শিরোনাম

মার্চের উত্তাল দিনগুলো, স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে চূড়ান্ত যাত্রা

বিশেষ প্রতিনিধি
মার্চের উত্তাল দিনগুলো, স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে চূড়ান্ত যাত্রা
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

মার্চ মানেই উত্তাল দেশ, স্লোগানে প্রকম্পিত রাজপথ, আর একটি পরাধীন জাতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ ছিল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো সময়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বে এসে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়।

দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে অধিকার অর্জনের অগ্নিঝরা মাস মার্চের প্রথম দিন আজ। এ মাসেই বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। উত্তাল একাত্তরে মার্চ মাসজুড়ে বাঙালির চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন।

মার্চ: বিস্ফোরণের সূচনা

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি চলছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ১ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতারের ভাষণে ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এতে মুহূর্তেই জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটে।

সেদিন ঢাকার তৎকালীন স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকেরা মাঠ ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন। পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের নির্ধারিত বৈঠকের সামনে ছাত্রদের কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয় ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

সেদিনই শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ ঢাকায় ও ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ঘোষণা দেন। শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।

মার্চ: প্রথম পতাকা, প্রকাশ্য প্রত্যয়

২ মার্চ ১৯৭১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বটতলায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক সমাবেশ। সবুজ পটভূমির ওপর লাল বৃত্তের মাঝে সোনালি মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয়সহ বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ছাত্রসমাবেশ থেকে পরদিন পল্টন ময়দানে জনসভার ঘোষণা দেওয়া হয়। দুপুরে বায়তুল মোকাররমের দিকে বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়।

রাতে সামরিক সরকার ঢাকায় কারফিউ জারি করলে ছাত্র-জনতা তা অমান্য করে মিছিল বের করে। স্লোগানে কাঁপে শহর ‘সান্ধ্য আইন মানি না’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো’। হরতালের দিনে কার্যত অচল হয়ে পড়ে নগরজীবন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিল্পী কামরুল হাসানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পতাকার নকশা থেকে বাংলাদেশের মানচিত্র বাদ দিয়ে বর্তমান জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত করা হয়।

থেকে মার্চ: অচল প্রশাসন, অগ্নিগর্ভ জনপদ

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি থাকি আর না থাকি, আন্দোলন যেন থেমে না থাকে।’

৩ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। ৪ মার্চ খুলনায় বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন, ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে এবং আলোচনার জন্য তিনি ঢাকায় আসবেন।

এ সময় সরকারি দপ্তরগুলো কার্যত শেখ মুজিবুর রহমানেরে নির্দেশে চলতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলনে প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়ে।

মার্চ: চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

৭ মার্চ ১৯৭১, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই ভাষণ ছিল সরাসরি স্বাধীনতার প্রস্তুতির আহ্বান। কর, রাজস্ব ও প্রশাসনিক নির্দেশ মানার বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেন। দেশ কার্যত তার ঘোষণায় পরিচালিত হতে থাকে।

মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা স্বাধীনতার দাবিতে সমর্থন জানান।

১৫ থেকে ২৪ মার্চ: আলোচনার আড়ালে ষড়যন্ত্র

১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ১৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দয়ে। একই সময়ে রাজপথে চলতে থাকে প্রতিরোধ, মিছিল ও সমাবেশ।

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে সারা দেশে পালিত হয় ‘প্রতিরোধ দিবস’। সরকারি-বেসরকারি ভবন, বাড়ি ও যানবাহনে উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা। প্রেসিডেন্ট ভবন ও সেনানিবাস ছাড়া পাকিস্তানের পতাকা ছিল প্রায় অনুপস্থিত।

২৫ থেকে ২৬ মার্চ: কালরাত স্বাধীনতার ঘোষণা

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মম গণহত্যা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দপ্তর, পুলিশ লাইনস-সবখানেই হামলা চালানো হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ছবি: সংগৃহীত
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যরাতে গ্রেপ্তারের আগে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় সেই ঘোষণা পাঠ করেন। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

অগ্নিঝরা মার্চের তাৎপর্য

ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ছয় দফা (১৯৬৬), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-এর মার্চ ছিল চূড়ান্ত অধ্যায়। এই মাসেই স্পষ্ট হয়ে যায় পাকিস্তানি শাসন, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের সঙ্গে আর কোনো আপস নয়।

মার্চের প্রতিটি দিন ছিল প্রস্তুতির, প্রতিবাদের এবং আত্মত্যাগের। ২ মার্চের পতাকা উত্তোলন থেকে ৭ মার্চের দিকনির্দেশনা, ২৩ মার্চের প্রতিরোধ, আর ২৫ মার্চের কালরাত– সব মিলিয়ে এই মাসই বাঙালিকে নিয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত যাত্রায়।

/বিবি/