা হয় শফিকুলের। জানতে পারেন, কম্বোডিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে সহায়তা চেয়েছেন তার ছোট ভাই। তারাই ৩ হাজার ২০০ ডলার পরিশোধ করে স্ক্যাম সেন্টার থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। নমপেনে পৌঁছানোর পর কমিউনিটির এক প্রতিনিধির বাসায় ওঠেন। দুই দিন সেখানে থাকার পর দেশ থেকে টিকিট করা হলে ১৮ নভেম্বর দেশে ফেরেন শূন্য হাতে।

/এসআর/