আছিয়া–রামিসার বাবারা তাহলে কী উপায়ে বাঁচাবেন মিষ্টি ফুলগুলোকে

আছিয়া–রামিসার বাবারা তাহলে কী উপায়ে বাঁচাবেন মিষ্টি ফুলগুলোকে
রুবেল আবিদ

অনেক দিন আগের কথা, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। বন্ধুর কাছে আগেই তার বাবার কিছু অদ্ভূত আচরণের কথা শুনেছিলাম। ওদের বসার ঘরে বসেই সেই অদ্ভূত আচরণের একটা নমুনাও পেয়ে যাই।
বসার ঘরের দেয়ালে টাঙানো বেশ কয়েকটা ছবির একটিতে চোখ আটকে গেল। ছবিটিতে গ্রাফিক্সের কিছু কাজ করা ছিল। বন্ধুর বাবা তার ছোট মেয়েকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরেছেন, তাঁর হাতের চারপাশে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে বড় বড় কাঁটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে ভয়ে ভদ্রলোকের কাছে ছবির গ্রাফিক্সের ব্যাখ্যা চাইলাম। উত্তরে উনি যা বলেছিলেন, সেটা আমার মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেছে।
তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো বাবা, পৃথিবীর সব শিশুই একেকটা ফুল, বিশেষ করে মেয়ে শিশু। আর তোমরা নিশ্চয়ই বইতে পড়েছো, ফুল গাছে কাঁটা থাকে। সেই কাঁটা থাকে ফুলকে রক্ষা করতেই। এটা ঠিক যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুল একটা সময়ে ঝরে পড়বে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে ঝরে পড়ার আগে সেই ফুলকে যেন কেউ ছিড়তে বা নষ্ট করতে না পারে; এ কারণেই ওই কাঁটা রাখা হয়েছে। আর আমরা যারা মেয়ে শিশুর বাবা, তাদের তো ওই কাঁটার কাজই করতে হবে। তাই না?’
সেই থেকে কোনো মেয়ে শিশু দেখলেই ওর মুখে আমি ফুলের ছবি দেখি। সুন্দর ফুলগুলোকে আপনি পরম স্নেহ আর মমতায় আদর করবেন, ভালোবাসবেন; কিন্তু আঘাত করে কি নষ্ট করবেন বা ছিড়ে ফেলবেন? কেউ কেউ তা করছে, ইদানিং সেই কেউ কেউর সংখ্যাটা বেড়েই চলছে। আমাদের ফুলের মতো পবিত্র শিশুগুলোকে নষ্ট করছে, বৃন্তছাড়া করছে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে রামিসা নামের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য রামিসার দেহ থেকে মাথা আলাদা করেন। শিশুটিকে সেই অবস্থায় দেখে ওর বাবা ও মায়ের কেমন লেগেছিল, সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। কারণ, যে ধন হারায়নি, সে কী করে বুঝবে ধন হারানোর জ্বালা!
রামিসা নামের ছোট্ট ফুলটিকে হয়তো সারা জীবনের জন্য আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। কাঁটা হয়ে হয়তো এর আগে পরম মমতায় জড়িয়েও রেখেছিলেন ফুলটিকে। এর আগেও হয়তো অনেকে ফুলটিকে ছিড়তে এসেছিল, তাদের আবদুল হান্নান নামের কাঁটার আচর খেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। কিন্তু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা নামের কাঁটাটি শেষ রক্ষা করতে পারেননি। রামিসা নামের ফুলটিকে বাঁচাতে পারেননি।
ফুলটিকে ছিড়ে ফেলার পর অসহায় কাঁটা আবদুল হান্নান মোল্লা কান্নায় বুক ভাসিয়েছেন। অভিমানে বলেছেন, ‘আমি আপনাদের কাছে বিচার চাইব না। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার উদাহরণ নেই।’
এর আগেও আমরা ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া বেশকিছু শিশুর অসহায় অভিাববকদের অনেক আহাজারি শুনেছি। ২০০৬ সালের এরকম মর্মান্তিক দুটি খবরের কথা আমি কখনো ভুলব না। প্রথম খবরটি ছিল এ রকম– কুষ্টিয়ার মিরপুরে প্রতি শীতে একটি বট গাছে একদল হনুমান বসতি গড়ত। শীত শেষে ওরা আবার সেখান থেকে চলে যেত। সেবার একজন লোক কলা খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে একটি হনুমানকে দল ছাড়া করে। এরপর কোনো কারণ ছাড়াই পিটিয়ে মেরে ফেলে। সেদিন হনুমানরা এর প্রতিবাদে স্থানীয় থানা ঘেরাও করে। কিন্তু পুলিশও ওদের কথা না শুনে উল্টো পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়। পরের দিন ভোরবেলা হনুমানগুলো থানার চারপাশের দোকানপাট ভাঙচুর করে সেই বট গাছ ছেড়ে চলে যায়।
এর কয়েকদিন পর বিলকিস নামে ৩ বছরের এক শিশুকে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে স্থানীয় একটি ধানের খোলায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। কিন্তু হনুমানদের মতো সেভাবে প্রতিবাদ করতে পারছিলাম কই আমরা! প্রতিবাদ করতে না পারার রাগে, দুঃখে ও ক্ষোভে তখন আমি একটি গান লিখেছিলাম। সেটা ছিল এ রকম—সাবধান বিলকিস/সাবধান ৩ বছরের শিশু/সাবধান ইয়াসিমন/সাবধান পুলিশের গাড়ি/থানা হেফাজত/ সাবধান ধানের খোলা, নিজের বাড়ি/ কোথাও তোর নিরাপত্তা নেই, আমি তোর হনুমান দাদা নই।
আমার–আপনার যত রাগ, দুঃখ বা ক্ষোভই হোক; এগুলো থেমে নেই। ২০২৫ সালেও এমন একটি নৃশংস ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশ, কাঁদিয়ে ছিল মানুষকে। মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল তারই বোনের শশুর। কী বীভৎস, কী নারকীয় ছিল সেই ঘটনা! সেটার তবু কিছুটা প্রতিবাদ হয়েছিল, এবার রামিসার ঘটনায়ও প্রতিবাদে মুখর সাধারণ মানুষ।
কিন্তু এই প্রতিবাদ করেই বা কী লাভ হচ্ছে। থেমে তো নেই কুৎসিত মনের মানুষগুলোর নারকীয় কাজ। তাহলে কী বলতে বা করতে পারি আমরা? আছিয়া–রামিসার বাবারাই বা কী করবেন, কী উপায়ে বাঁচাবেন মিষ্টি ফুলগুলোকে। মেয়েদের বাবাদের একটা কথাই বলতে পারি, সুন্দর ফুলগুলোকে রক্ষা করার জন্য আপনারা সবাই কঠিন আর বিষাক্ত কাঁটা হয়ে উঠুন। আর আমরা যারা ছোট্ট–সুন্দর মিষ্টি ফুলগুলোকে ভালোবাসি, তাদের বলব—আসুন সবাই ‘হনুমান’ হয়ে যাই! সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাই এই ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু হত্যার। আর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করি এই নৃশংস ঘটনায় জড়িত অমানুষগুলোর দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার।

অনেক দিন আগের কথা, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। বন্ধুর কাছে আগেই তার বাবার কিছু অদ্ভূত আচরণের কথা শুনেছিলাম। ওদের বসার ঘরে বসেই সেই অদ্ভূত আচরণের একটা নমুনাও পেয়ে যাই।
বসার ঘরের দেয়ালে টাঙানো বেশ কয়েকটা ছবির একটিতে চোখ আটকে গেল। ছবিটিতে গ্রাফিক্সের কিছু কাজ করা ছিল। বন্ধুর বাবা তার ছোট মেয়েকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরেছেন, তাঁর হাতের চারপাশে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে বড় বড় কাঁটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে ভয়ে ভদ্রলোকের কাছে ছবির গ্রাফিক্সের ব্যাখ্যা চাইলাম। উত্তরে উনি যা বলেছিলেন, সেটা আমার মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেছে।
তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো বাবা, পৃথিবীর সব শিশুই একেকটা ফুল, বিশেষ করে মেয়ে শিশু। আর তোমরা নিশ্চয়ই বইতে পড়েছো, ফুল গাছে কাঁটা থাকে। সেই কাঁটা থাকে ফুলকে রক্ষা করতেই। এটা ঠিক যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুল একটা সময়ে ঝরে পড়বে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে ঝরে পড়ার আগে সেই ফুলকে যেন কেউ ছিড়তে বা নষ্ট করতে না পারে; এ কারণেই ওই কাঁটা রাখা হয়েছে। আর আমরা যারা মেয়ে শিশুর বাবা, তাদের তো ওই কাঁটার কাজই করতে হবে। তাই না?’
সেই থেকে কোনো মেয়ে শিশু দেখলেই ওর মুখে আমি ফুলের ছবি দেখি। সুন্দর ফুলগুলোকে আপনি পরম স্নেহ আর মমতায় আদর করবেন, ভালোবাসবেন; কিন্তু আঘাত করে কি নষ্ট করবেন বা ছিড়ে ফেলবেন? কেউ কেউ তা করছে, ইদানিং সেই কেউ কেউর সংখ্যাটা বেড়েই চলছে। আমাদের ফুলের মতো পবিত্র শিশুগুলোকে নষ্ট করছে, বৃন্তছাড়া করছে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে রামিসা নামের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য রামিসার দেহ থেকে মাথা আলাদা করেন। শিশুটিকে সেই অবস্থায় দেখে ওর বাবা ও মায়ের কেমন লেগেছিল, সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। কারণ, যে ধন হারায়নি, সে কী করে বুঝবে ধন হারানোর জ্বালা!
রামিসা নামের ছোট্ট ফুলটিকে হয়তো সারা জীবনের জন্য আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। কাঁটা হয়ে হয়তো এর আগে পরম মমতায় জড়িয়েও রেখেছিলেন ফুলটিকে। এর আগেও হয়তো অনেকে ফুলটিকে ছিড়তে এসেছিল, তাদের আবদুল হান্নান নামের কাঁটার আচর খেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। কিন্তু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা নামের কাঁটাটি শেষ রক্ষা করতে পারেননি। রামিসা নামের ফুলটিকে বাঁচাতে পারেননি।
ফুলটিকে ছিড়ে ফেলার পর অসহায় কাঁটা আবদুল হান্নান মোল্লা কান্নায় বুক ভাসিয়েছেন। অভিমানে বলেছেন, ‘আমি আপনাদের কাছে বিচার চাইব না। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার উদাহরণ নেই।’
এর আগেও আমরা ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া বেশকিছু শিশুর অসহায় অভিাববকদের অনেক আহাজারি শুনেছি। ২০০৬ সালের এরকম মর্মান্তিক দুটি খবরের কথা আমি কখনো ভুলব না। প্রথম খবরটি ছিল এ রকম– কুষ্টিয়ার মিরপুরে প্রতি শীতে একটি বট গাছে একদল হনুমান বসতি গড়ত। শীত শেষে ওরা আবার সেখান থেকে চলে যেত। সেবার একজন লোক কলা খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে একটি হনুমানকে দল ছাড়া করে। এরপর কোনো কারণ ছাড়াই পিটিয়ে মেরে ফেলে। সেদিন হনুমানরা এর প্রতিবাদে স্থানীয় থানা ঘেরাও করে। কিন্তু পুলিশও ওদের কথা না শুনে উল্টো পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়। পরের দিন ভোরবেলা হনুমানগুলো থানার চারপাশের দোকানপাট ভাঙচুর করে সেই বট গাছ ছেড়ে চলে যায়।
এর কয়েকদিন পর বিলকিস নামে ৩ বছরের এক শিশুকে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে স্থানীয় একটি ধানের খোলায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। কিন্তু হনুমানদের মতো সেভাবে প্রতিবাদ করতে পারছিলাম কই আমরা! প্রতিবাদ করতে না পারার রাগে, দুঃখে ও ক্ষোভে তখন আমি একটি গান লিখেছিলাম। সেটা ছিল এ রকম—সাবধান বিলকিস/সাবধান ৩ বছরের শিশু/সাবধান ইয়াসিমন/সাবধান পুলিশের গাড়ি/থানা হেফাজত/ সাবধান ধানের খোলা, নিজের বাড়ি/ কোথাও তোর নিরাপত্তা নেই, আমি তোর হনুমান দাদা নই।
আমার–আপনার যত রাগ, দুঃখ বা ক্ষোভই হোক; এগুলো থেমে নেই। ২০২৫ সালেও এমন একটি নৃশংস ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশ, কাঁদিয়ে ছিল মানুষকে। মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল তারই বোনের শশুর। কী বীভৎস, কী নারকীয় ছিল সেই ঘটনা! সেটার তবু কিছুটা প্রতিবাদ হয়েছিল, এবার রামিসার ঘটনায়ও প্রতিবাদে মুখর সাধারণ মানুষ।
কিন্তু এই প্রতিবাদ করেই বা কী লাভ হচ্ছে। থেমে তো নেই কুৎসিত মনের মানুষগুলোর নারকীয় কাজ। তাহলে কী বলতে বা করতে পারি আমরা? আছিয়া–রামিসার বাবারাই বা কী করবেন, কী উপায়ে বাঁচাবেন মিষ্টি ফুলগুলোকে। মেয়েদের বাবাদের একটা কথাই বলতে পারি, সুন্দর ফুলগুলোকে রক্ষা করার জন্য আপনারা সবাই কঠিন আর বিষাক্ত কাঁটা হয়ে উঠুন। আর আমরা যারা ছোট্ট–সুন্দর মিষ্টি ফুলগুলোকে ভালোবাসি, তাদের বলব—আসুন সবাই ‘হনুমান’ হয়ে যাই! সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাই এই ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু হত্যার। আর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করি এই নৃশংস ঘটনায় জড়িত অমানুষগুলোর দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার।

আছিয়া–রামিসার বাবারা তাহলে কী উপায়ে বাঁচাবেন মিষ্টি ফুলগুলোকে
রুবেল আবিদ

অনেক দিন আগের কথা, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। বন্ধুর কাছে আগেই তার বাবার কিছু অদ্ভূত আচরণের কথা শুনেছিলাম। ওদের বসার ঘরে বসেই সেই অদ্ভূত আচরণের একটা নমুনাও পেয়ে যাই।
বসার ঘরের দেয়ালে টাঙানো বেশ কয়েকটা ছবির একটিতে চোখ আটকে গেল। ছবিটিতে গ্রাফিক্সের কিছু কাজ করা ছিল। বন্ধুর বাবা তার ছোট মেয়েকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরেছেন, তাঁর হাতের চারপাশে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে বড় বড় কাঁটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে ভয়ে ভদ্রলোকের কাছে ছবির গ্রাফিক্সের ব্যাখ্যা চাইলাম। উত্তরে উনি যা বলেছিলেন, সেটা আমার মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেছে।
তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো বাবা, পৃথিবীর সব শিশুই একেকটা ফুল, বিশেষ করে মেয়ে শিশু। আর তোমরা নিশ্চয়ই বইতে পড়েছো, ফুল গাছে কাঁটা থাকে। সেই কাঁটা থাকে ফুলকে রক্ষা করতেই। এটা ঠিক যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুল একটা সময়ে ঝরে পড়বে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে ঝরে পড়ার আগে সেই ফুলকে যেন কেউ ছিড়তে বা নষ্ট করতে না পারে; এ কারণেই ওই কাঁটা রাখা হয়েছে। আর আমরা যারা মেয়ে শিশুর বাবা, তাদের তো ওই কাঁটার কাজই করতে হবে। তাই না?’
সেই থেকে কোনো মেয়ে শিশু দেখলেই ওর মুখে আমি ফুলের ছবি দেখি। সুন্দর ফুলগুলোকে আপনি পরম স্নেহ আর মমতায় আদর করবেন, ভালোবাসবেন; কিন্তু আঘাত করে কি নষ্ট করবেন বা ছিড়ে ফেলবেন? কেউ কেউ তা করছে, ইদানিং সেই কেউ কেউর সংখ্যাটা বেড়েই চলছে। আমাদের ফুলের মতো পবিত্র শিশুগুলোকে নষ্ট করছে, বৃন্তছাড়া করছে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে রামিসা নামের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য রামিসার দেহ থেকে মাথা আলাদা করেন। শিশুটিকে সেই অবস্থায় দেখে ওর বাবা ও মায়ের কেমন লেগেছিল, সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। কারণ, যে ধন হারায়নি, সে কী করে বুঝবে ধন হারানোর জ্বালা!
রামিসা নামের ছোট্ট ফুলটিকে হয়তো সারা জীবনের জন্য আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। কাঁটা হয়ে হয়তো এর আগে পরম মমতায় জড়িয়েও রেখেছিলেন ফুলটিকে। এর আগেও হয়তো অনেকে ফুলটিকে ছিড়তে এসেছিল, তাদের আবদুল হান্নান নামের কাঁটার আচর খেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। কিন্তু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা নামের কাঁটাটি শেষ রক্ষা করতে পারেননি। রামিসা নামের ফুলটিকে বাঁচাতে পারেননি।
ফুলটিকে ছিড়ে ফেলার পর অসহায় কাঁটা আবদুল হান্নান মোল্লা কান্নায় বুক ভাসিয়েছেন। অভিমানে বলেছেন, ‘আমি আপনাদের কাছে বিচার চাইব না। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার উদাহরণ নেই।’
এর আগেও আমরা ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া বেশকিছু শিশুর অসহায় অভিাববকদের অনেক আহাজারি শুনেছি। ২০০৬ সালের এরকম মর্মান্তিক দুটি খবরের কথা আমি কখনো ভুলব না। প্রথম খবরটি ছিল এ রকম– কুষ্টিয়ার মিরপুরে প্রতি শীতে একটি বট গাছে একদল হনুমান বসতি গড়ত। শীত শেষে ওরা আবার সেখান থেকে চলে যেত। সেবার একজন লোক কলা খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে একটি হনুমানকে দল ছাড়া করে। এরপর কোনো কারণ ছাড়াই পিটিয়ে মেরে ফেলে। সেদিন হনুমানরা এর প্রতিবাদে স্থানীয় থানা ঘেরাও করে। কিন্তু পুলিশও ওদের কথা না শুনে উল্টো পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়। পরের দিন ভোরবেলা হনুমানগুলো থানার চারপাশের দোকানপাট ভাঙচুর করে সেই বট গাছ ছেড়ে চলে যায়।
এর কয়েকদিন পর বিলকিস নামে ৩ বছরের এক শিশুকে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে স্থানীয় একটি ধানের খোলায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। কিন্তু হনুমানদের মতো সেভাবে প্রতিবাদ করতে পারছিলাম কই আমরা! প্রতিবাদ করতে না পারার রাগে, দুঃখে ও ক্ষোভে তখন আমি একটি গান লিখেছিলাম। সেটা ছিল এ রকম—সাবধান বিলকিস/সাবধান ৩ বছরের শিশু/সাবধান ইয়াসিমন/সাবধান পুলিশের গাড়ি/থানা হেফাজত/ সাবধান ধানের খোলা, নিজের বাড়ি/ কোথাও তোর নিরাপত্তা নেই, আমি তোর হনুমান দাদা নই।
আমার–আপনার যত রাগ, দুঃখ বা ক্ষোভই হোক; এগুলো থেমে নেই। ২০২৫ সালেও এমন একটি নৃশংস ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশ, কাঁদিয়ে ছিল মানুষকে। মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল তারই বোনের শশুর। কী বীভৎস, কী নারকীয় ছিল সেই ঘটনা! সেটার তবু কিছুটা প্রতিবাদ হয়েছিল, এবার রামিসার ঘটনায়ও প্রতিবাদে মুখর সাধারণ মানুষ।
কিন্তু এই প্রতিবাদ করেই বা কী লাভ হচ্ছে। থেমে তো নেই কুৎসিত মনের মানুষগুলোর নারকীয় কাজ। তাহলে কী বলতে বা করতে পারি আমরা? আছিয়া–রামিসার বাবারাই বা কী করবেন, কী উপায়ে বাঁচাবেন মিষ্টি ফুলগুলোকে। মেয়েদের বাবাদের একটা কথাই বলতে পারি, সুন্দর ফুলগুলোকে রক্ষা করার জন্য আপনারা সবাই কঠিন আর বিষাক্ত কাঁটা হয়ে উঠুন। আর আমরা যারা ছোট্ট–সুন্দর মিষ্টি ফুলগুলোকে ভালোবাসি, তাদের বলব—আসুন সবাই ‘হনুমান’ হয়ে যাই! সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাই এই ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু হত্যার। আর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করি এই নৃশংস ঘটনায় জড়িত অমানুষগুলোর দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার।

রামিসা হত্যাকাণ্ড: দুই জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট
৫-৭ দিনের মধ্যে রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রামিসা হত্যাকাণ্ড: মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার স্ত্রীকে আদালতে হাজির


