জ্বালানি সংকটের আতঙ্ক কাটেনি, পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা

জ্বালানি সংকটের আতঙ্ক কাটেনি, পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা
এন রায় রাজা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্টল পাম্প ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। কার আগে কে তেল বা গ্যাস নেবে তার প্রতিযোগিতা। এ নিয়ে হুড়োহুড়ি, বাগ্বিতণ্ডা, বিশৃঙ্খলা।
এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যান কিংবা গণপরিবহন-সবাই দীর্ঘসময় লাইনে দাড়িয়ে যানবাহনচালকেরা জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে সংকটের আশঙ্কায় মানুষ জ্বালানি তেল বেশি করে কিনছে। আবার অনেকে মজুত করে রাখছে। এ কারণে আতঙ্কের কেনাকাটা (প্যানিক বায়িং) ঠেকাতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আতঙ্ক দূর করতে দেশে জ্বালানি পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বলছে সরকার।
তবে যানবাজনচালক মালিকেরা সরকারের এই কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিকে বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমগুলো। তাই সরকারও বৈশ্বিক অস্থিরতায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ার আশঙ্কায় সরকারও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সরকারের বক্তব্য
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। তেলের কোনো সংকট নেই। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে যাবে। সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ কক্ষে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম আসে, সেসব অঞ্চলে যুদ্ধ চলায় সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘যুদ্ধ কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। তাই সব একসঙ্গে খরচ না করে রেশনিং করে ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় চলা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে একটি জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে এবং আরও জাহাজ নোঙর করার কথা রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে তেল সরবরাহ শুরু হলে মজুত আরও বাড়বে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এজন্য দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় (ডিপিএম) তিন লাখ টন ডিজেল ক্রয়ের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে সরকার। এ ছাড়া বেশি দামে হলেও আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, মার্চ ও এপ্রিলের জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় নীতির মাধ্যমে তেল-গ্যাস কেনা হবে। আর এই চাপ সামলাতে তেল বিক্রির সীমা বেধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
কী বলছে বিপিসি
দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই বলে দাবি করছেন বিপিসি-এর চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি সিটিজেন জার্নালকে মুঠোফোনে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির প্যানিকে অনেকে অতিরিক্ত তেল মজুদ করতে চাইছে। যুদ্ধের কারণে একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। সে কারণে যাতে কেউ তেলের কালোবাজানি বা অতিরিক্ত মজুদ করতে না পারে সেজন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে তেলের জাহাজ আজও এসেছে। তেলের কোনো সংকট নেই, যথেষ্ট মজুদ আছে। এ ছাড়া দেশে আরও তেল আসছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
এবিষয়ে বিপিসির উপব্যবস্থাপক (ডিএলও) আশিক শাহরিয়ার সিটিজেন জার্নাল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ১০ দিনের মাথায় সোমবার ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে একটি ট্যাংকার। এক সপ্তাহের মধ্যে আসবে আরও চারটি। এসব ট্যাংকারে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো থেকে এসব পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে দৈনিক গড় অকটেনের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন (২০২৪-২৫ অর্থবছর অনুযায়ী)। সেখানে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ ৭৫০-৮০০ মেট্রিক টনের মতো আমদানি হচ্ছে।
মাসে ডিজেলর চাহিদা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, দেশে ডিজেলের স্বাভাবিক চাহিদা মাসে ১২ হাজার টন। এ হিসাবে এই পাঁচ ট্যাংকারের পরিশোধিত ডিজেল দিয়ে ১২ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। তবে গতকাল রবিবার থেকে দিনে কমিয়ে ৯ হাজার ২২ লিটার করে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। তাতে ১৬ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। দেশে মজুত থাকা ডিজেল দিয়ে চলবে আরও ১৬-১৭ দিন। অর্থাৎ আগামী এক মাসের চাহিদার সমান ডিজেল আসছে। বিপিসির হিসাবে, দেশের জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশ ডিজেল। ডিজেলের সিংহভাগ সরাসরি আমদানি করে মেটাতে হয়।
বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেটকারে ১০ লিটার এবং এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার অকটেন বা পেট্রল দেওয়া যাবে। ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল দেওয়া যাবে।
পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন
সোমবার বিকেলে রাজধানীর অনেক এলাকার পাম্পের সামনে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখো গেছে। তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরে তেল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা। কোনো পাম্পে আবার তেলও নেই লেখা কাগজ ঝুলিয়ে দেওয়া আছে । পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় তেল এসেছে অতি অল্প, যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্পেই তেল নেই, স্বাভাবিক হচ্ছে না সরবরাহ।

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কাছে ডি এল ফিলিং স্টেশন ও মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা বলেন, ‘তাদের পাম্পে কোনো তেল নেই। গতকাল রবিবার (৮ মার্চ) একটি করে তেলের গাড়ি এসেছে, যা গতকালই শেষ হয়ে গেছে। ফিলিং স্টেশনের কর্মী বলেন, আমাদের দৈনিক গাড়ি লাগে ৬টা, অথচ সেখানে গাড়ি এসেছে মাত্র একটি বা দুইটি।’
রামপুরায় দুটি পাম্পে একই অবস্থা, মোটর সাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন। এই সময় মোটরসাইকেলচালক আনোয়ারুল জানান, দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পরে তিনি বহু কষ্টে ৩ লিটার তেল কিনতে পেরেছেন।
চাহিদার তুলনায় জ্বালানি কম পাওয়ায় এবং জ্বালানি সংগ্রহ কষ্টসহ নানা কারণে রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম উবার ও পাঠাওয়ের চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন।
আগারগাঁও থেকে হাতিলঝিলে আসা যাত্রী রাকিব বলেন, ‘আগে এই দূরত্বে ১৫০ টাকায় আসতে পারতাম। এখন ২৫০ টাকা নিলো। কিছু করার নেই, যা যানজট, ইফতারের আগে বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ভাড়া করে আসতে বাধ্য হলাম।’
কেনো এই সংকট
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশ) সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, ‘মূলত ডিপো থেকেই তেল কম দেওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সব পাম্প চাইলেও তেল পাচ্ছে না। পাম্পগুলোতে যে ট্যাংকার দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয় সেগুলোর ধারণক্ষমতা ৪ হাজার লিটার। কিন্তু ওই ট্যাংকারে ডিপো থেকেই পাম্পে মাত্র ১ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করা হয়। ওই তেল বিক্রি শেষ হওয়ার পর আর আর পাম্প খেলা রাখা সম্ভব হয় না। দেশে তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করলেও তা কাস্টমস ও ডিসচার্জ পেরিয়ে পাম্প অবধি আসতে কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। কিন্তু এটা তো মানুষরা বুঝতে পারছে না, ফলে প্রতিনিয়ত প্যানিক বায়িং বাড়ছে। সরকারের উচিত এখন তেলের দাম কমিয়ে দেওয়া, যাতে বোঝানো হয় যে, আমাদের কোনো সংকট নেই। এতে করে জনগণের আতঙ্কও কমে আসবে।’
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা
সম্প্রতি বিপিসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় আইনগত অপরাধ। বাড়তি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি ও অতিরিক্ত মজুদ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গতকাল রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় চিঠি ইস্যুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দেওয়া এ চিঠিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি, অধিক মুনাফার লোভে অতিরিক্ত মজুদ, খোলা বাজারে বিক্রি, পাচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি বন্ধ ও পাচার রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে পরিচালনা করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয়
জ্বালানি সংকটের আতঙ্কে পাম্পগুলোতে হঠাৎ ভিড় বাড়া শুধু সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও ছড়িয়ে দেয়। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা, জ্বালানির মজুদের সঠিক তথ্য প্রচার এবং প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন ।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—চালকদেরও ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণ করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ না করে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে পাম্পগুলোতে অযথা ভিড় কমবে এবং সংকট পরিস্থিতিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অতএব আতঙ্ক নয়—সচেতনতা, স্বচ্ছ তথ্য এবং সমন্বিত উদ্যোগই জ্বালানি সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্টল পাম্প ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। কার আগে কে তেল বা গ্যাস নেবে তার প্রতিযোগিতা। এ নিয়ে হুড়োহুড়ি, বাগ্বিতণ্ডা, বিশৃঙ্খলা।
এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যান কিংবা গণপরিবহন-সবাই দীর্ঘসময় লাইনে দাড়িয়ে যানবাহনচালকেরা জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে সংকটের আশঙ্কায় মানুষ জ্বালানি তেল বেশি করে কিনছে। আবার অনেকে মজুত করে রাখছে। এ কারণে আতঙ্কের কেনাকাটা (প্যানিক বায়িং) ঠেকাতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আতঙ্ক দূর করতে দেশে জ্বালানি পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বলছে সরকার।
তবে যানবাজনচালক মালিকেরা সরকারের এই কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিকে বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমগুলো। তাই সরকারও বৈশ্বিক অস্থিরতায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ার আশঙ্কায় সরকারও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সরকারের বক্তব্য
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। তেলের কোনো সংকট নেই। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে যাবে। সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ কক্ষে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম আসে, সেসব অঞ্চলে যুদ্ধ চলায় সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘যুদ্ধ কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। তাই সব একসঙ্গে খরচ না করে রেশনিং করে ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় চলা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে একটি জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে এবং আরও জাহাজ নোঙর করার কথা রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে তেল সরবরাহ শুরু হলে মজুত আরও বাড়বে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এজন্য দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় (ডিপিএম) তিন লাখ টন ডিজেল ক্রয়ের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে সরকার। এ ছাড়া বেশি দামে হলেও আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, মার্চ ও এপ্রিলের জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় নীতির মাধ্যমে তেল-গ্যাস কেনা হবে। আর এই চাপ সামলাতে তেল বিক্রির সীমা বেধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
কী বলছে বিপিসি
দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই বলে দাবি করছেন বিপিসি-এর চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি সিটিজেন জার্নালকে মুঠোফোনে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির প্যানিকে অনেকে অতিরিক্ত তেল মজুদ করতে চাইছে। যুদ্ধের কারণে একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। সে কারণে যাতে কেউ তেলের কালোবাজানি বা অতিরিক্ত মজুদ করতে না পারে সেজন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে তেলের জাহাজ আজও এসেছে। তেলের কোনো সংকট নেই, যথেষ্ট মজুদ আছে। এ ছাড়া দেশে আরও তেল আসছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
এবিষয়ে বিপিসির উপব্যবস্থাপক (ডিএলও) আশিক শাহরিয়ার সিটিজেন জার্নাল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ১০ দিনের মাথায় সোমবার ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে একটি ট্যাংকার। এক সপ্তাহের মধ্যে আসবে আরও চারটি। এসব ট্যাংকারে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো থেকে এসব পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে দৈনিক গড় অকটেনের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন (২০২৪-২৫ অর্থবছর অনুযায়ী)। সেখানে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ ৭৫০-৮০০ মেট্রিক টনের মতো আমদানি হচ্ছে।
মাসে ডিজেলর চাহিদা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, দেশে ডিজেলের স্বাভাবিক চাহিদা মাসে ১২ হাজার টন। এ হিসাবে এই পাঁচ ট্যাংকারের পরিশোধিত ডিজেল দিয়ে ১২ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। তবে গতকাল রবিবার থেকে দিনে কমিয়ে ৯ হাজার ২২ লিটার করে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। তাতে ১৬ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। দেশে মজুত থাকা ডিজেল দিয়ে চলবে আরও ১৬-১৭ দিন। অর্থাৎ আগামী এক মাসের চাহিদার সমান ডিজেল আসছে। বিপিসির হিসাবে, দেশের জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশ ডিজেল। ডিজেলের সিংহভাগ সরাসরি আমদানি করে মেটাতে হয়।
বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেটকারে ১০ লিটার এবং এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার অকটেন বা পেট্রল দেওয়া যাবে। ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল দেওয়া যাবে।
পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন
সোমবার বিকেলে রাজধানীর অনেক এলাকার পাম্পের সামনে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখো গেছে। তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরে তেল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা। কোনো পাম্পে আবার তেলও নেই লেখা কাগজ ঝুলিয়ে দেওয়া আছে । পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় তেল এসেছে অতি অল্প, যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্পেই তেল নেই, স্বাভাবিক হচ্ছে না সরবরাহ।

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কাছে ডি এল ফিলিং স্টেশন ও মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা বলেন, ‘তাদের পাম্পে কোনো তেল নেই। গতকাল রবিবার (৮ মার্চ) একটি করে তেলের গাড়ি এসেছে, যা গতকালই শেষ হয়ে গেছে। ফিলিং স্টেশনের কর্মী বলেন, আমাদের দৈনিক গাড়ি লাগে ৬টা, অথচ সেখানে গাড়ি এসেছে মাত্র একটি বা দুইটি।’
রামপুরায় দুটি পাম্পে একই অবস্থা, মোটর সাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন। এই সময় মোটরসাইকেলচালক আনোয়ারুল জানান, দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পরে তিনি বহু কষ্টে ৩ লিটার তেল কিনতে পেরেছেন।
চাহিদার তুলনায় জ্বালানি কম পাওয়ায় এবং জ্বালানি সংগ্রহ কষ্টসহ নানা কারণে রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম উবার ও পাঠাওয়ের চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন।
আগারগাঁও থেকে হাতিলঝিলে আসা যাত্রী রাকিব বলেন, ‘আগে এই দূরত্বে ১৫০ টাকায় আসতে পারতাম। এখন ২৫০ টাকা নিলো। কিছু করার নেই, যা যানজট, ইফতারের আগে বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ভাড়া করে আসতে বাধ্য হলাম।’
কেনো এই সংকট
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশ) সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, ‘মূলত ডিপো থেকেই তেল কম দেওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সব পাম্প চাইলেও তেল পাচ্ছে না। পাম্পগুলোতে যে ট্যাংকার দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয় সেগুলোর ধারণক্ষমতা ৪ হাজার লিটার। কিন্তু ওই ট্যাংকারে ডিপো থেকেই পাম্পে মাত্র ১ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করা হয়। ওই তেল বিক্রি শেষ হওয়ার পর আর আর পাম্প খেলা রাখা সম্ভব হয় না। দেশে তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করলেও তা কাস্টমস ও ডিসচার্জ পেরিয়ে পাম্প অবধি আসতে কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। কিন্তু এটা তো মানুষরা বুঝতে পারছে না, ফলে প্রতিনিয়ত প্যানিক বায়িং বাড়ছে। সরকারের উচিত এখন তেলের দাম কমিয়ে দেওয়া, যাতে বোঝানো হয় যে, আমাদের কোনো সংকট নেই। এতে করে জনগণের আতঙ্কও কমে আসবে।’
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা
সম্প্রতি বিপিসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় আইনগত অপরাধ। বাড়তি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি ও অতিরিক্ত মজুদ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গতকাল রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় চিঠি ইস্যুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দেওয়া এ চিঠিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি, অধিক মুনাফার লোভে অতিরিক্ত মজুদ, খোলা বাজারে বিক্রি, পাচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি বন্ধ ও পাচার রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে পরিচালনা করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয়
জ্বালানি সংকটের আতঙ্কে পাম্পগুলোতে হঠাৎ ভিড় বাড়া শুধু সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও ছড়িয়ে দেয়। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা, জ্বালানির মজুদের সঠিক তথ্য প্রচার এবং প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন ।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—চালকদেরও ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণ করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ না করে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে পাম্পগুলোতে অযথা ভিড় কমবে এবং সংকট পরিস্থিতিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অতএব আতঙ্ক নয়—সচেতনতা, স্বচ্ছ তথ্য এবং সমন্বিত উদ্যোগই জ্বালানি সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

জ্বালানি সংকটের আতঙ্ক কাটেনি, পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা
এন রায় রাজা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্টল পাম্প ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। কার আগে কে তেল বা গ্যাস নেবে তার প্রতিযোগিতা। এ নিয়ে হুড়োহুড়ি, বাগ্বিতণ্ডা, বিশৃঙ্খলা।
এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যান কিংবা গণপরিবহন-সবাই দীর্ঘসময় লাইনে দাড়িয়ে যানবাহনচালকেরা জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে সংকটের আশঙ্কায় মানুষ জ্বালানি তেল বেশি করে কিনছে। আবার অনেকে মজুত করে রাখছে। এ কারণে আতঙ্কের কেনাকাটা (প্যানিক বায়িং) ঠেকাতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আতঙ্ক দূর করতে দেশে জ্বালানি পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বলছে সরকার।
তবে যানবাজনচালক মালিকেরা সরকারের এই কথায় আস্থা রাখতে পারছে না। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিকে বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমগুলো। তাই সরকারও বৈশ্বিক অস্থিরতায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়ার আশঙ্কায় সরকারও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সরকারের বক্তব্য
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। তেলের কোনো সংকট নেই। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে যাবে। সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে নিজ কক্ষে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম আসে, সেসব অঞ্চলে যুদ্ধ চলায় সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘যুদ্ধ কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। তাই সব একসঙ্গে খরচ না করে রেশনিং করে ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় চলা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে একটি জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে এবং আরও জাহাজ নোঙর করার কথা রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে তেল সরবরাহ শুরু হলে মজুত আরও বাড়বে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এজন্য দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় (ডিপিএম) তিন লাখ টন ডিজেল ক্রয়ের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে সরকার। এ ছাড়া বেশি দামে হলেও আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেছেন, মার্চ ও এপ্রিলের জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমান সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় নীতির মাধ্যমে তেল-গ্যাস কেনা হবে। আর এই চাপ সামলাতে তেল বিক্রির সীমা বেধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
কী বলছে বিপিসি
দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই বলে দাবি করছেন বিপিসি-এর চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। এ বিষয়ে তিনি সিটিজেন জার্নালকে মুঠোফোনে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির প্যানিকে অনেকে অতিরিক্ত তেল মজুদ করতে চাইছে। যুদ্ধের কারণে একটা প্যানিক তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। সে কারণে যাতে কেউ তেলের কালোবাজানি বা অতিরিক্ত মজুদ করতে না পারে সেজন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে তেলের জাহাজ আজও এসেছে। তেলের কোনো সংকট নেই, যথেষ্ট মজুদ আছে। এ ছাড়া দেশে আরও তেল আসছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
এবিষয়ে বিপিসির উপব্যবস্থাপক (ডিএলও) আশিক শাহরিয়ার সিটিজেন জার্নাল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ১০ দিনের মাথায় সোমবার ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে একটি ট্যাংকার। এক সপ্তাহের মধ্যে আসবে আরও চারটি। এসব ট্যাংকারে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো থেকে এসব পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে দৈনিক গড় অকটেনের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন (২০২৪-২৫ অর্থবছর অনুযায়ী)। সেখানে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ ৭৫০-৮০০ মেট্রিক টনের মতো আমদানি হচ্ছে।
মাসে ডিজেলর চাহিদা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, দেশে ডিজেলের স্বাভাবিক চাহিদা মাসে ১২ হাজার টন। এ হিসাবে এই পাঁচ ট্যাংকারের পরিশোধিত ডিজেল দিয়ে ১২ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। তবে গতকাল রবিবার থেকে দিনে কমিয়ে ৯ হাজার ২২ লিটার করে ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। তাতে ১৬ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। দেশে মজুত থাকা ডিজেল দিয়ে চলবে আরও ১৬-১৭ দিন। অর্থাৎ আগামী এক মাসের চাহিদার সমান ডিজেল আসছে। বিপিসির হিসাবে, দেশের জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশ ডিজেল। ডিজেলের সিংহভাগ সরাসরি আমদানি করে মেটাতে হয়।
বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেটকারে ১০ লিটার এবং এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার অকটেন বা পেট্রল দেওয়া যাবে। ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল দেওয়া যাবে।
পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন
সোমবার বিকেলে রাজধানীর অনেক এলাকার পাম্পের সামনে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখো গেছে। তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরে তেল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা। কোনো পাম্পে আবার তেলও নেই লেখা কাগজ ঝুলিয়ে দেওয়া আছে । পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় তেল এসেছে অতি অল্প, যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্পেই তেল নেই, স্বাভাবিক হচ্ছে না সরবরাহ।

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কাছে ডি এল ফিলিং স্টেশন ও মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা বলেন, ‘তাদের পাম্পে কোনো তেল নেই। গতকাল রবিবার (৮ মার্চ) একটি করে তেলের গাড়ি এসেছে, যা গতকালই শেষ হয়ে গেছে। ফিলিং স্টেশনের কর্মী বলেন, আমাদের দৈনিক গাড়ি লাগে ৬টা, অথচ সেখানে গাড়ি এসেছে মাত্র একটি বা দুইটি।’
রামপুরায় দুটি পাম্পে একই অবস্থা, মোটর সাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন। এই সময় মোটরসাইকেলচালক আনোয়ারুল জানান, দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পরে তিনি বহু কষ্টে ৩ লিটার তেল কিনতে পেরেছেন।
চাহিদার তুলনায় জ্বালানি কম পাওয়ায় এবং জ্বালানি সংগ্রহ কষ্টসহ নানা কারণে রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম উবার ও পাঠাওয়ের চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন।
আগারগাঁও থেকে হাতিলঝিলে আসা যাত্রী রাকিব বলেন, ‘আগে এই দূরত্বে ১৫০ টাকায় আসতে পারতাম। এখন ২৫০ টাকা নিলো। কিছু করার নেই, যা যানজট, ইফতারের আগে বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ভাড়া করে আসতে বাধ্য হলাম।’
কেনো এই সংকট
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশ) সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, ‘মূলত ডিপো থেকেই তেল কম দেওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সব পাম্প চাইলেও তেল পাচ্ছে না। পাম্পগুলোতে যে ট্যাংকার দিয়ে তেল সরবরাহ করা হয় সেগুলোর ধারণক্ষমতা ৪ হাজার লিটার। কিন্তু ওই ট্যাংকারে ডিপো থেকেই পাম্পে মাত্র ১ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করা হয়। ওই তেল বিক্রি শেষ হওয়ার পর আর আর পাম্প খেলা রাখা সম্ভব হয় না। দেশে তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করলেও তা কাস্টমস ও ডিসচার্জ পেরিয়ে পাম্প অবধি আসতে কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। কিন্তু এটা তো মানুষরা বুঝতে পারছে না, ফলে প্রতিনিয়ত প্যানিক বায়িং বাড়ছে। সরকারের উচিত এখন তেলের দাম কমিয়ে দেওয়া, যাতে বোঝানো হয় যে, আমাদের কোনো সংকট নেই। এতে করে জনগণের আতঙ্কও কমে আসবে।’
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা
সম্প্রতি বিপিসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় আইনগত অপরাধ। বাড়তি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি ও অতিরিক্ত মজুদ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে গতকাল রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় চিঠি ইস্যুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দেওয়া এ চিঠিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি, অধিক মুনাফার লোভে অতিরিক্ত মজুদ, খোলা বাজারে বিক্রি, পাচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি বন্ধ ও পাচার রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে পরিচালনা করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় করণীয়
জ্বালানি সংকটের আতঙ্কে পাম্পগুলোতে হঠাৎ ভিড় বাড়া শুধু সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও ছড়িয়ে দেয়। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা, জ্বালানির মজুদের সঠিক তথ্য প্রচার এবং প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন ।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—চালকদেরও ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণ করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ না করে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে পাম্পগুলোতে অযথা ভিড় কমবে এবং সংকট পরিস্থিতিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অতএব আতঙ্ক নয়—সচেতনতা, স্বচ্ছ তথ্য এবং সমন্বিত উদ্যোগই জ্বালানি সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।




