শিরোনাম

পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা

সিটিজেন ডেস্ক
পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার কোটি টাকা
পদ্মা ব্যারেজ (কাল্পনিক)। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ পরিকল্পনার পর অবশেষে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ২৫ বছর আগে বিএনপি সরকারের সময় যে প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন নতুনভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।

আগামী বুধবার (১৩ মে) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বাঁধে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস। এর মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পানি বণ্টনের জন্য নির্মাণ করা হবে তিনটি অফটেক অবকাঠামো। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রও স্থাপন করা হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকার পানিসংকট নিরসন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। নদীগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচের পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা কমে আসবে এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, এই ব্যারেজ চালু হলে প্রতিবছর প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এ বিষয়ে বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, একনেক সভায় প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং পরে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির সংকটে ভুগছে। এতে নদী শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রাও বেড়েছে। পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে সারা বছর তা সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই পদ্মা ও এর সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলোর পানিপ্রবাহ কমতে থাকে। এতে কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র আকার ধারণ করে।

পরিবেশ ও পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, পদ্মা ব্যারেজ কোনো নতুন ধারণা নয়। ১৯৬৪ সালেই এ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থানও নির্ধারণ করা হয়। তিনি জানান, একসময় ভারতও এ প্রকল্পে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছিল, তবে রাজনৈতিক নানা কারণে সেটি আর এগোয়নি। যদিও প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই, তবে অর্থায়নকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, ভবিষ্যতে পানির সংকট, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও বাড়বে। তাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাদু পানির সরবরাহ বাড়াতে পদ্মা ব্যারাজের বিকল্প নেই।

পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ নিয়ে প্রথম দিকের আলোচনা শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলে, ১৯৬১ সালে। পরে ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় এ বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা তৈরির কাজ চালিয়ে যায়।

/এমআর/