গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং আর কতদিন চলবে

গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং আর কতদিন চলবে
নিজস্ব প্রতিবেদক

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সারা দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। অনেক এলাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, একইসঙ্গে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে গ্যাস-সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি।
দেশে এই গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে। দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি, আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে ২১ জুলাই আগুন লেগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। এর আগে টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালুর চেষ্টা চলছে। এটি চালু করা গেলে দিনে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে সংকট কিছুটা কমতে পারে।
গ্যাস-সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছে সরকার। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে আনা প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশ এরইমধ্যে টার্মিনালে পৌঁছেছে। বিদেশি কারিগরি দলের সঙ্গে দেশীয় একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন। অক্ষত বয়লারটি দ্রুত চালু করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে কবে এটি চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তীব্র গ্যাস-সংকটের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে নীতিগত অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ৬৭ শতাংশ এবং পরিবহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম ৫১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বিতরণ চার্জ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) দাম বাড়ানোর আবেদন করবে পেট্রোবাংলা।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তিনি বলেন, একটি টার্মিনালে কারিগরি দুর্ঘটনার কারণে হঠাৎ সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের বিকল্প উৎস তৈরির পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে সরকার।
কমেছে গ্যাস সরবরাহ, বেড়েছে লোডশেডিং
দেশে প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে। এলএনজি থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তা নেমে এসেছে ৪৬ কোটি ঘনফুটে। ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ২১১ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। গ্যাসের সংকটে অনেকে রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। বৃষ্টির কারণে চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে। না হলে লোডশেডিং আরও বাড়ত। বেশি খরচের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
পিডিবি জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বুধবার (২৯ জুলাই) সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
শিল্পমালিকরা জানান, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় নেই। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আবার কেউ কেউ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় কারখানা চালাচ্ছেন। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কেউ ডিজেল ব্যবহার করছেন, আবার কেউ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।
ভর্তুকি কমাতে চায় পেট্রোবাংলা
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর টানা ৪ মাস দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এরপরও ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। জুলাই মাসেও লোকসান অব্যাহত আছে।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের আগে প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনতে গড়ে ১১ ডলার খরচ হতো। ওই দামে এলএনজি পাওয়া গেলে প্রস্তাব অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়িয়ে পেট্রোবাংলা অতিরিক্ত সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে। বিতরণ কোম্পানির বাড়তি চার্জ পরিশোধের পরও ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন হলেও তা দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলএনজির দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে এলএনজির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২১ ডলারের বেশি। ফলে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
গ্রাহকরা বলছেন, প্রতি মাসে শিল্পে একটা ন্যূনতম বিল নির্ধারিত আছে। বাসা-বাড়িতে মিটার-বিহীন গ্রাহকদের বিল নির্ধারিত। কোনো গ্যাস না পেলেও তাদের ওই টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ সুযোগ পেলেই দাম বাড়াতে চায় পেট্রোবাংলা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৩৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে গড়ে ৮২ শতাংশ দাম বাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় শিল্পে দাম সর্বোচ্চ ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সারা দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। অনেক এলাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, একইসঙ্গে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে গ্যাস-সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি।
দেশে এই গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে। দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি, আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে ২১ জুলাই আগুন লেগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। এর আগে টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালুর চেষ্টা চলছে। এটি চালু করা গেলে দিনে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে সংকট কিছুটা কমতে পারে।
গ্যাস-সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছে সরকার। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে আনা প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশ এরইমধ্যে টার্মিনালে পৌঁছেছে। বিদেশি কারিগরি দলের সঙ্গে দেশীয় একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন। অক্ষত বয়লারটি দ্রুত চালু করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে কবে এটি চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তীব্র গ্যাস-সংকটের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে নীতিগত অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ৬৭ শতাংশ এবং পরিবহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম ৫১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বিতরণ চার্জ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) দাম বাড়ানোর আবেদন করবে পেট্রোবাংলা।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তিনি বলেন, একটি টার্মিনালে কারিগরি দুর্ঘটনার কারণে হঠাৎ সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের বিকল্প উৎস তৈরির পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে সরকার।
কমেছে গ্যাস সরবরাহ, বেড়েছে লোডশেডিং
দেশে প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে। এলএনজি থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তা নেমে এসেছে ৪৬ কোটি ঘনফুটে। ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ২১১ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। গ্যাসের সংকটে অনেকে রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। বৃষ্টির কারণে চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে। না হলে লোডশেডিং আরও বাড়ত। বেশি খরচের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
পিডিবি জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বুধবার (২৯ জুলাই) সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
শিল্পমালিকরা জানান, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় নেই। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আবার কেউ কেউ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় কারখানা চালাচ্ছেন। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কেউ ডিজেল ব্যবহার করছেন, আবার কেউ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।
ভর্তুকি কমাতে চায় পেট্রোবাংলা
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর টানা ৪ মাস দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এরপরও ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। জুলাই মাসেও লোকসান অব্যাহত আছে।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের আগে প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনতে গড়ে ১১ ডলার খরচ হতো। ওই দামে এলএনজি পাওয়া গেলে প্রস্তাব অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়িয়ে পেট্রোবাংলা অতিরিক্ত সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে। বিতরণ কোম্পানির বাড়তি চার্জ পরিশোধের পরও ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন হলেও তা দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলএনজির দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে এলএনজির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২১ ডলারের বেশি। ফলে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
গ্রাহকরা বলছেন, প্রতি মাসে শিল্পে একটা ন্যূনতম বিল নির্ধারিত আছে। বাসা-বাড়িতে মিটার-বিহীন গ্রাহকদের বিল নির্ধারিত। কোনো গ্যাস না পেলেও তাদের ওই টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ সুযোগ পেলেই দাম বাড়াতে চায় পেট্রোবাংলা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৩৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে গড়ে ৮২ শতাংশ দাম বাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় শিল্পে দাম সর্বোচ্চ ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি।

গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং আর কতদিন চলবে
নিজস্ব প্রতিবেদক

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সারা দেশে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। অনেক এলাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, একইসঙ্গে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে গ্যাস-সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি।
দেশে এই গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর থেকে। দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি, আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে ২১ জুলাই আগুন লেগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। এর আগে টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালুর চেষ্টা চলছে। এটি চালু করা গেলে দিনে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে সংকট কিছুটা কমতে পারে।
গ্যাস-সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছে সরকার। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে আনা প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশ এরইমধ্যে টার্মিনালে পৌঁছেছে। বিদেশি কারিগরি দলের সঙ্গে দেশীয় একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন। অক্ষত বয়লারটি দ্রুত চালু করে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে কবে এটি চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তীব্র গ্যাস-সংকটের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে নীতিগত অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ৬৭ শতাংশ এবং পরিবহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম ৫১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বিতরণ চার্জ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) দাম বাড়ানোর আবেদন করবে পেট্রোবাংলা।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তিনি বলেন, একটি টার্মিনালে কারিগরি দুর্ঘটনার কারণে হঠাৎ সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের বিকল্প উৎস তৈরির পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে সরকার।
কমেছে গ্যাস সরবরাহ, বেড়েছে লোডশেডিং
দেশে প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে। এলএনজি থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তা নেমে এসেছে ৪৬ কোটি ঘনফুটে। ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ২১১ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। গ্যাসের সংকটে অনেকে রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। বৃষ্টির কারণে চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে। না হলে লোডশেডিং আরও বাড়ত। বেশি খরচের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
পিডিবি জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটের বেশি কমেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বুধবার (২৯ জুলাই) সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
শিল্পমালিকরা জানান, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় নেই। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আবার কেউ কেউ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় কারখানা চালাচ্ছেন। এর সঙ্গে লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কেউ ডিজেল ব্যবহার করছেন, আবার কেউ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন।
ভর্তুকি কমাতে চায় পেট্রোবাংলা
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর টানা ৪ মাস দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হয়েছে ১৭ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এরপরও ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। জুলাই মাসেও লোকসান অব্যাহত আছে।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের আগে প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনতে গড়ে ১১ ডলার খরচ হতো। ওই দামে এলএনজি পাওয়া গেলে প্রস্তাব অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়িয়ে পেট্রোবাংলা অতিরিক্ত সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে। বিতরণ কোম্পানির বাড়তি চার্জ পরিশোধের পরও ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন হলেও তা দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলএনজির দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে এলএনজির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম ২১ ডলারের বেশি। ফলে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
গ্রাহকরা বলছেন, প্রতি মাসে শিল্পে একটা ন্যূনতম বিল নির্ধারিত আছে। বাসা-বাড়িতে মিটার-বিহীন গ্রাহকদের বিল নির্ধারিত। কোনো গ্যাস না পেলেও তাদের ওই টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ সুযোগ পেলেই দাম বাড়াতে চায় পেট্রোবাংলা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৩৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে গড়ে ৮২ শতাংশ দাম বাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় শিল্পে দাম সর্বোচ্চ ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়লেও গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি।

এলএনজি টার্মিনালে ‘ত্রুটি’, রাজধানী ও আশপাশে গ্যাস সংকট






